দ্য ইকোনমিস্টের প্রতিবেদন
জোর করেই গ্রিনল্যান্ড দখলে নেবেন ট্রাম্প?
ভেনেজুয়েলার প্রেসিডেন্ট নিকোলাস মাদুরোকে ধরে আনার একদিনের মধ্যেই যুক্তরাষ্ট্রের নজর পড়েছে গ্রিনল্যান্ডে। মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প স্পষ্ট করে বলেছেন, জাতীয় নিরাপত্তার স্বার্থে তাদের গ্রিনল্যান্ড প্রয়োজন। গত ৪ জানুয়ারি এয়ার ফোর্স ওয়ানে তিনি সাংবাদিকদের বলেন, কৌশলগত দিক থেকে গ্রিনল্যান্ড অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। তার ঘনিষ্ঠ সহযোগীরাও দ্রুত সেই অবস্থান জোরালো করেন।
হোয়াইট হাউজের প্রভাবশালী উপদেষ্টা স্টিফেন মিলার দাবি করেন, আর্কটিক অঞ্চল নিরাপদ রাখা এবং ন্যাটোর স্বার্থ রক্ষার জন্য গ্রিনল্যান্ডে যুক্তরাষ্ট্রের নিয়ন্ত্রণ প্রয়োজন। এরপরই হোয়াইট হাউজের পক্ষ থেকে ইঙ্গিত দেওয়া হয়, লক্ষ্য অর্জনে বিভিন্ন বিকল্প বিবেচনায় রয়েছে, যার মধ্যে সামরিক শক্তি ব্যবহারের আশঙ্কাও নাকচ করা যায় না।
তবে মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিও কংগ্রেস সদস্যদের জানিয়েছেন, ট্রাম্প গ্রিনল্যান্ড কিনে নিতে আগ্রহী এবং তার আক্রমণাত্মক বক্তব্যকে আলোচনার কৌশল হিসেবে দেখছেন।
তীব্র প্রতিক্রিয়া ইউরোপে
তবুও ডেনমার্কের স্বায়ত্ত্বশাসিত অংশ গ্রিনল্যান্ড এবং ইউরোপের বহু দেশ এই বক্তব্যে উদ্বিগ্ন। গ্রিনল্যান্ডের প্রধানমন্ত্রী জেন্স-ফ্রেডেরিক নিলসেন গত ৫ জানুয়ারি বলেছেন, আর কোনো চাপ বা দখলের কল্পনা সহ্য করা হবে না। ডেনমার্কের প্রধানমন্ত্রী মেটে ফ্রেডেরিকসেনও সতর্ক করে বলেছেন, এসব হুমকি গুরুত্বের সঙ্গে নিতে হবে।
ইউরোপের দেশগুলো দ্রুত এক কাতারে দাঁড়িয়েছে। নর্ডিক ও বাল্টিক রাষ্ট্রগুলোর পাশাপাশি যুক্তরাজ্য ও ফ্রান্স গ্রিনল্যান্ড ও ডেনমার্কের সার্বভৌমত্বের প্রতি সমর্থন পুনর্ব্যক্ত করেছে। প্রকাশ্য ঐক্যের আড়ালে ইউরোপীয় কূটনৈতিক মহলে উৎকণ্ঠাও বাড়ছে।
ট্রাম্প কেন গ্রিনল্যান্ডে আগ্রহী, সে বিষয়ে একাধিক যুক্তি দিয়েছেন। প্রাকৃতিক সম্পদের নাগাল, গ্রিনল্যান্ডবাসীর সমৃদ্ধি এবং যুক্তরাষ্ট্রের জাতীয় নিরাপত্তা—সবই তার বক্তব্যে উঠে এসেছে। অনেক বিশ্লেষকের মতে, এসব বক্তব্যে উনিশ শতকের মনরো নীতির ছায়া স্পষ্ট, যেখানে পশ্চিম গোলার্ধে বাইরের শক্তির প্রভাব ঠেকাতে যুক্তরাষ্ট্র নিজেকে কর্তৃত্বশীল শক্তি হিসেবে দেখতো।
জোর করেই দখল নেবেন ট্রাম্প?
