ডায়াবেটিস প্রতিরোধে এক যুগেও প্রণীত হয়নি নীতিমালা!

মনিরুজ্জামান উজ্জ্বল
মনিরুজ্জামান উজ্জ্বল মনিরুজ্জামান উজ্জ্বল , বিশেষ সংবাদদাতা
প্রকাশিত: ০৬:১৪ পিএম, ১৫ নভেম্বর ২০১৯

দেশের লাখ লাখ মানুষ ডায়াবেটিস রোগে আক্রান্ত হলেও অসংক্রামক এ রোগটি নিয়ন্ত্রণ ও প্রতিরোধে তথা রোগীদের সুচিকিৎসা নিশ্চিত করতে জাতীয় নীতিমালা নেই। ২০০৬ সালের ২০ ডিসেম্বর ‘ইউএন রেজুলেশন ৬১/২২৫’ শীর্ষক ঘোষণাপত্রে জাতিসংঘের প্রতিটি সদস্য রাষ্ট্রকে ডায়াবেটিস প্রতিরোধ ও চিকিৎসার বিষয়ে জাতীয় নীতিমালা প্রণয়নের তাগিদ দেয়া হয়। কিন্তু ১২ বছর পেরিয়ে গেলেও দেশে এখনও নীতিমালা প্রণীত হয়নি।

নীতিমালার অভাবে যথোপযুক্ত ও সঠিক প্রচার-প্রচারণার অভাবে প্রতি বছর নতুন করে হাজার হাজার নারী, পুরুষ ও শিশুর ডায়াবেটিসে আক্রান্ত হওয়ার ঝুঁকি তৈরি হচ্ছে বলে জানিয়েছেন ডায়াবেটিস বিশেষজ্ঞরা।

বাংলাদেশ ডায়াবেটিক সমিতি (বাডাস) সভাপতি অধ্যাপক ডা. এ কে আজাদ খান বলেন, ডায়াবেটিস মহামারি আকারে ছড়িয়ে পড়ছে। কায়িক শ্রম কমে যাওয়া, কম হাঁটা, অধিক তেলযুক্ত খাবার ও ফাস্টফুড খাওয়া, খেলাধুলা না করা, স্থূল হওয়া, মানসিক চাপ— এসব কারণে ডায়াবেটিসের প্রকোপ বাড়ছে।

তিনি জানান, গত বছর বাডাসের উদ্যোগে সারাদেশে এক লাখ লোকের ওপর পরিচালিত এক গবেষণা জরিপে দেখা গেছে, প্রতি চারজন লোকের একজন ডায়াবেটিসে আক্রান্ত। ফলে এ রোগ প্রতিরোধে জাতীয় নীতিমালা প্রণয়ন জরুরি হয়ে দাঁড়িয়েছে। বাডাসের পক্ষ থেকে একটি খসড়া নীতিমালা স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ মন্ত্রণালয়ে জমা দিলেও তা এখনও আলোর মুখ দেখেনি বলে তিনি জানান।

বাডাসের একাধিক কর্মকর্তা জানান, ডায়াবেটিস আক্রান্তদের হার বেড়ে যাওয়ার প্রধান কারণ অতি দ্রুত নগরায়ন। দ্রুত নগরায়নের ফলে পারিপার্শ্বিক অবস্থা এবং মানুষের জীবনযাত্রার পদ্ধতিও বদলে যাচ্ছে। শারীরিক পরিশ্রমের অভাব, চর্বি ও শর্করাসমৃদ্ধ খাদ্য গ্রহণ, অতিরিক্ত খাওয়া, ক্যালরিযুক্ত ফাস্টফুড ও কোমলপানীয় গ্রহণের অভ্যাস গড়ে ওঠায় মানুষের মধ্যে মোটা হওয়ার প্রবণতা দেখা দিয়েছে। এ ধরনের লোকদেরই ডায়াবেটিস হওয়ার ঝুঁকি বেশি। সাধারণত শরীর মোটা হলে ইনসুলিনের কার্যকারিতা কমে যায়। এ অবস্থায় রোগ সম্পর্কে গণসচেতনতা সৃষ্টির জন্য বিভিন্ন কর্মসূচি গ্রহণ করা একান্ত প্রয়োজন।

