যে কারণে বাড়ছে দাবদাহ, করণীয় কী?

মামুনূর রহমান হৃদয়
মামুনূর রহমান হৃদয় মামুনূর রহমান হৃদয় , ফিচার লেখক
প্রকাশিত: ০৬:০০ পিএম, ০৫ এপ্রিল ২০২৪

তীব্র গরমে বাইরে বের হতে ভাবতে হচ্ছে সাতবার। যারা বের হচ্ছেন; তারা অনেকেই ব্যবহার করছেন ছাতা। শ্রমজীবীরা দাবদাহ থেকে রক্ষা পেতে মাথায় দিচ্ছেন গামছা বা পরছেন ক্যাপ। ছায়া পেতে গাছের নিচ দিয়ে চলার চেষ্টা করছেন কেউ কেউ। তবে রাজধানীর বুকে সেই সুযোগ কতটুকু! বিপাকে বেশি পড়ছেন খেটে খাওয়া মানুষেরা। দাবদাহ সহ্য করেই চালিয়ে যাচ্ছেন কাজ।

রাজধানীর কারওয়ান বাজারে তরুণ বয়স থেকেই কুলির কাজ করেন সামাদ মিয়া। কারওয়ান বাজারে কেনাকাটা করতে আসা মানুষের জিনিসপত্র মাথায় করে পৌঁছে দেওয়াই তার কাজ। বিনিময়ে পান সামান্য পারিশ্রমিক। তবে বেশ কিছুদিন ধরে তীব্র দাবদাহে কাজ করতে হিমশিম খাচ্ছেন তিনি। সামাদ মিয়া বলেন, ‘দীর্ঘদিন থেকেই মাথায় মালামাল বয়ে বেড়াচ্ছি। ইদানিং অতিরিক্ত গরমে কাজ করতে অসুবিধা হচ্ছে। ভ্যাপসা গরম না কমলে সামনে কাজ করা কষ্ট হয়ে পড়বে।’

সামাদ মিয়ার মতো রাজধানীর বুকে তাপমাত্রার বৃদ্ধির প্রভাবে অন্যদের দৈনন্দিন জীবন বিপর্যস্ত হয়ে উঠেছে। আশঙ্কাজনক হারে এ দাবদাহ বৃদ্ধির কারণ বনাঞ্চল ধ্বংস করে নগরায়ন ও শিল্পায়নসহ অপরিকল্পিত উন্নয়ন। মানুষের এসব উন্নয়নের সঙ্গে জলবায়ুর উন্নতির কোনো সম্পর্ক নেই। ফলে রাজধানী হয়ে যাচ্ছে জ্বলন্ত চুলা।

কথা হয় ফার্মগেটে বাসের জন্য অপেক্ষা করতে থাকা শাহাদাত নিশাদের সঙ্গে। তিনি বলেন, ‘সকালবেলায়ও এত উত্তপ্ত নগরী। বাসে উঠলে গরম আরও বেড়ে যায়। তবে অফিসের কাজের জন্য ঘরে বসে থাকার সুযোগ নেই।’

যে হারে তাপমাত্রা বাড়ছে, তাতে এখনই উদ্যোগ না নিলে বসবাসের অনুপোযোগী হয়ে উঠবে। রাজধানীর পাশাপাশি জেলা শহরগুলোও তাপমাত্রার রেকর্ড ভেঙে দিচ্ছে। অতিরিক্ত গরমে অসুস্থ হচ্ছে মানুষ। উচ্চ রক্তচাপ, মাথাব্যথা, হিটস্ট্রোক ও বমির সমস্যা নিয়ে হাসপাতালে ভর্তি হচ্ছেন অনেকেই।