সরাসরি দখল এখনো অসম্ভব মনে হলেও ট্রাম্প প্রশাসনের আগ্রহকে হালকাভাবে দেখছেন না বিশ্লেষকেরা। ধারণা করা হচ্ছে, মেয়াদ শেষ হওয়ার আগেই গ্রিনল্যান্ডের মর্যাদা ও যুক্তরাষ্ট্রের প্রভাব বদলে দিতে চান তিনি। প্রশাসনের কৌশল আপাতত দুই ভাগে বিভক্ত। একদিকে গ্রিনল্যান্ডের স্বাধীনতাপন্থি রাজনীতিতে বিভাজন উসকে দেওয়া, অন্যদিকে ডেনমার্ককে পাশ কাটিয়ে সরাসরি গ্রিনল্যান্ডের সঙ্গে কোনো চুক্তির চেষ্টা।
আরও পড়ুন>>
গ্রিনল্যান্ড আমাদের লাগবেই: ট্রাম্প
ট্রাম্প গ্রিনল্যান্ডে হাত দিলে ন্যাটোর অস্তিত্ব থাকবে না: ডেনমার্ক
ট্রাম্পের নজরে পড়া গ্রিনল্যান্ড যেভাবে ডেনমার্কের অংশ হয়েছিল
গ্রিনল্যান্ড যুক্তরাষ্ট্রের নয়: ট্রাম্পের বিরুদ্ধে ঐক্যবদ্ধ ইউরোপীয় নেতারা
গত এক বছরে যুক্তরাষ্ট্র ও ডেনমার্কের মধ্যে এ নিয়ে টানাপোড়েন বেড়েছে। ২০২৫ সালের মার্চে যুক্তরাষ্ট্রের ভাইস প্রেসিডেন্ট জে ডি ভ্যান্স ডেনমার্কের ভূমিকার সমালোচনা করে গ্রিনল্যান্ডের স্বাধীনতার পক্ষে কথা বলেন। ডিসেম্বরে ট্রাম্প গ্রিনল্যান্ডের জন্য বিশেষ দূত হিসেবে লুইজিয়ানা অঙ্গরাজ্যের গভর্নর জেফ ল্যান্ড্রিকে নিয়োগ দেন, যা অনেকের চোখে গ্রিনল্যান্ডকে ডেনমার্ক থেকে আলাদা সত্তা হিসেবে দেখার ইঙ্গিত।
এছাড়া মার্কিন গোয়েন্দা সংস্থাগুলো গ্রিনল্যান্ডের স্বাধীনতাপন্থি আন্দোলনের ওপর নজরদারি বাড়িয়েছে বলে অভিযোগ উঠেছে। ডেনমার্ক সরকার একাধিকবার এ বিষয়ে যুক্তরাষ্ট্রের কূটনীতিকদের তলব করেছে।
একই সঙ্গে ট্রাম্প প্রশাসন গ্রিনল্যান্ডকে একটি বিশেষ চুক্তির প্রস্তাব দেওয়ার বিষয়েও ভাবছে বলে আলোচনা চলছে। এর আওতায় যুক্তরাষ্ট্রের সেনারা সেখানে অবাধে কাজ করতে পারবে এবং বাণিজ্যিক সুবিধা মিলবে। যদিও ডেনমার্কের পক্ষ থেকে বলা হচ্ছে, গ্রিনল্যান্ডে এরই মধ্যে যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক ঘাঁটি রয়েছে এবং বড় ধরনের পরিবর্তনে ডেনমার্কের সম্মতি প্রয়োজন।
সব মিলিয়ে গ্রিনল্যান্ড ইস্যুতে যুক্তরাষ্ট্র ও ইউরোপের মধ্যে উত্তেজনা স্পষ্ট হচ্ছে। জার্মান পররাষ্ট্রমন্ত্রী পর্যন্ত মন্তব্য করেছেন, প্রয়োজনে ন্যাটোর অনুচ্ছেদ ৫-এর নিরাপত্তা নিশ্চয়তা দিতে হবে গ্রিনল্যান্ডকে। গ্রিনল্যান্ডের রাজনীতিকদের ভাষায়, তারা জানেন মনরো নীতির অর্থ কী, আর সেই ঝড়ের জন্যই এখন প্রস্তুত হচ্ছেন।
কেএএ/