মানুষের শরীরের অঙ্গপ্রত্যঙ্গের সংগ্রহশালা এই জাদুঘর

ফিচার ডেস্ক
ফিচার ডেস্ক ফিচার ডেস্ক
প্রকাশিত: ০৪:০৩ পিএম, ১৮ মে ২০২৬
বছরের পর বছর ধরে কাচের বাক্সে এসব সংগ্রহ যেন স্মৃতি আর ইতিহাস বুকে নিয়ে দাঁড়িয়ে আছে নতুন প্রজন্মকে জানাতে

মানব শরীরের ভেতরটা সবসময়ই মানুষের কৌতূহলের কেন্দ্রবিন্দু। বাইরে থেকে আমরা যতটুকু দেখি, তার চেয়ে ভেতরের জটিলতা বহু গুণ বেশি রহস্যময়। আর এই রহস্যকে বুঝতে, ব্যাখ্যা করতে এবং চিকিৎসা বিজ্ঞানের অগ্রগতিকে সামনে আনতে তৈরি হয়েছে এমন কিছু জায়গা, যেখানে শরীর শুধু জীববিজ্ঞানের বিষয় নয় বরং ইতিহাস, গবেষণা আর বিস্ময়ের এক জীবন্ত সংগ্রহশালা। এমনই এক ব্যতিক্রমী জায়গা হলো যুক্তরাষ্ট্রের ফিলাডেলফিয়ায় অবস্থিত ম্যুটার মিউজিয়াম।

এই জাদুঘরকে সাধারণ কোনো জাদুঘরের সঙ্গে তুলনা করা যায় না। এখানে ঢুকলেই মনে হয়, আপনি কোনো আর্ট গ্যালারিতে নন বরং মানব শরীরের ভেতরের ইতিহাসে প্রবেশ করেছেন। চিকিৎসা বিজ্ঞানের অগ্রগতি, বিরল রোগের বাস্তব চিত্র, আর মানুষের শারীরিক বৈচিত্র্যের এক নিখুঁত দলিল এখানে সাজানো আছে কাঁচের বাক্সে, নিঃশব্দে। বছরের পর বছর ধরে কাচের বাক্সে এসব সংগ্রহ যেন স্মৃতি আর ইতিহাস বুকে নিয়ে দাঁড়িয়ে আছে নতুন প্রজন্মকে জানাতে।

jagonews

ম্যুটার মিউজিয়াম মূলত একটি মেডিকেল মিউজিয়াম, যা তৈরি হয়েছিল মেডিকেল ছাত্রদের জন্য। ম্যুটার মিউজিয়ামের সূচনা ১৯ শতকের মাঝামাঝি সময়ে, যখন আমেরিকান সার্জন ড. থমাস ডেন্ট ম্যুটার চিকিৎসা শিক্ষাকে আরও বাস্তব ও ব্যবহারিক করার উদ্দেশ্যে একটি অনন্য সংগ্রহ গড়ে তোলেন। তিনি বিশ্বাস করতেন, শুধু বই পড়ে নয় বরং বাস্তব মানব শরীর ও রোগের উদাহরণ দেখেই চিকিৎসা শিক্ষার্থীরা বেশি ভালোভাবে শিখতে পারবে। এই ভাবনা থেকেই তিনি তার ব্যক্তিগত মেডিকেল সংগ্রহ দান করেন, যা পরবর্তীতে এই জাদুঘরের ভিত্তি তৈরি করে।

১৮৬৩ সালে তার মৃত্যুর পর এই সংগ্রহ আনুষ্ঠানিকভাবে একটি প্রতিষ্ঠানের অংশ হয়ে যায় এবং ধীরে ধীরে এটি আজকের ম্যুটার মিউজিয়ামে রূপ নেয়। মূলত ১৮৫০-এর দশক থেকেই এখানে মানবদেহ, হাড়, অঙ্গপ্রত্যঙ্গ এবং বিরল রোগে আক্রান্ত শরীরের নমুনা সংগ্রহ শুরু হয়। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে এই সংগ্রহ আরও বিস্তৃত হয় এবং চিকিৎসা বিজ্ঞানের ইতিহাসের একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশে পরিণত হয়।

jagonews

এই মিউজিয়াম তৈরির মূল উদ্দেশ্য ছিল চিকিৎসা শিক্ষার্থীদের জন্য বাস্তব অভিজ্ঞতা তৈরি করা, যাতে তারা মানব শরীরের গঠন, রোগের প্রভাব এবং চিকিৎসার পরিবর্তনগুলো সরাসরি বুঝতে পারে। আজও ম্যুটার মিউজিয়াম সেই একই উদ্দেশ্য নিয়ে সংরক্ষিত আছে যেখানে মানব দেহ শুধু প্রদর্শন নয়, বরং শিক্ষা, গবেষণা এবং ইতিহাসের এক জীবন্ত দলিল হিসেবে কাজ করছে।

