দুই দশকে যুক্তরাষ্ট্রে বাংলাদেশি জনগোষ্ঠী বেড়েছে ৫৬৯ শতাংশ
যুক্তরাষ্ট্রে বসবাসকারী বাংলাদেশি জনগোষ্ঠীর সংখ্যা গত দুই দশকে ৫৬৯ শতাংশ বেড়েছে। মার্কিন থিংক ট্যাংক পিউ রিসার্চ সেন্টারের ২০২১-২৩ সালের আমেরিকান কমিউনিটি জরিপের (এসিএস) তথ্যের ওপর ভিত্তি করে।
এদিকে, যুক্তরাষ্ট্রের আদমশুমারি ব্যুরোর প্রকাশিত হিসাব অনুযায়ী, ২০২৩ সালে যুক্তরাষ্ট্রে নিজেদের বাংলাদেশি হিসেবে পরিচয় দেওয়া মানুষের সংখ্যা ছিল আনুমানিক ৩ লাখ। এই হিসাবে বাংলাদেশি আমেরিকানরা যুক্তরাষ্ট্রে বসবাসরত এশীয় জনগোষ্ঠীর মধ্যে দ্বাদশ বৃহত্তম গোষ্ঠী, যা দেশটির মোট এশীয় জনসংখ্যার প্রায় ১ শতাংশ।
যুক্তরাষ্ট্রে বাংলাদেশি জনগোষ্ঠী বলতে এমন সব মানুষকে বোঝানো হয়েছে, যারা নিজেদের বাংলাদেশি হিসেবে শনাক্ত করেন। এর মধ্যে রয়েছেন বাংলাদেশ থেকে যুক্তরাষ্ট্রে আসা অভিবাসীরা, যুক্তরাষ্ট্রে জন্ম নেওয়া বাংলাদেশি বংশোদ্ভূতরা ও বিশ্বের অন্য কোথাও জন্ম নেওয়া বাংলাদেশি বংশোদ্ভূত ব্যক্তিরা।
এই জনগোষ্ঠীর মধ্যে এমন ব্যক্তিরাও অন্তর্ভুক্ত, যারা শুধু বাংলাদেশি হিসেবেই নিজেদের পরিচয় দেন এবং অন্য কোনো জাতিগোষ্ঠী বা এশীয় পরিচয়ের সঙ্গে নিজেদের যুক্ত করেন না। এ ধরনের মানুষ মোট বাংলাদেশি জনগোষ্ঠীর ৯৫ শতাংশ। পাশাপাশি এমন ব্যক্তিরাও রয়েছেন, যারা বাংলাদেশির পাশাপাশি অন্য কোনো জাতি, নৃগোষ্ঠী বা এশীয় পরিচয়ের সঙ্গেও নিজেদের যুক্ত করেন।
যুক্তরাষ্ট্রে বাংলাদেশি জনসংখ্যা
পিউ রিসার্চ সেন্টারের ২০২১-২৩ সালের এসিএস বিশ্লেষণ অনুযায়ী, যুক্তরাষ্ট্রে প্রায় ২ লাখ ৭০ হাজার মানুষ নিজেদের শুধু বাংলাদেশি হিসেবেই পরিচয় দেন। ২০০০ সালে এই সংখ্যা ছিল মাত্র ৪০ হাজার। অর্থাৎ প্রায় দুই দশকে বাংলাদেশি জনগোষ্ঠীর সংখ্যা বেড়েছে প্রায় ২ লাখ ২৫ হাজার, যা শতকরা হিসাবে ৫৬৯ শতাংশ বৃদ্ধি।
২০২৩ সালে যুক্তরাষ্ট্রে বসবাসরত বাংলাদেশি-একক জনগোষ্ঠীর মধ্যে ৭১ শতাংশ ছিলেন অভিবাসী। ২০০০ সালে এই হার ছিল ৮৪ শতাংশ। যদিও অনুপাত কমেছে, তবু সংখ্যাগত দিক থেকে বাংলাদেশি অভিবাসীর সংখ্যা ২০০০ সালের ৩৫ হাজার থেকে বেড়ে ২০২৩ সালে দাঁড়িয়েছে প্রায় ১ লাখ ৯০ হাজারে।