সংশ্লিষ্টরা বলছেন, ডায়াবেটিস বিস্তারের কারণ এবং এর ভয়াবহতা সম্পর্কে অবহিত করে সমাজের সর্বস্তরের মানুষকে রোগটি প্রতিরোধে স্বউদ্যোগী করে তুলতে হবে। গ্রাম ও শহরের ধনী-দরিদ্র নির্বিশেষে সবার জীবন-যাপন পদ্ধতির প্রক্রিয়ায় গুণগত পরিবর্তন এনে ডায়াবেটিস প্রতিরোধে এগিয়ে আসতে হবে। ডায়াবেটিসের বিষয়ে আগাম সতর্কতা অবলম্বনের সুবিধার্থে নিয়মিত রক্তসহ আনুষঙ্গিক পরীক্ষা-নিরীক্ষার সুযোগ সৃষ্টি করতে হবে। তবেই অবস্থার উন্নতি হবে। আইনগত কাঠামো বা নীতিমালা ছাড়া এ কাজ করা যাবে না।

বাডাস মহাসচিব মোহাম্মদ সাইফউদ্দিন জানান, খসড়া নীতিমালায় তারা স্কুল-কলেজসহ প্রাতিষ্ঠানিক পর্যায়ে ডায়াবেটিস প্রতিরোধী জোরালো কর্মকাণ্ড গ্রহণ, শহরের ফুটপাতগুলো হাঁটার উপযোগী রাখতে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেয়া, হাউজিং কোম্পানিগুলোকে তাদের প্রকল্পে যাতে মানুষ স্বাচ্ছন্দ্যে হাঁটাচলা করতে পারে তার ব্যবস্থা রাখতে তাগিদ, প্রাথমিক ও মাধ্যমিক পর্যায়ের পাঠ্যপুস্তকে ডায়াবেটিস সম্পর্কে সচেতনতা সৃষ্টিনর জন্য রচনা অন্তর্ভুক্ত করা, ফাস্টফুডসহ অন্যান্য উচ্চ ক্যালরিযুক্ত খাবারের প্যাকেটে ক্যালরির পরিমাণ ও উপাদান লিখে দেয়া বাধ্যতামূলক করা, ধূমপান প্রতিরোধ কর্মকাণ্ড জোরদার করা, ঢাকা শহরের কয়েকটি স্কুলের জন্য হলেও একটি খেলার মাঠের ব্যবস্থা করার ওপর গুরুত্ব প্রদানের প্রস্তাব মন্ত্রণালয়ে জমা দেন। কিন্তু তা এখনও আলোর মুখ দেখেনি।

খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, সারাদেশে ডাযাবেটিস বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকের সংখ্যা মাত্র ১৫০ জন। বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক না থাকায় এমবিবিএস চিকিৎসকরাই লাখ লাখ রোগীর চিকিৎসা দিচ্ছেন। কিন্তু সর্বজনীন নীতিমালা কিংবা চিকিৎসা গাইডলাইন না থাকায় চিকিৎসকরাও তাদের মতো করে চিকিৎসা দিচ্ছেন। অনেক সময় ওষুধ কোম্পানির লোকজনের দ্বারা প্রভাবিত হয়ে অপ্রয়োজনীয় ওষুধ লিখছেন।

বাডাস গত কয়েক বছরে প্রায় ১৫ হাজার চিকিৎসককে ডায়াবেটিসের চিকিৎসা পদ্ধতি সম্পর্কে প্রশিক্ষণ দিয়েছে। কিন্তু এ সংখ্যাও খুবই অপ্রতুল বলে মন্তব্য করেন বাডাস সভাপতি।

জানা গেছে, দেশের ডায়াবেটিস আক্রান্ত মোট রোগীর প্রায় ৫০ শতাংশ ইনসুলিন গ্রহণ করেন। কিন্তু কোনো ইনসুলিন সরাসরি দেশে উৎপাদন হয় না। বিদেশ থেকে তরল ইনসুলিন এনে তা বোতলজাত করে বিক্রি করা হচ্ছে। ইনসুলিন আমদানির শুরু থেকে বাজারজাত করা পর্যন্ত সঠিক পদ্ধতি অনুসরণ করা হয় কিনা তা দেখার জন্য ওষুধ প্রশাসন অধিদফতর থাকলেও কার্যত এক্ষেত্রে কার্যকর ভূমিকা পালন করছে না বলে অভিযোগ রয়েছে। নীতিমালা থাকলে এ সম্পর্কে সুস্পষ্ট নির্দেশনা থাকতো বলে বিশেষজ্ঞরা মনে করেন।

