পাল্টা শুল্ক বাতিল
সুপ্রিম কোর্টের রায় ট্রাম্পের দলের জন্য ‘ছদ্মবেশী উপহার’?
যুক্তরাষ্ট্রে প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের দ্বিতীয় মেয়াদের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ অর্থনৈতিক নীতির বিরুদ্ধে রায় দিয়ে বড় ধাক্কা দিয়েছেন সুপ্রিম কোর্ট। সর্বোচ্চ আদালতের বিচারপতিরা তার ঘোষিত বৈশ্বিক শুল্কনীতি বাতিল ঘোষণা করেছেন। এই রায় ট্রাম্প প্রশাসনের জন্য একটি বড় ধাক্কা হিসেবে দেখা হচ্ছে। তবে বিশ্লেষকদের মতে, রাজনৈতিকভাবে এই পরাজয় ট্রাম্প এবং রিপাবলিকান পার্টির জন্য শেষ পর্যন্ত লাভজনক হতে পারে।
কয়েকজন রিপাবলিকান প্রকাশ্যে রায়কে স্বাগত জানিয়েছেন। অনেকে প্রকাশ্যে কিছু না বললেও আড়ালে সন্তুষ্ট—এমন ধারণাও জোরালো। কারণ, এই সিদ্ধান্ত একদিকে ট্রাম্পের একক ক্ষমতা প্রয়োগের পথে বাধা তৈরি করেছে, অন্যদিকে স্বল্পমেয়াদে অর্থনীতির ওপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে থাকা নীতিগুলো থেকেও তাকে দূরে সরিয়েছে।
অর্থনীতির স্থবিরতা ও শুল্ক বিতর্ক
আদালতের এই রায় এমন এক সময়ে এলো, যখন যুক্তরাষ্ট্রের অর্থনীতির চিত্র খুব একটা আশাব্যঞ্জক নয়। মার্কিন অর্থনৈতিক বিশ্লেষণ ব্যুরোর তথ্য অনুযায়ী, চতুর্থ প্রান্তিকে দেশটির জিডিপি প্রবৃদ্ধি বার্ষিক হারে ১ দশমিক ৪ শতাংশে নেমে আসে। ২০১৬ সালের পর এটি দ্বিতীয় সর্বনিম্ন প্রবৃদ্ধি। কর্মসংস্থান সৃষ্টিও দুর্বল ছিল, আর মূল্যস্ফীতি পুরোপুরি নিয়ন্ত্রণে আসেনি।
যদিও শুল্কই একমাত্র কারণ নয়, তবে শুল্ক নিয়ে অনিশ্চয়তা ও আমদানি ব্যয় বৃদ্ধির প্রভাব অর্থনীতিতে চাপ সৃষ্টি করেছে—এমন ধারণা জোরালো। জনমত জরিপেও তার প্রতিফলন দেখা যায়।
জরিপ সংস্থা নেট সিলভারের তথ্যমতে, গত এপ্রিল থেকে ট্রাম্পের অর্থনৈতিক গ্রহণযোগ্যতার রেটিং প্লাস-৬ থেকে কমে মাইনাস-১২তে নেমেছে। সিএনএনের এক জরিপে দেখা গেছে, ৬২ শতাংশ মার্কিন নাগরিক ট্রাম্পের এই শুল্কনীতির বিপক্ষে, যার মধ্যে ২৫ শতাংশ রিপাবলিকান সমর্থকও রয়েছেন।
আদালতের রায়ে ক্ষমতা খর্ব