আরও পড়ুন

একটি দেশের পরিবেশগত ভারসাম্য রক্ষায় মোট ভূখণ্ডের ২৫ ভাগ বনভূমি থাকা দরকার। কিন্তু আমাদের দেশে প্রয়োজনের তুলনায় বনভূমির পরিমাণ অনেক কম। যা দিন দিন আরও কমছে। বৃষ্টিপাত কমে যাচ্ছে এবং আবহাওয়া হচ্ছে উত্তপ্ত। পুকুর, দীঘি, জলাশয় ইত্যাদি ভরাট করায় শুষ্ক ও রুক্ষ হচ্ছে পরিবেশ। কোথাও কোথাও বাঁধ নির্মাণ করে নদীর স্বাভাবিক প্রবাহ রোধ করার ফলে শুকিয়ে চর হচ্ছে। দেখা দিচ্ছে খরা, ঘূর্ণিঝড় ও তীব্র দাবদাহের মতো প্রাকৃতিক দুর্যোগ।

এসব দুর্যোগ থেকে বাঁচতে গাছ লাগানো ছাড়া কোনো বিকল্প নেই। তাই বন নিধন বন্ধে পদক্ষেপ নেওয়ার পাশাপাশি প্রচুর পরিমাণে গাছ লাগাতে হবে। কেননা গাছ মানবদেহের জন্য ক্ষতিকর কার্বন-ডাই-অক্সাইড গ্রহণ করে অক্সিজেন ছড়িয়ে দেয়। ফলে উষ্ণতা কিছুটা কম থাকে।

স্টামফোর্ড ইউনিভার্সিটির বিজ্ঞান অনুষদের ডিন ও পরিবেশ বিজ্ঞান বিভাগের চেয়ারম্যান অধ্যাপক ড. আহমদ কামরুজ্জামান মজুমদার বলেন, ‘আমাদের তাপমাত্রা বাড়ার তিনটি বিষয় আছে। বৈশ্বিক, আঞ্চলিক ও স্থানীয়। সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ কারণ হলো স্থানীয় কারণ, যা স্থানীয়ভাবে তাপমাত্রা বৃদ্ধিতে সহায়তা করছে। স্থানীয় কারণগুলোর মধ্যেও পাঁচটি ভাগ রয়েছে। সবুজায়ন কমে যাওয়া, জলাভূমির পরিমাণ কমে যাওয়া, রাজধানীর যানবাহন ও তাপমাত্রা বৃদ্ধিতে সহায়ক হিসেবে কাজ করছে, ঢাকা শহরের পিচঢালা রাস্তা এবং নতুন করে তৈরি বহুতল ভবনগুলোতে অতিরিক্ত গ্লাসের ও এসির ব্যবহার।’

দাবদাহ কমিয়ে আনা প্রসঙ্গে তিনি বলেন, ‘যেই যেই কারণে তাপমাত্রা বৃদ্ধি পাচ্ছে; সেই বিষয়গুলো কমিয়ে আনতে হবে। যেমন সবুজের পরিমাণ বাড়াতে হবে, জলাধার সংরক্ষণ করতে হবে, প্রয়োজনে সংযোজন করতে হবে, বহুতল ভবনগুলোর অতিরিক্ত গ্লাস ও এসির পরিমাণ কমাতে হবে। পরিবেশবান্ধব এই কাজগুলো করলেই দাবদাহ কমিয়ে আনা সম্ভব।’

তাই ব্যক্তি উদ্যোগের পাশাপাশি সামাজিক ভাবেও বনায়নের ওপর গুরুত্ব দিতে হবে। যত বেশি গাছ লাগানো হবে; ততবেশি কার্বন শোষিত হবে, পরিবেশ হবে শীতল। গাছ লাগানোতে উৎসাহ ও প্রতিযোগিতামূলক মনোভাব তৈরিতে ভূমিকা রাখা উচিত। তবেই আমাদের মাতৃভূমি মরুভূমি হওয়া থেকে রক্ষা পাবে।

এসইউ/এএসএম

পাঠকপ্রিয় অনলাইন নিউজ পোর্টাল জাগোনিউজ২৪.কমে লিখতে পারেন আপনিও। লেখার বিষয় ফিচার, ভ্রমণ, লাইফস্টাইল, ক্যারিয়ার, তথ্যপ্রযুক্তি, কৃষি ও প্রকৃতি। আজই আপনার লেখাটি পাঠিয়ে দিন [email protected] ঠিকানায়।