ক্যামেরার সামনে-পেছনে যারা ছিলাম, এটা আমাদের সবার ফিল্ম
মস্কো আন্তর্জাতিক চলচ্চিত্র উৎসবের প্রশংসা কুড়িয়েছে ‘কিং ইন দ্য ল্যান্ড অব দ্য প্রিন্সেস’ ছবিটি। উৎসবের ৪৮তম আসর শেষে দেশে ফিরেছেন ছবির পরিচালক আসিফ ইসলাম। সেখানকার অভিজ্ঞতা তিনি ভাগাভাগি করেছেন জাগো নিউজের সঙ্গে।
জাগো নিউজ: মস্কো আন্তর্জাতিক চলচ্চিত্র উৎসব থেকে প্রাপ্তি কী? ছোট্ট করে একটা দুটো শেয়ার করুন।
আসিফ ইসলাম: রাশিয়ায় বাংলাদেশের রাষ্ট্রদূত মো. নজরুল ইসলাম আমাদের সিনেমা দেখতে এসেছিলেন। তিনি যে ছবিটা দেখতে গেছেন, তাতেই আমরা খুব খুশি। তিনি কিন্তু সিনেমাটা দেখেই চলে যাননি। আলাদাভাবে প্রতিক্রিয়া জানানোর জন্য অপেক্ষা করেছেন। এই ঘটনায় পরিচালক হিসেবে আমি সম্মানিত বোধ করেছি।
জাগো নিউজ: প্রতিক্রিয়ায় কী বললেন তিনি?
আসিফ ইসলাম: তিনি বলেছেন, ফিল্মটা তার খুব ভালো লেগেছে। তিনি ছোটবেলায় যাত্রাপালা দেখেছেন, ফলে এই সিনেমা দেখতে গিয়ে শৈশবের কথাও তার মনে পড়ে গেছে। এই যাত্রাপালা, এর মিউজিক দেখে তার মনে হয়েছে যে, এটা পারফেক্টলি এডিটেড একটা ফিল্ম। কোনো কিছুর বাড়াবাড়িও নেই, কমতিও নেই। তিনি বললেন, কদিন আগে তিনি দেশের একটা মূলধারার সিনেমা দেখে হতাশ হয়েছেন। আমাদের ছবি দেখে যে পজিটিভ রিভিউ দিয়েছেন, এটা আমাদের কাছে গুরুত্বপূর্ণ।
ওয়ার্ল্ড প্রিমিয়ারে প্রযোজক জান্নাতুল বাকের খান, আশনা হাবিব ভাবনা, রাশান সঞ্চালক ও পরিচালক আসিফ
জাগো নিউজ: আর কেউ, গুরুত্বপূর্ণ কিছু বললেন?
আসিফ ইসলাম: নেটপ্যাকের একজন জুরি আমাদের ছবিটা দেখেছেন। ওঁর নাম ম্যাক্সিন উইলিয়ামসন। তার কথাটা এখনও আমার মাথার ভেতর ঘুরছে। তিনি বলেছেন, এটা খুব ইমপরটেন্ট একটা পিস। এর একটা আর্কাইভ্যাবল ভ্যালু আছে। তিনি বেশ গুরুত্ব সহকারে ছবিটা দেখেছেন, প্রশ্ন করার আর প্রতিক্রিয়া জানানোর ভাষা থেকে সেটা বুঝতে পেরেছি।
জাগো নিউজ: কী প্রশ্ন, কী জানতে চাইলেন তিনি?
