পশ্চিম তীরে ইসরায়েলের দখল জোরদার, গভীর সংকটে ফিলিস্তিন কর্তৃপক্ষ

আন্তর্জাতিক ডেস্ক
আন্তর্জাতিক ডেস্ক আন্তর্জাতিক ডেস্ক
প্রকাশিত: ০৯:১১ পিএম, ২১ ফেব্রুয়ারি ২০২৬
পশ্চিম তীরে ইসরায়েলের দখল জোরদার। ছবি: এএফপি (ফাইল)

অধিকৃত পশ্চিম তীরে ইসরায়েলি বসতি স্থাপনকারীদের সহিংসতা বেড়ে গেছে উল্লেখযোগ্য হারে। উত্তর-পূর্বে অবস্থিত আল-মুঘাইয়ির গ্রামে ইসরায়েলি সেনাবাহিনীর অভিযান চলছে এবং বসতি স্থাপনকারীরা নতুন আউটপোস্ট গড়ে কৃষিজমি দখল করছে।

গ্রাম পরিষদের সদস্য মারজুক আবু নাইম বলেন, বসতি স্থাপনকারীদের লক্ষ্য ফিলিস্তিনিদের এলাকা ছাড়তে বাধ্য করা। তিনি বলেন, তারা প্রকাশ্যে নয়, নীরবে কাজটি করছে। কিন্তু এটি আসলে সংযুক্তিকরণ। আমরা আমাদের জমিতে যেতে পারছি না।

সবুজ পাহাড় আর জলপাই বাগানঘেরা আল-মুঘাইয়িরের অধিকাংশ বাড়ি এমন এলাকায় অবস্থিত, যেখানে নিরাপত্তা নিয়ন্ত্রণ ইসরায়েলের সেনাবাহিনীর হাতে। তবে আন্তর্জাতিকভাবে সমর্থিত ফিলিস্তিনি কর্তৃপক্ষের (পিএ) মৌলিক সেবা দেওয়ার কথা। কিন্তু গভীর অর্থনৈতিক সংকটে পড়ায় তারা তা ক্রমেই দিতে পারছে না।

আবু নাইম বলেন, আমি যখন তাদের কাছে যাই, তারা প্রয়োজনীয় সহায়তা দিতে পারে না। কর্তৃপক্ষের কাছে কোনো অর্থ নেই।

গত ৭ অক্টোবর হামাসের নেতৃত্বে ইসরায়েলে প্রাণঘাতী হামলার পর প্রায় এক লাখ ফিলিস্তিনি ইসরায়েলে কাজের অনুমতি হারান। পাশাপাশি পাঠ্যবই ও ইসরায়েলের হাতে বন্দি বা নিহত ব্যক্তিদের পরিবারকে ভাতা দেওয়ার বিষয় নিয়ে বিরোধের কারণে ইসরায়েল পিএ’র জন্য সংগৃহীত কর রাজস্ব আটকে রেখেছে।

পিএ জানিয়েছে, তাদের পাওনা এখন চার বিলিয়ন ডলারের বেশি। তারা সরকারি কর্মচারীদের বেতনের মাত্র ৬০ শতাংশ পরিশোধ করছে। ছয় লাখের বেশি শিক্ষার্থী অধ্যয়নরত স্কুলগুলো সপ্তাহে মাত্র তিন দিন খোলা থাকে।

আল-মুঘাইয়িরের আট সন্তানের এক মা বলেন, বসতি স্থাপনকারী বা সেনারা আশপাশে থাকলে নিরাপত্তা শঙ্কায় স্কুল বন্ধ হয়ে যায়। তিনি জানান, এত বিঘ্ন ঘটছে যে কিছু শিশু চতুর্থ শ্রেণিতে উঠেও পড়তে পারে না। তাই আমরা তাদের গ্রামে ব্যক্তিগত শিক্ষকের কাছে পাঠাই, যিনি বর্ণমালা থেকে আবার শেখানো শুরু করেন।

গ্রাম থেকে বের হলে দেখা যায় ইসরায়েলি সামরিক গেট, যা ফিলিস্তিনি গ্রামগুলোকে একে অপরের থেকে বিচ্ছিন্ন করে চলাচল সীমিত করতে ব্যবহৃত হয়। একই সঙ্গে বসতিগুলোকে সংযুক্ত করতে এবং জেরুজালেমে দ্রুত পৌঁছানোর জন্য রাস্তা প্রশস্ত করছে ইসরায়েলি বুলডোজার। আন্তর্জাতিক আইনে অবৈধ হিসেবে বিবেচিত এসব বসতি রেকর্ড হারে সম্প্রসারিত হচ্ছে।

এ পরিস্থিতি পিএ’র ওপর আরও চাপ বাড়াচ্ছে। ৩০ বছরেরও বেশি আগে অসলো চুক্তির মাধ্যমে যে শান্তিচুক্তি হয়, তারপর পিএ গঠিত হয়েছিল। তখন আশা করা হয়েছিল এটি দ্রুত পশ্চিম তীর ও গাজা উপত্যকায় পূর্ব জেরুজালেমকে রাজধানী করে একটি ফিলিস্তিনি রাষ্ট্রের পূর্ণাঙ্গ সরকারে রূপ নেবে। পিএ অহিংস আলোচনার মাধ্যমে রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার লক্ষ্য নিয়েছিল।