যুক্তরাষ্ট্রে বসবাসের সময়কাল ও নাগরিকত্ব
বাংলাদেশি অভিবাসীদের মধ্যে ৫৫ শতাংশ যুক্তরাষ্ট্রে ১০ বছরের বেশি সময় ধরে বসবাস করছেন। একই সঙ্গে ৬০ শতাংশ বাংলাদেশি অভিবাসী যুক্তরাষ্ট্রের নাগরিকত্ব গ্রহণ করেছেন।
ভাষা
৫ বছর বা তার বেশি বয়সী বাংলাদেশিদের মধ্যে ৫৬ শতাংশ ইংরেজিতে দক্ষ। এর মধ্যে ১১ শতাংশ ঘরে শুধু ইংরেজি ভাষায় কথা বলেন ও ৪৬ শতাংশ ঘরে অন্য ভাষায় কথা বললেও ইংরেজি খুব ভালোভাবে বলতে পারেন। তুলনামূলকভাবে যুক্তরাষ্ট্রে বসবাসরত সামগ্রিক এশীয় জনগোষ্ঠীর মধ্যে এই হার ৭৪ শতাংশ।
বাংলাদেশিদের মধ্যে অভিবাসীদের ৪৭ শতাংশ ইংরেজিতে দক্ষ, আর যুক্তরাষ্ট্রে জন্ম নেওয়া বাংলাদেশিদের মধ্যে এই হার ৮৬ শতাংশ।
বাংলাদেশি আমেরিকানদের ঘরে সবচেয়ে বেশি ব্যবহৃত ভাষা বাংলা (৮৬ শতাংশ)। এছাড়া হিন্দি (১ শতাংশ), উর্দু (শূন্য দশমিক ৩ শতাংশ) ও ক্যান্টনিজ (শূন্য দশমিক ৩ শতাংশ) ভাষাও ব্যবহৃত হয়।
ভৌগোলিক অবস্থান
যুক্তরাষ্ট্রে বসবাসরত বাংলাদেশি-একক জনগোষ্ঠীর মধ্যে ১ লাখ ১৫ হাজার মানুষ, অর্থাৎ ৪৪ শতাংশই নিউইয়র্ক অঙ্গরাজ্যে বসবাস করেন। এছাড়া বাংলাদেশিদের উল্লেখযোগ্য উপস্থিতি রয়েছে মিশিগান (২০ হাজার), ক্যালিফোর্নিয়া (১৮ হাজার), টেক্সাস (১৭ হাজার) এবং নিউ জার্সি (১২ হাজার) অঙ্গরাজ্যে।
মহানগর এলাকাগুলোর মধ্যে নিউইয়র্কে বাংলাদেশি জনসংখ্যা সবচেয়ে বেশি—প্রায় ১ লাখ ১০ হাজার। এরপর রয়েছে ডেট্রয়েট (১৮ হাজার) এবং ওয়াশিংটন ডিসি (১৫ হাজার)।
বয়স
বাংলাদেশিদের গড় বয়স ৩৩ বছর, যা সামগ্রিক এশীয় জনগোষ্ঠীর গড় বয়স ৩৪ দশমিক ৭ বছরের কাছাকাছি। বাংলাদেশি অভিবাসীদের গড় বয়স ৪০ দশমিক ৭ বছর। এদের মধ্যে ৯ শতাংশের বয়স ১৮ বছরের নিচে এবং ১০ শতাংশের বয়স ৬৫ বছরের বেশি।
অন্যদিকে, যুক্তরাষ্ট্রে জন্ম নেওয়া বাংলাদেশিদের গড় বয়স মাত্র ১০ দশমিক ৬ বছর। এদের ৬৯ শতাংশের বয়স ১৮ বছরের নিচে এবং মাত্র ১ শতাংশের বয়স ৬৫ বছরের বেশি।
শিক্ষাগত যোগ্যতা
