সেমিনারে বক্তারা

হামের প্রাদুর্ভাব ঠেকাতে দোষারোপ নয়, দ্রুত সমাধান প্রয়োজন

জ্যেষ্ঠ প্রতিবেদক
জ্যেষ্ঠ প্রতিবেদক জ্যেষ্ঠ প্রতিবেদক
প্রকাশিত: ১০:২৩ এএম, ১৭ মে ২০২৬
শনিবার (১৬ মে) ডেইলি স্টারে তৌফিক আজিজ খান সেমিনার হলে বাংলাদেশ চাইল্ড প্রোটেকশন ইনিশিয়েটিভের ‘প্রতিরোধযোগ্য রোগের শিশু মৃত্যু নয়-জবাবদিহি, ন্যায়বিচার ও জরুরি জনস্বাস্থ্য পদক্ষেপ চাই’ শীর্ষক আলোচনা সভা হয়, ছবি: সংগৃহীত

হামের প্রাদুর্ভাবে প্রতিনিয়ত প্রাণ হারাচ্ছে কোনো না কোনো শিশু। খালি হচ্ছে মায়ের বুক। আতঙ্কে আক্রান্তরাও দৌড়াচ্ছেন এক হাসপাতাল থেকে অন্য হাসপাতালে। হাহাকার আইসিইউর জন্য। এমন অবস্থায় দোষারোপ করে দায়মুক্তি না দিয়ে কার্যকরি পদক্ষেপের মাধ্যমে সমস্যার দ্রুত সমাধান চান বিশিষ্টজনরা।

শনিবার (১৬ মে) ডেইলি স্টারে তৌফিক আজিজ খান সেমিনার হলে বাংলাদেশ চাইল্ড প্রোটেকশন ইনিশিয়েটিভের ‘প্রতিরোধযোগ্য রোগের শিশু মৃত্যু নয়-জবাবদিহি, ন্যায়বিচার ও জরুরি জনস্বাস্থ্য পদক্ষেপ চাই’ শীর্ষক আলোচনা সভায় বক্তারা এমন মত দেন।

আলোচনায় অংশ নেন তত্ত্বাবধায়ক সরকারের সাবেক উপদেষ্টা রাশেদা কে চৌধুরী, অভিনয়শিল্পী মেহের আফরোজ শাওন, সিনিয়র সাংবাদিক আবু সাঈদ খান, জ ই মামুন ও শিশির মোড়ল, জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক আহসান ইমাম, টিআইবির প্রতিনিধি জুলকারনাইন, নার্স আম্বিয়া সুলতানা, বিশ্লেষক আসিফ বিন আলী, লেখক আক্তারুজ্জামান আজাদসহ শিক্ষক, নার্স, লেখক, সাংস্কৃতিক ব্যক্তিত্ব, উন্নয়নকর্মী ও নাগরিক সমাজের প্রতিনিধিরা এতে অংশ নেন।

অনুষ্ঠানে বক্তারা বলেন, দায়িত্ব গ্রহণের আগে রাষ্ট্র পরিচালনায় সংশ্লিষ্টদের যে আন্তরিকতা ও সক্রিয়তা দেখা যায়, দায়িত্ব নেওয়ার পর তার অনেকটাই অনুপস্থিত থাকে। হামে একের পর এক শিশুমৃত্যুর ঘটনা ঘটলেও সমাজ ও রাষ্ট্র যেন সেটিকে অস্বাভাবিক কিছু হিসেবে দেখছে না। কীভাবে এমন একটি মানবিক বিপর্যয়কে স্বাভাবিক করে তোলা হলো এবং কারা এর জন্য দায়ী তা খুঁজে বের করে জবাবদিহির আওতায় আনতে হবে। তারা সতর্ক করে বলেন, সময়মতো কার্যকর উদ্যোগ না নিলে বাংলাদেশ ভবিষ্যতে একটি বড় স্বাস্থ্য ও প্রতিবন্ধিতা সংকটের মুখোমুখি হতে পারে।

বক্তারা আরও বলেন, হামে আক্রান্ত শিশুদের চিকিৎসা, পুনর্বাসন এবং মৃত্যুহার কমাতে রাষ্ট্রের দৃশ্যমান ও সমন্বিত পদক্ষেপ এখনো পর্যাপ্ত নয়। পরিস্থিতি মোকাবিলায় কার্যকর উদ্যোগের বদলে রাজনৈতিক দোষারোপই বেশি দেখা যাচ্ছে, অথচ এই সংকটে সবচেয়ে বেশি প্রয়োজন জরুরি ও বাস্তবমুখী পদক্ষেপ। শিশুদের জীবন রক্ষায় সরকার, সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠান এবং সমাজের সবাইকে দায়িত্বশীল ভূমিকা নিতে হবে।

