বসন্তে রঙিন হয়ে উঠল জাদুঘরের আঙিনা
প্রকৃতির মতো শহরেও বসন্ত এসেছে। প্রতি বছর তা উদযাপন করা হতো ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের চারুকলা অনুষদে। এবারের বসন্ত উৎসবের আয়োজন ছিল আগারগাঁওয়ের মুক্তিযুদ্ধ জাদুঘরের আঙিনায়। বাসন্তী রঙের ফুল-পোশাকে নারী-পুরুষেরা জড়ো হয়েছিলেন সেখানে। নাচে, গানে, কবিতায় বসন্তকে বরণ করে নেন তারা। এভাবে বসন্তে রঙিন হয়ে ওঠে মুক্তিযুদ্ধ জাদুঘরের আঙিনা।
বন্ধু, স্বজন নিয়ে জাদুঘরের আঙিনায় জড়ো হয়েছিলেন বহু মানুষ। মঞ্চে চলছিল গান ‘বসন্তে বাতাসে সই গো’। রবীন্দ্রনাথের গানের সঙ্গে ছিল নাচ। সদ্য অনুষ্ঠিত জাতীয় সংসদ নির্বাচনের একদিন পর এবারের বসন্ত উৎসবের আয়োজন নিয়ে কিছুটা দ্বিধায় ছিলো জাতীয় বসন্ত উৎসব উদ্যাপন পরিষদ। কিন্তু শেষপর্যন্ত সার্থকভাবে আয়োজনটি করেছে তারা।
অনুষ্ঠানের বসন্তকথন পর্বে সভাপতিত্ব করেন পরিষদের সভাপতি স্থপতি সফিউদ্দিন আহমদ। বক্তব্য দেন সহ-সভাপতি কাজল দেবনাথ ও সাধারণ সম্পাদক মানজার চৌধুরী সুইট। বহু বছরের পুরাতন জায়গা বদলে মুক্তিযুদ্ধ জাদুঘরে বসন্ত উৎসব প্রসঙ্গে কথা বলেন মানজার চৌধুরী। তিনি বলেন, ‘আমরা প্রতি বছর চারুকলার বকুলতলায় মূল আয়োজনটি করি। একই সময়ে পুরান ঢাকার বাহাদুর শাহ পার্ক, উত্তরাসহ অন্যান্য জায়গায়ও উৎসবটি করি। সোহরাওয়ার্দী মুক্তমঞ্চেও করা হয়েছে। তবে মূল ভেন্যু সবসময় ছিল চারুকলার বকুলতলা।’
সদ্য অনুষ্ঠিত নির্বাচন নিয়েও কথা বলেন উপস্থিত বক্তারা। তারা বলেন, এ নির্বাচনের মধ্যদিয়ে নতুন সরকারের নতুন বসন্তের সূর্য উদয় হয়েছে। এ সরকারের কাছে প্রত্যাশা, অতীতের সব মলিনতা ঝেড়ে ফেলে সংস্কৃতিবান্ধব একটি সুস্থ পরিবেশ তৈরি করা। পাশাপাশি মবসন্ত্রাস বন্ধ করা, সুস্থ সংস্কৃতি বিকাশে সকল বাধা অপসারণসহ সকল ধর্ম, বর্ণ, গৌত্রের যে বাংলাদেশ প্রতিষ্ঠার আকাঙ্খা জুলাই আন্দোলনের মধ্যদিয়ে প্রতিষ্ঠা পেয়েছিল, সে সমতার বাংলাদেশ প্রতিষ্ঠা করা এবং ভিন্নমতের প্রতি শ্রদ্ধাশীল হওয়া।
১৯৯৪ সাল থেকে নিয়মিত চারুকলার বকুলতলায় বসন্ত উৎসব আয়োজন করে আসছে পরিষদ। এবারই প্রথম উৎসবটির আয়োজন করা হলো অন্য কোথাও। আগামী বছর থেকে বকুলতলায় উৎসবটি করতে চান জানিয়ে মানজার চৌধুরী বলেন, ‘এখন নতুন সরকার দায়িত্ব নিচ্ছে, তাদের কাছে আমাদের প্রত্যাশা থাকবে সুস্থ সংস্কৃতিচর্চার মুক্ত পরিবেশ যেন তারা বজায় রাখেন। আমরা যেন আগামী বছর থেকে বকুলতলায় উৎসবটি আয়োজন করতে পারি এবং সংস্কৃতিচর্চার মুক্ত জানালাটা যেন খোলা থাকে।’