২৫ বছর বা তার বেশি বয়সী বাংলাদেশি আমেরিকানদের মধ্যে ৫১ শতাংশের স্নাতক (২৪ শতাংশ) বা স্নাতকোত্তর (২৬ শতাংশ) ডিগ্রি রয়েছে। সামগ্রিক এশীয় জনগোষ্ঠীর মধ্যে এই হার ৫৬ শতাংশ।
২৫ বছর বা তার বেশি বয়সী বাংলাদেশি অভিবাসীদের মধ্যে স্নাতক বা তার বেশি ডিগ্রিধারীর হার যুক্তরাষ্ট্রে জন্ম নেওয়া বাংলাদেশিদের তুলনায় কম (৫০ শতাংশ বনাম ৫৯ শতাংশ)।
বৈবাহিক অবস্থা
বাংলাদেশি প্রাপ্তবয়স্কদের মধ্যে ৭১ শতাংশ বিবাহিত। এশীয় জনগোষ্ঠীর ক্ষেত্রে এই হার ৫৮ শতাংশ। ১৮ বছর বা তার বেশি বয়সী বাংলাদেশিদের মধ্যে অভিবাসীদের ৭৭ শতাংশ বিবাহিত, যেখানে যুক্তরাষ্ট্রে জন্ম নেওয়া বাংলাদেশিদের মধ্যে এই হার মাত্র ২৯ শতাংশ।
সন্তান জন্মহার
১৫ থেকে ৪৪ বছর বয়সী বাংলাদেশি নারীদের মধ্যে ৮ শতাংশ জরিপের আগের ১২ মাসে সন্তান জন্ম দিয়েছেন। সামগ্রিক এশীয় নারীদের ক্ষেত্রে এই হার ৫ শতাংশ।
বাংলাদেশি অভিবাসী নারীদের মধ্যে সন্তান জন্মহার বেশি (১০ শতাংশ), যেখানে যুক্তরাষ্ট্রে জন্ম নেওয়া বাংলাদেশি নারীদের মধ্যে এই হার মাত্র ২ শতাংশ।
আয়
২০২৩ সালে বাংলাদেশি পরিবারপ্রধানের নেতৃত্বাধীন পরিবারের মধ্যম বার্ষিক আয় ছিল ৭৮ হাজার ৪০০ ডলার। এশীয় পরিবারপ্রধানদের ক্ষেত্রে এই আয় ছিল ১ লাখ ৫ হাজার ৬০০ ডলার।
বাংলাদেশি অভিবাসী পরিবারপ্রধানের ক্ষেত্রে মধ্যম বার্ষিক আয় ছিল ৭৭ হাজার ৮০০ ডলার।
১৬ বছর বা তার বেশি বয়সী বাংলাদেশিদের মধ্যম ব্যক্তিগত বার্ষিক আয় ছিল ৩৫ হাজার ৪০০ ডলার, যা সামগ্রিক এশীয় জনগোষ্ঠীর (৫২ হাজার ৪০০ ডলার) তুলনায় কম।
পূর্ণকালীন ও বছরজুড়ে কর্মরত বাংলাদেশিদের মধ্যম আয় ছিল ৫৬ হাজার ডলার, যেখানে এশীয়দের ক্ষেত্রে তা ছিল ৭৫ হাজার ডলার।
দারিদ্র্য
যুক্তরাষ্ট্রে বসবাসরত বাংলাদেশিদের মধ্যে ১৪ শতাংশ দারিদ্র্যসীমার নিচে বসবাস করছেন। এশীয় জনগোষ্ঠীর ক্ষেত্রে এই হার ১০ শতাংশ। দারিদ্র্যের হার অভিবাসী ও যুক্তরাষ্ট্রে জন্ম নেওয়া বাংলাদেশিদের মধ্যে সমান ও উভয় ক্ষেত্রেই ১৪ শতাংশ।
বাড়ির মালিকানা
বাংলাদেশি পরিবারপ্রধানের নেতৃত্বাধীন পরিবারের মধ্যে বাড়ির মালিকানা হার ৫১ শতাংশ। এশীয় পরিবারপ্রধানদের ক্ষেত্রে এই হার ৬২ শতাংশ।
সূত্র: পিউ রিসার্চ সেন্টার
এসএএইচ