তত্ত্বাবধায়ক সরকারের সাবেক উপদেষ্টা রাশেদা কে চৌধুরী বলেন, দেশে হামে আক্রান্ত হয়ে এত শিশু মারা গেলেও কেউ দায় নিচ্ছে না। দোষারোপের চেয়ে এখন জরুরি কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়া এবং সবার মধ্যে আত্মপলব্ধি তৈরি হওয়া। নিজের গৃহকর্মীর সন্তানের উদাহরণ দিয়ে তিনি বলেন, বাল্যবিয়ে হলেও মেয়েটিকে প্রাপ্তবয়স্ক হওয়ার আগে সন্তান না নিতে পরামর্শ দিয়েছিলেন। পরে ২০ বছর বয়সে সন্তান নেওয়ার পর সেই শিশু দুই মাস বয়সে হামে আক্রান্ত হয়ে মারা যায়। এমন বাস্তবতায় আক্রান্ত শিশুদের মায়েদের দিকে তাকানোও কঠিন হয়ে পড়ে।

তিনি আরও বলেন, শুধু হাম নয়, প্রতিবছর পানিতে ডুবে বহু শিশুর মৃত্যু হলেও কার্যকর উদ্যোগ দেখা যায় না। অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ে শিশু সুরক্ষায় একটি ডিপিপি নেওয়া হলেও তা বাস্তবায়িত হয়নি। অপুষ্টিতে ভোগা মায়েদের জন্যও পর্যাপ্ত গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে না। আন্তর্জাতিক দাতা সংস্থার প্রভাবের কারণে স্বাস্থ্য খাতে কাঙ্ক্ষিত বরাদ্দ নিশ্চিত করা যাচ্ছে না বলেও মন্তব্য করেন তিনি। হামে শিশুমৃত্যুকে এক ধরনের শিশু নির্যাতন আখ্যা দিয়ে রাশেদা কে চৌধুরী বলেন, শিশু সুরক্ষায় নারী ও শিশুবিষয়ক মন্ত্রণালয়ের দৃশ্যমান কোনো পদক্ষেপ নেই।

অভিনয়শিল্পী মেহের আফরোজ শাওন বলেন, ২০২৬ সালে এসেও হাম নিয়ে সচেতনতা তৈরির প্রয়োজন হওয়াটা অত্যন্ত দুঃখজনক। আগে ডায়রিয়ার মতো রোগ নিয়েও সরকারের সচেতনতামূলক প্রচার দেখা গেলেও এখন হামের মতো প্রাণঘাতী রোগ নিয়ে তেমন উদ্যোগ নেই। তিনি বলেন, টিকার প্রতি অনীহা ও বিভ্রান্তি বাড়লেও সচেতনতা তৈরির জায়গাগুলো কমে গেছে। ওয়াজ মাহফিলে টিকা নিয়ে বিভ্রান্তিকর বক্তব্য দেওয়া হলেও সে সবের বিরুদ্ধে কোনো ব্যবস্থা নেওয়া হয় না বলেও অভিযোগ করেন তিনি।

শাওন আরও বলেন, অল্প বয়সে বিয়ে, টিকা গ্রহণ ও গর্ভাবস্থায় নারীর পুষ্টির মতো গুরুত্বপূর্ণ বিষয়গুলো মসজিদের খুতবা বা ওয়াজে আলোচনায় আসে না। তিনি অভিযোগ করেন, অন্তর্বর্তী সরকারের সময় টিকা কেনায় গাফিলতি ছিল এবং বরাদ্দ থাকা সত্ত্বেও সময়মতো অর্থ ব্যয় করা হয়নি। স্বাস্থ্য উপদেষ্টার কাছে ফাইল গেলেও দ্রুত সিদ্ধান্ত হয়নি বলে দাবি করেন তিনি। অপুষ্টি নতুন সমস্যা নয় উল্লেখ করে শাওন বলেন, এবারের হামে শিশু মৃত্যুর দায় অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান ও সংশ্লিষ্ট নীতিনির্ধারকদের এড়ানোর সুযোগ নেই।

এসইউজে/এসএনআর

পাঠকপ্রিয় অনলাইন নিউজ পোর্টাল জাগোনিউজ২৪.কমে লিখতে পারেন আপনিও। লেখার বিষয় ফিচার, ভ্রমণ, লাইফস্টাইল, ক্যারিয়ার, তথ্যপ্রযুক্তি, ধর্ম, কৃষি ও প্রকৃতি। আজই আপনার লেখাটি পাঠিয়ে দিন [email protected] ঠিকানায়।