কিন্তু এক দশকেরও বেশি আগে সরাসরি আলোচনা ভেঙে পড়ে। পশ্চিম তীরে ইসরায়েলের সম্প্রসারণ ঠেকাতে না পারা এবং রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠায় অগ্রগতি না হওয়ায় পিএ’র দুর্বলতা স্পষ্ট হয়েছে। দুর্নীতি, রাজনৈতিক স্থবিরতা ও ইসরায়েলের সঙ্গে নিরাপত্তা সমন্বয় অব্যাহত রাখায় অনেক ফিলিস্তিনির মধ্যে তাদের জনপ্রিয়তা কমেছে।

রামাল্লাহ, পিএ’র প্রশাসনিক কেন্দ্র, এখনো এমন একটি এলাকা যেখানে পিএ পূর্ণ নিয়ন্ত্রণ রাখে। তবে এখানেও শঙ্কা বাড়ছে শাসনব্যবস্থা ভেঙে পড়ার।

পিএ’র সাবেক মন্ত্রী ও প্রেসিডেন্টের রাজনৈতিক দলের উপপ্রধান সাবরি সাইদাম বলেন, এটি আমাদের জীবনের এক মোড় ঘোরানো মুহূর্ত। ফিলিস্তিনি রাষ্ট্র, পরিচয় এবং এই ভূখণ্ডে তাদের অস্তিত্ব এখন ইসরায়েলের পদক্ষেপে হুমকির মুখে। ফিলিস্তিনি কর্তৃপক্ষের অস্তিত্বও প্রশ্নের মুখে।

এ মাসে ইসরায়েল সরকার পশ্চিম তীরে নিয়ন্ত্রণ আরও জোরদারে নতুন পদক্ষেপ নিয়েছে। জাতিসংঘের এক শীর্ষ কর্মকর্তা সতর্ক করে বলেছেন, এগুলো ধীরে ধীরে কার্যত সংযুক্তিকরণের শামিল।

নতুন ভূমি নিবন্ধন প্রক্রিয়ার মাধ্যমে ইসরায়েল বড় অংশের জমিকে রাষ্ট্রীয় জমি হিসেবে দাবি করতে পারে, যা ভবিষ্যতে ইসরায়েলি উন্নয়নের জন্য উন্মুক্ত থাকবে। এছাড়া পিএ’র বেসামরিক নিয়ন্ত্রণাধীন কিছু এলাকায় পরিবেশ ও প্রত্নতাত্ত্বিক বিধিমালার প্রয়োগ বাড়ানো হচ্ছে।

ইসরায়েলের কট্টর ডানপন্থী অর্থমন্ত্রী বলেছেন, তার লক্ষ্য ফিলিস্তিনি রাষ্ট্রের ধারণাকে ধ্বংস করা। তিনি নিজেও একজন বসতি স্থাপনকারী, তিনি এ ভূমির ওপর আদর্শিক ও ধর্মীয় অধিকার দাবি করেন।

৮০টির বেশি জাতিসংঘ সদস্য রাষ্ট্র, ইউরোপীয় ইউনিয়ন ও আরব লীগ ইসরায়েলের একতরফা সিদ্ধান্তের নিন্দা জানিয়েছে এবং সেগুলো প্রত্যাহারের আহ্বান জানিয়েছে। তবে যুক্তরাষ্ট্র শুধু জানিয়েছে যে তারা পশ্চিম তীর সংযুক্তিকরণের বিরোধী।

অনেক ফিলিস্তিনি উদ্বিগ্ন ও হতাশ। আন্তর্জাতিক সম্পর্কের অধ্যাপক গাসান খতিব বলেন, পিএ টিকে রাখতে ইসরায়েলের ওপর বৈশ্বিক চাপ ও আর্থিক সহায়তা জরুরি।

তিনি বলেন, এটি সতর্কবার্তা। দুই রাষ্ট্রভিত্তিক সমাধানের ধারণায় আন্তর্জাতিক সম্প্রদায় রাজনৈতিক ও আর্থিকভাবে ব্যাপক বিনিয়োগ করেছে। কিন্তু ইসরায়েলের নতুন পদক্ষেপগুলো সেই ভবিষ্যৎকে নস্যাৎ করার লক্ষ্যেই নেওয়া হচ্ছে।

সূত্র: বিবিসি

এমএসএম

পাঠকপ্রিয় অনলাইন নিউজ পোর্টাল জাগোনিউজ২৪.কমে লিখতে পারেন আপনিও। লেখার বিষয় ফিচার, ভ্রমণ, লাইফস্টাইল, ক্যারিয়ার, তথ্যপ্রযুক্তি, ধর্ম, কৃষি ও প্রকৃতি। আজই আপনার লেখাটি পাঠিয়ে দিন [email protected] ঠিকানায়।