আসিফ ইসলাম: প্রথমে তো প্রতিক্রিয়ায় অনেক কিছু বললেন। যাত্রাশিল্পীদের ব্যাপারে জানতে চাইলেন। বাংলাদেশের যাত্রাপালার আর্টফর্ম নিয়ে কিছু প্রশ্ন করলেন। তিনি আসলে ইমোশনালি অ্যাচাট হয়ে গিয়েছিলেন ছবিটায়। যাত্রাদলের অরবিন্দ মজুমদার, ভাবনা, সবার পারফরমেন্সে তিনি হ্যাপি। বলছিলেন, যাত্রাশিল্পীদের ফেসগুলো অনেক গল্প বলে। আমি নাকি এই ফিল্মে অনেক গল্প ব্যবহার করেছি। তিনি যে ব্যাপারটা খুব অ্যাপ্রিশিয়েট করেছেন, সেটা হচ্ছে সিনেমাটোগ্রাফির। তিনি বলেছেন, সিনেমাটোগ্রাফির কারণে জিনিসটা চমৎকারভাবে ফুটে উঠেছে। প্রতিটি ফেসের যে একটা গল্প আছে, সেটা স্ক্রিনে যতটুকুই আসুক বা না আসুক, গল্প দেখে বোঝা যায় তাদের স্ট্রাগল, বোঝা যায়, যাত্রা তাদের জন্য কতটা গুরুত্বপূর্ণ।
‘কিং ইন দ্য ল্যান্ড অব দ্য প্রিন্সেস’ ছবির একটি দৃশ্যে যাত্রা উপভোগ করছেন গ্রামের মানুষ
জাগো নিউজ: আপনাদের সিনেমাটার তাহলে নেটপ্যাক জয়ের সুম্ভাবনা ছিল?
আসিফ ইসলাম: ছিল হয়তো। ম্যাক্সিনের কথা শুনে ভেবেছিলাম পেয়ে যাব। কিন্তু পুরস্কার পেল চীনের ‘দ্য লাস্ট সামার’। আমি চেয়েছিলাম, আমাদের ছবিটা না পাক, যুবরাজ শামীমের ‘অতল’ সিনেমাটা পুরস্কারটা পাক, পুরস্কারটা দেশে আসুক।
জাগো নিউজ: মস্কোতে ছবির ওয়ার্ল্ড প্রিমিয়ারে দর্শক হিসেবে কারা এসেছিলেন, বাঙালি কেউ ছিলেন?
আসিফ ইসলাম: রুশ অডিয়েন্স ছিলেন, বাংলাদেশেরও ছিলেন। অডিয়েন্সের রিয়্যাকশন ভালো লেগেছে। সবাই খুব অ্যাপ্রিশিয়েট করেছেন। স্পেশালি যাত্রার কারণে অ্যাপ্রিশিয়েটেড হয়েছে ছবিটা। দর্শকেরা বলাবলি করছিলেন, খুব চমৎকার ফিল্ম, বিউটিফুল শট, বাট ভেরি পেইনফুল অ্যাট দ্য এন্ড।
প্রযোজক ও পরিচালক
জাগো নিউজ: আপনার ছবির প্রযোজক জান্নাতুল বাকের খান। এটাই বোধহয় তার প্রযোজনায় প্রথম ছবি। সবকিছু দেখে তার প্রতিক্রিয়া কী?
আসিফ ইসলাম: আমার প্রডিউসার সিনেমা দেখার পর... এই ছবির প্রডিউসার হতে পেরে তিনি ভয়াবহ গর্বিত বোধ করছিলেন। তার গর্বের জায়গাটা হলো, প্রথম প্রডিউসিং ফিল্ম, এত প্রশংসা পাবে, তাও মস্কোর মতো প্লাটফর্মে, এসব তার ধারণায় ছিল না। প্রথম ফিল্ম নিয়ে তিনি খুবই হ্যাপি। আমার প্রতি খুবই থ্যাঙ্কফুল। আমাকে সব ক্রেডিট দিয়ে দিচ্ছিলেন। কিন্তু আমি ব্যাপারটাকে এভাবে দেখতে চাই না। ফিল্ম একটা কোলাবোরেটিভ আর্ট ফর্ম। এখানে প্রত্যেকের ভূমিকা গুরুত্বপূর্ণ। ক্যামেরার সামনে-পেছনে যারা ছিলাম, এটা আমাদের সবার ফিল্ম। আমরা সবাই খুবই প্রাউড।
জাগো নিউজ: মস্কোতে যুবরাজ শামীমের সিনেমা ‘অতল’ দেখেছেন? ফেসবুকে দেখলাম আপনারা একসঙ্গে!