এই সংগ্রহগুলো শুধু প্রদর্শনের জন্য নয়, বরং চিকিৎসা শিক্ষার্থীদের শেখার জন্য তৈরি করা হয়েছিল। কীভাবে বিভিন্ন রোগ শরীরকে পরিবর্তন করে, কীভাবে চিকিৎসা বিজ্ঞান ধাপে ধাপে উন্নত হয়েছে সবকিছুই এখানে বাস্তব উদাহরণের মাধ্যমে বোঝানো হয়। জাদুঘরটি নতুন গবেষণাকেও উৎসাহিত করে চলেছে।

jagonewsএই ফাঁকে একটি তথ্য দিয়ে রাখি। ২০১৪ সালে গবেষকরা জাদুঘরের সংগ্রহশালা থেকে অধ্যয়ন করে কলেরা সম্পর্কে একটি নতুন আবিষ্কার করেন। ম্যুটার মিউজিয়ামের প্রাক্তন পরিচালক রবার্ট হিকস রবার্ট হিকস জানান, এই প্রথমবার গবেষকরা কলেরায় মৃত কোনো ব্যক্তির নমুনা থেকে কার্যকর ডিএনএ বের করতে সক্ষম হয়েছিলেন। এক্ষেত্রে নমুনাটি ছিল এমন একজনের যিনি ১৮৪৯ সালে ফিলাডেলফিয়ায় এই রোগে মারা গিয়েছিলেন। অর্থাৎ ওই ব্যক্তির মৃত্যুর ১৬৫ বছর পর এই আবিষ্কার করা হয়।

আবার শুধু যে গবেষণা করা হয় তা নয়, এখান থেকে মানব দেহাবশেষ স্বদেশেও ফেরত পাঠানো হয়েছে। ২০১৭ সালে অস্ট্রেলীয় সেনাবাহিনী প্রথম বিশ্বযুদ্ধের তাদের একজন সৈনিকের দেহাবশেষ পুনরায় সমাহিত করার জন্য অনুরোধ করলে, জাদুঘরটি তা করে দেয়। অস্ট্রেলীয় সেনাবাহিনী জাদুঘরটির একটি অনলাইন প্রদর্শনী ‘মেমেন্টো ম্যুটার’-এর মাধ্যমে এই বিষয়টি জানতে পারে। তারপর তারা অনুরোধ জানালে জাদুঘর কর্তৃপক্ষ সৈন্যটির দেহাবশেষ ফেরত পাঠায় তার দেশে।

jagonewsঅনেক দর্শনার্থীর কাছে এই মিউজিয়ামের সবচেয়ে বড় বিস্ময় হলো এর অদ্ভুত সংগ্রহ। এখানে রয়েছে বিকৃত হাড়ের কাঠামো, বিরল জন্মগত রোগে আক্রান্ত দেহাংশ, এবং এমন কিছু মেডিকেল কেস যা সাধারণ জীবনে খুব কমই দেখা যায়। কিন্তু মিউজিয়ামের মূল দর্শন হলো এগুলোকে ‘অস্বাভাবিকতা’ হিসেবে না দেখে, মানব বৈচিত্র্যের অংশ হিসেবে দেখা। প্রতিটি নমুনার পেছনে আছে একজন মানুষের জীবন, একটি গল্প, এবং একটি বাস্তব চিকিৎসা ইতিহাস।

এই জাদুঘরের সবচেয়ে আলোচিত গল্পগুলোর একটি হলো রবার্ট পেন্ডারভিসের ঘটনা। তিনি অ্যাক্রোমেগালি নামের একটি বিরল রোগে আক্রান্ত ছিলেন, যেখানে শরীরে অতিরিক্ত গ্রোথ হরমোন তৈরি হয়ে হাড়, অঙ্গপ্রত্যঙ্গ এবং টিস্যু অস্বাভাবিকভাবে বাড়তে থাকে। এই রোগ ধীরে ধীরে তার হৃদপিণ্ডকেও প্রভাবিত করে, এমনকি একটি হার্ট ভালভ থেকে রক্তক্ষরণ শুরু হয়।