তারা বলছেন, বিভিন্ন অসংক্রামক রোগব্যাধির মধ্যে ডায়াবেটিস অন্যতম। সরকারিভাবে কোনো নীতিমালা না থাকায় ডায়াবেটিস প্রতিরোধ ও নিয়ন্ত্রণে কী ধরনের সরকারি এবং বেসরকারি পর্যায়ে বিশেষায়িত হাসপাতাল স্থাপন, কতজন চিকিৎসক প্রয়োজন, চিকিৎসা পদ্ধতি কি হবে, কোন ধরনের জনসচেতনতামূলক প্রচার-প্রচারণা পরিচালিত হবে, খাদ্যাভাস পরিবর্তন ও অধিক কায়িক পরিশ্রমে মানুষকে উদ্ধুদ্ধ করতে হবে।

২০০৬ সালের ২০ ডিসেম্বর ‘ইউএন রেজুলেশন ৬১/২২৫’ শীর্ষক ঘোষণাপত্রে জাতিসংঘের প্রতিটি সদস্য রাষ্ট্রকে ডায়াবেটিস প্রতিরোধ ও চিকিৎসার বিষয়ে জাতীয় নীতিমালা প্রণয়নের তাগিদ দেয়া হয়। আট বছর পর ২০১৪ সালে ‘জাতীয় ডায়াবেটিস প্রতিরোধ নীতিমালা’র খসড়া করে স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়। কিন্তু এরপর তিন বছর পার হলেও খসড়াটির কোনো খবর নেই। এ বিষয়ে কোনো অগ্রগতির খবরও জানাতে পারলেন না স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের শীর্ষ কর্মকর্তারা।
জাতিসংঘের রেজুলেশন গ্রহণে ১১ বছর পার হলেও জাতীয় নীতিমালাটি চূড়ান্ত হয়নি। দেশে ডায়াবেটিসের ক্রমবর্ধমাণ বিস্তারের মধ্যে রোগটি প্রতিরোধে দিকনির্দেশনা সম্বলিত জাতীয় নীতিমালা প্রণয়ন করে তা দ্রুত বাস্তবায়নের তাগিদ দিয়েছেন সংশ্লিষ্টরা।

বাডাস সভাপতি অধ্যাপক এ কে আজাদ খান এ প্রসঙ্গে জাগো নিউজকে বলেন, ‘কয়েক বছর আগে জাতীয় নীতিমালার বিষয়ে আন্তঃমন্ত্রণালয় সভা হয়েছিল। এরপর আমরা একটা খসড়া করেছিলাম। কিন্তু এটা চূড়ান্ত করতে কোনো উদ্যোগ দেখলাম না।’

বাংলাদেশে এখন আনুমানিক ৮০ লাখের বেশি ডায়াবেটিস রোগী আছে জানিয়ে তিনি বলেন, ‘দিন দিন তো এ রোগের ব্যাপকতা বেড়েই চলছে।’

অধ্যাপক এ কে আজাদ আরও বলেন, ‘যে খসড়াটি আমরা দিয়েছিলাম তা বাস্তবায়নের সঙ্গে তো সরকারের তেমন কোনো আর্থিক সংশ্লিষ্টতা নেই। নীতিমালাটি করতে তেমন টাকা খরচ হবে না। কিন্তু এটা জরুরি। সরকার এটা কেন চূড়ান্ত করছে না তা আমরা বুঝতে পারছি না!’

বাডাস সভাপতি বলেন, ‘২০০৬ সালে ইউএন ডে ফর ডায়াবেটিস যখন হলো, বাংলাদেশ সরকার তো তখন আমাদের অনুরোধেই জাতিসংঘে প্রেজেন্টেশন দিয়েছিল। ওই সময় যে রেজুলেশন হয় তাতে বলা হয়, প্রত্যেক দেশ একটা জাতীয় নীতিমালা করবে। এটা তো একটা মোরাল অবলিগেশন (নৈতিক বাধ্যবাধকতা)। সরকারের তো এটা করা উচিত।’

দুই বিভাগ হওয়ার আগে স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ মন্ত্রণালয়ের সচিব হিসেবে দায়িত্বে ছিলেন মো. সিরাজুল ইসলাম। গত ১৬ মার্চ মন্ত্রণালয় পুনর্গঠন ‘স্বাস্থ্যসেবা বিভাগ’ ও ‘স্বাস্থ্য শিক্ষা ও পরিবার কল্যাণ বিভাগ’ করা হয়।