আসিফ ইসলাম: আমরা ‘অতলের’ প্রিমিয়ারে ছিলাম। এটা অন্যরকম একটা ফিল্ম। আমরা একসঙ্গেই ছবিটা দেখলাম, ডিরেক্টর ও অ্যাক্টরের পাশে বসে। তাদের প্রেসমিটে যুবরাজের ছবি, প্রেজেন্টেশনের ভিডিওর দায়িত্ব ছিল আমার। সিনেমার প্রদর্শনীর পর প্রশ্নোত্তর পর্বের ছবি তুলে দিলাম। আমরা ভালো সময় কাটিয়েছি।
জাগো নিউজ: রাশিয়ায় অনেক বাঙালি থাকেন। তাদের কারো সঙ্গে সাক্ষাৎ হয়েছে?
আসিফ ইসলাম: সোহেল ভাই নামে একজনের সঙ্গে আলাপ হলো। বহুবছর তিনি সেদেশে থাকেন। তিনি আমাদের দাওয়াত করেছিলেন। একটা রেস্তোরাঁয় নিয়ে গেলেন, আপ্যায়ন করলেন, বাঙালি কমিউনিটি, লোকাল ব্যবসায়ীদের সঙ্গে পরিচয় করিয়ে দিলেন। চমৎকার একটা ডিনার করালেন, ট্যাক্সিকরে আমাদের হোটেলে নামিয়ে দিয়ে গেলেন। আরেকটা পরিবার, হাজবেন্ড-ওয়াইফ সেখানকার স্টুডেন্ট, বাসা থেকে গরুর মাংস রান্না করে আমাদের হোটেলে দিয়ে গেলেন, আমরা আমাদের হোটেলে বসে খেলাম। একটা সিনেমার সুবাদে এই যে সম্মান, আতিথেয়তা, বাংলাদেশের ভাই-বোনদের ভালোবাসা, এটা অমূল্য প্রাপ্তি। ভাবা যায়, রাশিয়ার একটা ফাইভ স্টার হোটেলের রুমে বসে বাঙালি এক বোনের রান্না করা গরুর মাংস দিয়ে ভাত খাচ্ছি! সিনেমা প্রজেকশনের পর থেকে প্রায় প্রতিদিন প্রযোজক ও পরিচালক দাওয়াত খেয়ে বেরিয়েছি।
তরুণ চলচ্চিত্রকার যুবরাজ শামীমের সঙ্গে আসিফ ইসলাম
জাগো নিউজ: অতলের নির্মাতা যুবরাজ শামীমের কী অবস্থা?
আসিফ ইসলাম: যুবরাজের সঙ্গে অনেক আড্ডা দিয়েছি, আমরা ভবিষ্যৎ প্ল্যান শেয়ার করেছি। একটা সময় পর্যন্ত জানতামই না যে, আমাদের দুজনার সিনেমা একই প্রতিযোগিতায় লড়ছে! যখন জানতে পারলাম, যুবরাজ বলছিল, ভাই দোয়া কইরেন, যেন জিতে যাই। আমিও রসিকতা করে বলেছি, তোমার জন্য দোয়া করবো নাকি নিজের জন্য (হা হা হা)! তবে আমি মনে-প্রাণে চেয়েছি, পুরস্কারটা বাংলাদেশে আসুক। সে নিজের মতো করে, কষ্ট করে, ছবি বানায়। ওর জন্যও দোয়া করেছি।
জাগো নিউজ: ভাবনা কেমন করেছে ছবিটায়?
আসিফ ইসলাম: তার অভিনয় প্রশংসিত হয়েছে।
জাগো নিউজ: বাংলাদেশের মানুষ এই সিনেমা কবে দেখবে?
আসিফ ইসলাম: সিনেমাটি আরও কয়েকটি দেশে ঘুরবে, উৎসবের দর্শকেরা দেখবেন, তারপর দেশে মুক্তি পাবে। একটা বিশেষ প্রদর্শনীর কথাও ভেবেছি। তবে এটা ‘বাণিজ্যিক’ সিনেমা নয় যে, ঘটা করে মুক্তি দেবো, বক্স অফিসের আয়ের অঙ্ক জানান দেবো।
আরও পড়ুন:
মস্কোর সিনেমা উৎসবে যাত্রাশিল্পীদের নিয়ে যাচ্ছেন আসিফ
আরএমডি