স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্রের শিল্পী মলয় কুমার গাঙ্গুলী আর নেই
বরেণ্য সংগীতশিল্পী, সুরকার ও স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্রের শিল্পী শব্দসৈনিক মলয় কুমার গাঙ্গুলী আর নেই। সোমবার (১২) রাতে ঢাকার একটি বেসরকারি হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় শেষ নিশ্বাস ত্যাগ করেন তিনি। শিল্পীর মৃত্যুর খবরটি জাগো নিউজকে নিশ্চিত করেছেন ‘ভাওয়াইয়া অঙ্গন’র প্রতিষ্ঠাতা ও নির্বাহী পরিচালক এবং বাংলাদেশ বেতারের সাবেক সংগীত প্রযোজক সংগীতশিল্পী একেএম মোস্তাফিজুর রহমান। তার বয়স হয়েছিল ৮০ বছর।
জানা গেছে, তার মরদেহ বর্তমানে মিরপুরে ন্যাশনাল হার্ট ফাউন্ডেশন হাসপাতালে রাখা রয়েছে। শিল্পীর একমাত্র মেয়ে অস্ট্রেলিয়ায় অবস্থান করছেন। তিনি দেশে ফিরলে শেষকৃত্য নিয়ে পরবর্তী সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে।
বরেণ্য এই শিল্পীর প্রয়াণে সংগীতাঙ্গনে নেমে এসেছে শোকের ছায়া। ‘ভাওয়াইয়া অঙ্গন’র প্রতিষ্ঠাতা ও নির্বাহী পরিচালক এবং বাংলাদেশ বেতারের সাবেক সংগীত প্রযোজন শিল্পী একেএম মোস্তাফিজুর রহমান এক ফেসবুক পোস্টে শোক জানিয়ে লিখেছেন, আমার প্রিয় মলয় দা (মলয় কুমার গাঙ্গুলী) নীরবে নিশব্দে অনন্তকালের পথে চলে গেলেন। তিনি দেশবরেণ্য লোকসংগীত শিল্পী। তিনি বাংলাদেশ বেতারের সুরকার ও সংগীত প্রযোজক, নিজস্ব শিল্পীদের বলিষ্ঠ কণ্ঠস্বর এবং স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্রের বীর মুক্তিযোদ্ধা (কণ্ঠযোদ্ধা) ছিলেন। তার গাওয়া বিখ্যাত গান ‘আমার মন তো বসে না গৃহ কাজে সজনী গো, অন্তরে বৈরাগীর লাউয়া বাজে’।
তার মৃত্যুতে দেশের সাংস্কৃতিক অঙ্গনে এবং বাংলাদেশ বেতারের শিল্পী, কর্মচারী ও কর্মকর্তাদের মধ্যে গভীর শোকের ছায়া নেমে এসেছে। আমি তার স্মৃতির প্রতি গভীর শ্রদ্ধা ও তার আত্মার চির শান্তি কামনা করি। তার মৃত্যুতে আমি গভীর শোক প্রকাশ করছি।’
তিনি আরও লেখেন, ‘সরকারি গণগ্রন্থাগারে আমার জীবনের প্রথম চাকরি হওয়ার ক্ষেত্রে তার বিশেষ অবদান ছিল।’
১৯৪৪ সালে নেত্রকোনার কেন্দুয়ার মোজাফফরপুর গ্রামে জন্ম নেওয়া মলয় কুমার গাঙ্গুলীর জীবনজুড়ে ছিল দেশপ্রেম ও সুরের সাধনা। ১৯৭১ সালের মহান মুক্তিযুদ্ধে কণ্ঠকে অস্ত্র করে লড়াই করেছিলেন তিনি। সে সময় বাড়ি ছেড়ে কলকাতায় গিয়ে যোগ দেন স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্রে। বালিগঞ্জ সার্কুলার রোডে বসে নিয়মিত গান লেখা, সুরারোপ ও কণ্ঠে মুক্তিযোদ্ধাদের অনুপ্রেরণা জুগিয়েছেন এই শিল্পী।
স্বাধীনতার পর বাংলাদেশে ‘পুত্রবধূ’ সিনেমায় গাওয়া তার জনপ্রিয় গান ‘গুরু উপায় বলো না’ তুমুল আলোড়ন তোলে। সেই গানে ঠোঁট মিলিয়েছিলেন প্রয়াত অভিনেতা প্রবীর মিত্র। এছাড়া ‘আমার মনতো বসে না গৃহ কাজে সজনী গো’, ‘অন্তরে বৈরাগীর লাউয়া বাজে’সহ বহু কালজয়ী গানে আজও মানুষ তাকে স্মরণ করে।
মলয় কুমার গাঙ্গুলীর ক্যারিয়ারের অন্যতম মাইলফলক ১৯৯০ সালে আওয়ামী লীগের জাতীয় সম্মেলনের জন্য তৈরি করা ঐতিহাসিক গান ‘যদি রাত পোহালে শোনা যেত, বঙ্গবন্ধু মরে নাই’। ওই গানে সুর দিয়েছিলেন তিনি। ১৯৯১ সালের নির্বাচনের সময় ‘জনতার নৌকা’ অ্যালবামে গানটি অন্তর্ভুক্ত হলে দেশজুড়ে ব্যাপক জনপ্রিয়তা পায়।
১৯৯৬ সালে আওয়ামী লীগ সরকার ক্ষমতায় এলে তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা সাবিনা ইয়াসমীনের কণ্ঠে গানটি পুনরায় রেকর্ড করান। পরে ২০২০ সালে আওয়ামী লীগ সরকার তাকে ২০ লাখ টাকা অনুদানও দেয়।
আরও পড়ুন:
শিল্পকলা একাডেমিতে বাড়ছে বিভাগ
যে কারণে তাহসান-রোজার বিচ্ছেদ
উল্লেখ্য, জীবদ্দশায় মলয় কুমার গাঙ্গুলী জানিয়ে গিয়েছিলেন, মৃত্যুর পর কোনো আনুষ্ঠানিক সম্মান বা স্বীকৃতির জন্য তিনি কোনো আবেদন রাখতে চান না।
এমএমএফ/জেআইএম