২০২০ সালে তার হৃদপিণ্ড প্রতিস্থাপন করা হয়। কিন্তু পেন্ডারভিস মনে করেছিলেন, তার পুরোনো হৃদয় শুধু একটি অঙ্গ নয় এটি একটি গল্প। এমন একটি গল্প, যা চিকিৎসা বিজ্ঞান এবং বিরল রোগ সম্পর্কে মানুষকে শেখাতে পারে। এই বিশ্বাস থেকেই তিনি সিদ্ধান্ত নেন, তার হৃদপিণ্ড দান করবেন ম্যুটার মিউজিয়ামে। তার মতে, এই হৃদয় শুধু আমার নয়, এটি অ্যাক্রোমেগালির বাস্তব ইতিহাস।

jagonews

মিউজিয়াম কর্তৃপক্ষও তার সাক্ষাৎকার নিয়ে একটি ভিডিও প্রকাশ করেছিল, যেখানে তিনি নিজের রোগ এবং চিকিৎসা ইতিহাস ব্যাখ্যা করেন। সেই ভিডিওটি চিকিৎসক ও নার্সদের কাছে তাকে পরিচিত করার একটি মাধ্যম হয়ে ওঠে। তবে পরবর্তিতে জাদুঘরটি তাদের সব অনলাইন কনটেন্ট সরিয়ে নেয়, তাই চাইলে এখন সেটি দেখার সুযোগ পাবেন না।

এই মিউজিয়ামের অন্যতম আলোচিত সংগ্রহ হলো বিশাল মানব খুলি, যেখানে বিভিন্ন বয়স, গঠন ও রোগের কারণে পরিবর্তিত খুলি সংরক্ষিত আছে। অস্বাভাবিক কঙ্কাল, জন্মগত রোগে আক্রান্ত দেহাবশেষ, এমনকি মৃত অবস্থায় জোড়া লাগানো যমজ শিশুদের সংরক্ষিত নমুনাও রয়েছে এখানে।

এছাড়া রয়েছে ‘সোপ লেডি’ নামে পরিচিত একটি সংরক্ষিত মানব দেহ, যা প্রাকৃতিকভাবে সাবানের মতো পদার্থে রূপান্তরিত হয়েছিল এটি মিউজিয়ামের সবচেয়ে রহস্যময় প্রদর্শনীগুলোর একটি। এছাড়াও রয়েছে বিখ্যাত চিকিৎসক ডঃ টমাস ডেন্ট ম্যুটারের সংগ্রহ করা প্রাচীন মেডিকেল সরঞ্জাম, যা দিয়ে একসময় অস্ত্রোপচার করা হতো যখন আধুনিক অ্যানেস্থেশিয়া বা প্রযুক্তি ছিল না।

jagonews

প্রথম দেখায় এটি কিছুটা অস্বস্তিকর মনে হতে পারে, কিন্তু ম্যুটার মিউজিয়ামের গুরুত্ব শুধু কৌতূহলে সীমাবদ্ধ নয়। এটি চিকিৎসা শিক্ষার একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ। এখানে শিক্ষার্থীরা বাস্তব রোগ, শরীরের পরিবর্তন এবং চিকিৎসার ইতিহাস সরাসরি দেখতে পারে। এই অভিজ্ঞতা বইয়ের পাতার বাইরে গিয়ে বাস্তব জ্ঞান দেয়। অনেক ডাক্তার ও গবেষক এই মিউজিয়ামকে চিকিৎসা বিজ্ঞানের ভিজ্যুয়াল লাইব্রেরি হিসেবে বিবেচনা করেন।

মানুষের শরীরের প্রতি এক নতুন দৃষ্টিভঙ্গি তৈরি করে এই সংগ্রহশালা। এই মিউজিয়াম আমাদের শেখায় মানুষের শরীর নিখুঁত নয়, বরং পরিবর্তনশীল এবং বৈচিত্র্যময়। প্রতিটি অঙ্গ, প্রতিটি রোগ, প্রতিটি পরিবর্তনই একটি গল্প বলে। এখানে এসে অনেক দর্শনার্থী প্রথমে বিস্মিত হয়, তারপর ধীরে ধীরে বুঝতে পারে এটি ভয় দেখানোর জায়গা নয়, বরং বোঝার জায়গা। মানুষের শরীর কতটা জটিল এবং একই সঙ্গে কতটা ভঙ্গুর, তা এখানে খুব কাছ থেকে অনুভব করা যায়।

সূত্র: দ্য গার্ডিয়ান, দ্য নিউ ইয়ার্কার, দ্য নিউইয়ার্ক টাইমস

কেএসকে

পাঠকপ্রিয় অনলাইন নিউজ পোর্টাল জাগোনিউজ২৪.কমে লিখতে পারেন আপনিও। লেখার বিষয় ফিচার, ভ্রমণ, লাইফস্টাইল, ক্যারিয়ার, তথ্যপ্রযুক্তি, ধর্ম, কৃষি ও প্রকৃতি। আজই আপনার লেখাটি পাঠিয়ে দিন [email protected] ঠিকানায়।