পরে ‘স্বাস্থ্য শিক্ষা ও পরিবার কল্যাণ’ বিভাগের সচিবের দায়িত্ব পান মো. সিরাজুল ইসলাম। অন্যদিকে ‘স্বাস্থ্যসেবা’ বিভাগের সচিব হন মো. সিরাজুল হক খান।

ডায়াবেটিসের নীতিমালার বিষয়ে জানতে চাইলে মো. সিরাজুল ইসলাম জাগো নিউজকে বলেন, ‘আমি এখন আর ওই বিভাগের দায়িত্বে নেই। অন্য একজন সচিব এটা দেখছেন। তবে যখন দায়িত্বে ছিলাম তখন নীতিমালার বিষয়টি আমার নজরে আসেনি, তখন এটা নিয়ে কোনো কাজ হয়নি।’

মো. সিরাজুল হক খানের কাছে ডায়াবেটিস নীতিমালার বিষয়ে জানতে চাইলে তিনি জাগো নিউজকে বলেন, ‘আমি এ বিভাগের দায়িত্ব পেয়েছি বেশিদিন হয়নি। নীতিমালার বিষয়টি আমি এখনও জানি না। তবে আমি এ বিষয়ে খোঁজ নিয়ে নীতিমালাটি চূড়ান্ত করতে উদ্যোগ নেব।’

তিনি আরও বলেন, ‘আমরা প্রকৃতি থেকে যতই দূরে সরে যাচ্ছি, বিলাসী জীবন-যাপন করছি, নানা রকম ভাজাপোড়া ফ্যাট খাচ্ছি, নগরজীবী হয়ে যাচ্ছি। ফলে ডায়াবেটিস রোগীর সংখ্যা বাড়ছে। আমরা সবাই ধনী হয়ে যাচ্ছি। গ্রামে গেলাম, দেখলাম কেউ আর হাঁটে না। পাকা রাস্তা হয়ে গেছে, সবাই ভ্যানে চড়ে চলাচল করে। মানুষের অভ্যাসের কারণে ডায়াবেটিস বেড়ে যাচ্ছে। এটা প্রতিরোধে নীতিমালার প্রয়োজন আছে।’

শরীরের অগ্ন্যাশয় থেকে নিঃসৃত হরমোন ইনসুলিনের সহায়তায় রক্তের গ্লুকোজ (শর্করা) শক্তিতে পরিণত হয়। অগ্ন্যাশয় যদি যথেষ্ট ইনসুলিন তৈরি করতে না পারে বা শরীর যদি উৎপন্ন ইনসুলিন ব্যবহারে ব্যর্থ হয়, তাহলে যে রোগ হয় তা হলো ডায়াবেটিস বা বহুমূত্র রোগ। ইনসুলিনের অভাবে রক্তে শর্করার পরিমাণ বেড়ে যায় এবং এটা প্রস্রাবের মাধ্যমে শরীর থেকে বের হয়ে যায়। রক্তে শর্করার আধিক্য বা অনিয়ন্ত্রিত ডায়াবেটিসের কারণে হৃদপিন্ড, কিডনি, চোখ, দাঁতসহ গুরুত্বপূর্ণ অঙ্গগুলো সম্পূর্ণ বা আংশিক ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে।

বাংলাদেশ ডায়াবেটিক সমিতির খসড়া প্রস্তুতের সংঙ্গে সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন, পৃথিবীজুড়েই ডায়াবেটিস রোগীর সংখ্যা বাড়ছে, বর্তমানে মহামারি আকারে এর বিস্তার ঘটছে। চার ধরনের ডায়াবেটিস রয়েছে। টাইপ-১, টাইপ-২, গর্ভকালীন ডায়াবেটিস এবং অন্যান্য বিশেষ ধরনের ডায়াবেটিস। বাংলাদেশসহ দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার দেশগুলোতে খুব কম বয়সে টাইপ-২ ডায়াবেটিসে আক্রান্ত হওয়ার হার আতঙ্কজনকভাবে বেড়ে যাচ্ছে। বাংলাদেশে ডায়াবেটিস রোগীদের ৯৫ ভাগ টাইপ-২ এ আক্রান্ত। এটা কমানো সম্ভব।

এমইউ/এসএইচএস/পিআর