জাদুঘরের আঙিনায় সকাল ৮টায় সমবেত যন্ত্র ও কণ্ঠসংগীত পরিবেশনার মধ্যদিয়ে শুরু হয় বসন্ত উৎসবের। পরিবেশন করে বেঙ্গল পরম্পরা সঙ্গীতালয়ের শিক্ষার্থীরা। পরে ছিল বিভিন্ন নৃত্য ও সংগীত দলের পরিবেশনা। এ ছাড়াও ছিল একক শিল্পীদের পরিবেশনা, শিশু-কিশোরদের পরিবেশনা ও ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীর শিল্পীদের পরিবেশনা ছাড়াও প্রীতি বন্ধনী বিনিময়, আবির বিনিময়। বেলা ১২টা পর্যন্ত চলে উৎসবের নানা আয়োজন।
পরিষদের সভাপতি স্থপতি সফিউদ্দিন আহমদ বলেন, এ আয়োজন করতে পারবো কি না, তা নিয়েই সন্দিহান ছিলাম। নির্বাচনে কারা ক্ষমতায় আসবে, তারা এ ধরনের আয়োজন করতে দেবে কি না, তা নিয়েও সন্দিহান ছিলাম। আমরা আয়োজনটি করতে পেরে আনন্দিত। এবার তো প্রচারও তেমন করা যায়নি। তবুও অনেক মানুষ স্বতঃস্ফুর্তভাবেই উৎসবে এসেছেন।
এই আয়োজনটির মধ্যদিয়ে সংস্কৃতিচর্চার বন্ধ জানালা খুলে গেল বলে মন্তব্য করেন উদযাপন পরিষদের সহ-সভাপতি কাজল দেবনাথ। তিনি বলেন, বিগত সময় মবসন্ত্রাস, মাজারে হামলা, সাংস্কৃতিক আয়োজন বন্ধের কারণে সংস্কৃতিচর্চা একটা বন্ধ্যা সময় পার করেছে। আমরা এই আয়োজনটি করতে পেরেছি এবং এই আয়োজনটির মধ্যদিয়ে সংস্কৃতিচর্চার বন্ধ জানালাটা খুলে গেল।
এ উৎসবে সমবেত কণ্ঠে গান পরিবেশন করে বহ্নিশিখা, সত্যেন সেন শিল্পীগোষ্ঠী ও সুরবিহার। দলীয় নৃত্যে অংশ নেন কত্থক নৃত্য সম্প্রদায়, ধৃতি নর্ত্যনালয়, ভাবনা, নৃত্যাক্ষ, জাগো আর্ট সেন্টার, স্পন্দন, ফিফা চাকমা গারো কালচারাল একাডেমি, আঙ্গিকাম, সাধনা, তুরঙ্গমী, নন্দ শিল্প একাডেমি, স্বপ্ন বিকাশ কলা কেন্দ্র, দিব্য, নন্দিনী নৃত্যালয়, নর্তনম, নবচেতনা, নৃত্যালোক, গারো কালচারাল একাডেমি, বাংলাদেশ গৌড়ীয় নৃত্য একাডেমি ও অংশী।
একক কণ্ঠে গান শোনান ফাহিম হোসেন চৌধুরী, মহাদেব ঘোষ, সুচি দেবনাথ, অনিমা রায়, বিজন চন্দ্র মিস্ত্রি, বিমান চন্দ্র বিশ্বাস, তানজিলা তমা, অবিনাস বাউল, সঞ্চিতা রাখি, মারুফ হোসেন, এস এম মেজবা, শ্রাবণী গুহ রায় ও ফেরদৌসী কাকলি। আবৃত্তি করেন বেলায়েত হোসেন ও নায়লা তারাননুম চৌধুরী কাকলি।
এমআই/আরএমডি