ট্রাম্প দাবি করেছেন যে, সুপ্রিম কোর্টের এই রায়ের ফলে অন্য আইনের অধীনে শুল্ক আরোপে তার ক্ষমতা আরও ‘শক্তিশালী’ হয়েছে। তিনি এরই মধ্যে ১৯৭৪ সালের ট্রেড অ্যাক্টের ১২২ ধারা ব্যবহার করে ১০ শতাংশ বৈশ্বিক শুল্ক আরোপ ঘোষণা দিয়েছেন, যা পরে ১৫ শতাংশে উন্নীত করার কথাও বলেন।
তবে আইনি বিশেষজ্ঞরা বলছেন ভিন্ন কথা। প্রধান বিচারপতি জন রবার্টস স্পষ্টভাবে জানিয়েছেন, নতুন যে ধারার কথা ট্রাম্প বলছেন, সেখানে অনেক সীমাবদ্ধতা রয়েছে। ১২২ ধারায় সর্বোচ্চ ১৫ শতাংশ শুল্ক আরোপ করা যায় এবং তা ১৫০ দিনের বেশি বহাল রাখতে কংগ্রেসের অনুমোদন প্রয়োজন। তাছাড়া, আন্তর্জাতিক পেমেন্ট সংক্রান্ত সুনির্দিষ্ট সমস্যা থাকলেই কেবল এই ধারা ব্যবহার সম্ভব।
ট্রাম্প আগে জরুরি ক্ষমতার আইনের আওতায় শুল্ক আরোপ করেছিলেন, যা তাকে দ্রুত ও ব্যাপক সিদ্ধান্ত নেওয়ার সুযোগ দিতো। কিন্তু সুপ্রিম কোর্ট সেই পথ বন্ধ করে দিয়েছেন। ফলে এখন তাকে বিকল্প আইনি কাঠামো অনুসরণ করতে হবে, যা সময়সাপেক্ষ এবং কংগ্রেসের অনুমোদননির্ভর।
তাছাড়া রায়ে স্পষ্ট হয়, প্রেসিডেন্ট এককভাবে অর্থনৈতিক জরুরি ক্ষমতা ব্যবহার করে সীমাহীন শুল্ক আরোপ করতে পারেন না। ফলে ট্রাম্পের কূটনৈতিক ও বাণিজ্যিক দরকষাকষির ক্ষমতা তুলনামূলকভাবে কমে গেছে। বিদেশি অংশীদাররাও এখন জানে, তার সিদ্ধান্তের ওপর কংগ্রেস ও আদালতের নিয়ন্ত্রণ রয়েছে।
রিপাবলিকান শিবিরে স্বস্তি?
রিপাবলিকান পার্টির অনেক সদস্য দীর্ঘদিন ধরে শুল্কনীতিকে নীরবে সমর্থন করলেও দলটির ঐতিহ্যগত অবস্থান ছিল মুক্তবাজার ও মুক্তবাণিজ্যের পক্ষে। সুপ্রিম কোর্টের এই রায় তাদের জন্য অবস্থান পুনর্বিবেচনার সুযোগ তৈরি করেছে বলে মনে করা হচ্ছে।
মধ্যবর্তী নির্বাচনের বছর হওয়ায় অর্থনৈতিক ইস্যু বড় ফ্যাক্টর হতে পারে। শুল্কনীতির কারণে যদি মূল্যস্ফীতি বা প্রবৃদ্ধিতে চাপ অব্যাহত থাকে, তাহলে তার রাজনৈতিক মূল্য দিতে হতে পারে। ফলে অনেক রিপাবলিকান মনে করতে পারেন, ট্রাম্পকে সুযোগ দেওয়া হয়েছিল—এখন নতুন পথে হাঁটার সময়।
তবে ট্রাম্পের রাজনৈতিক ব্যক্তিত্ব ও অবস্থান বিবেচনায় তিনি সহজে পিছু হটবেন না বলেই ধারণা বিশ্লেষকদের। তবুও সুপ্রিম কোর্টের রায় তাকে বাস্তবতার মুখোমুখি দাঁড় করিয়েছে। একই সঙ্গে, রিপাবলিকান পার্টির জন্যও নতুন হিসাব-নিকাশের দরজা খুলে দিয়েছে।
সূত্র: সিএনএন
কেএএ/