আফগানিস্তানে পাকিস্তানের হামলায় নিহত ১৭ , প্রতিশোধের হুমকি তালেবানের
আফগানিস্তানের সীমান্তবর্তী দুটি প্রদেশে পাকিস্তানের বিমান হামলায় অন্তত ১৭ জন নিহত হয়েছেন। শনিবারের (২১ ফেব্রুয়ারি) এই হামলায় আরও বহু মানুষ হতাহতের আশঙ্কা করা হচ্ছে। এই হামলার ‘উপযুক্ত’ জবাব দেওয়ার হুমকি দিয়েছে আফগানিস্তানের তালেবান প্রশাসন।
আফগান সূত্রের বরাতে কাতার-ভিত্তিক সংবাদমাধ্যম আল জাজিরা জানিয়েছে, পূর্বাঞ্চলীয় নানগারহার প্রদেশে অন্তত ১৭ জন নিহত হয়েছেন।
পাকিস্তানের সেনাবাহিনী জানিয়েছে, তারা পাকিস্তানে সাম্প্রতিক একাধিক হামলার সঙ্গে জড়িত সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলোর ‘ক্যাম্প ও আস্তানা’ লক্ষ্য করে বিমান হামলা চালিয়েছে। এসব হামলার মধ্যে ইসলামাবাদে একটি শিয়া মসজিদে আত্মঘাতী বিস্ফোরণও রয়েছে, যেখানে বহু মুসল্লি নিহত হন।
আরও পড়ুন>>
আফগানিস্তানের ২ প্রদেশে পাকিস্তানের বিমান হামলা
পাকিস্তান-আফগানিস্তান সীমান্তে রক্তক্ষয়ী সংঘাতের কারণ কী?
পাকিস্তানের হাত ছেড়ে আফগানিস্তান কেন ভারতমুখী হলো?
আফগানিস্তানের প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয় বিমান হামলার তীব্র নিন্দা জানিয়ে দাবি করেছে, নানগারহার ও পাকতিকা প্রদেশে ধর্মীয় শিক্ষা প্রতিষ্ঠান এবং আবাসিক বাড়িতে হামলা চালানো হয়েছে। এতে নারী ও শিশুসহ বহু মানুষ নিহত ও আহত হয়েছেন। মন্ত্রণালয় একে আন্তর্জাতিক আইন ও সুপ্রতিবেশী সম্পর্কের নীতির লঙ্ঘন বলে উল্লেখ করেছে এবং উপযুক্ত জবাব দেওয়ার ঘোষণা দিয়েছে।
পাকিস্তানের তথ্য ও সম্প্রচার মন্ত্রণালয় সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্সে দেওয়া বিবৃতিতে জানায়, দেশটির সামরিক বাহিনী গোয়েন্দা তথ্যের ভিত্তিতে তেহরিক-ই-তালেবান পাকিস্তান (টিটিপি) এবং তাদের সহযোগী গোষ্ঠীগুলোর সাতটি আস্তানা ও ক্যাম্পে ‘নির্বাচিত অভিযান’ চালিয়েছে। পাশাপাশি সীমান্ত অঞ্চলে ইসলামিক স্টেটের একটি সহযোগী শাখাকেও লক্ষ্যবস্তু করা হয়েছে বলে দাবি করা হয়।
ইসলামাবাদ দাবি করেছে, সাম্প্রতিক সময়ে রাজধানী ইসলামাবাদ, উত্তর-পশ্চিমাঞ্চলের বাজাউর ও বান্নু জেলায় সংঘটিত হামলাগুলো আফগানিস্তানভিত্তিক নেতৃত্ব ও হ্যান্ডলারদের নির্দেশে পরিচালিত হয়েছে—এমন ‘চূড়ান্ত প্রমাণ’ তাদের হাতে রয়েছে। পাকিস্তান বারবার কাবুলের তালেবান সরকারকে সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলোকে আফগান ভূখণ্ড ব্যবহার করে হামলা চালাতে না দেওয়ার আহ্বান জানালেও কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়া হয়নি বলে অভিযোগ করেছে তারা।
এই বিমান হামলার কয়েক ঘণ্টা আগে খাইবার পাখতুনখোয়ার বান্নু জেলায় একটি নিরাপত্তা বহরে আত্মঘাতী হামলায় এক লেফটেন্যান্ট কর্নেলসহ দুই সেনা নিহত হন। এর পরদিন বাজাউরে আরেকটি আত্মঘাতী হামলায় বিস্ফোরকবোঝাই যানবাহন দিয়ে নিরাপত্তা চৌকিতে আঘাত হানা হলে ১১ সেনা ও এক শিশু নিহত হয়। পরে কর্তৃপক্ষ জানায়, হামলাকারী একজন আফগান নাগরিক।
গত ৬ ফেব্রুয়ারি ইসলামাবাদের তারলাই কালান এলাকায় খাদিজা তুল কুবরা মসজিদে জুমার নামাজের সময় আত্মঘাতী বিস্ফোরণে অন্তত ৩১ মুসল্লি নিহত ও ১৭০ জন আহত হন। আইএস ওই হামলার দায় স্বীকার করে।
পাকিস্তানের সামরিক বাহিনীর দাবি, ইসলামাবাদের ওই হামলার পরিকল্পনা, প্রশিক্ষণ ও মতাদর্শগত প্রস্তুতি আফগানিস্তানে সম্পন্ন হয়েছে।
২০২০ সালে কাতারের রাজধানী দোহায় যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে তালেবান যে চুক্তি স্বাক্ষর করেছিল, সেখানে আফগান ভূখণ্ড অন্য দেশের বিরুদ্ধে হামলার জন্য ব্যবহার না করার অঙ্গীকার ছিল। ওই চুক্তির প্রতিশ্রুতি রক্ষা করতে কাবুলের ওপর চাপ প্রয়োগে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের প্রতি আহ্বান জানিয়েছে পাকিস্তান।
অন্যদিকে আফগান প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয় পাকিস্তানের হামলাকে বেসামরিক নাগরিক ও ধর্মীয় স্থাপনায় আঘাত হিসেবে বর্ণনা করে বলেছে, পাকিস্তান সেনাবাহিনীকে এর জন্য দায়ী করা হবে এবং যথাসময়ে ‘পরিমিত ও উপযুক্ত’ জবাব দেওয়া হবে।
সাম্প্রতিক বছরগুলোতে পাকিস্তানে সহিংসতা বেড়েছে। এর বড় অংশের জন্য টিটিপি ও নিষিদ্ধ বেলুচ বিচ্ছিন্নতাবাদী গোষ্ঠীগুলোকে দায়ী করা হয়। ইসলামাবাদ অভিযোগ করে, টিটিপি আফগানিস্তানের ভেতর থেকে কার্যক্রম চালায়। যদিও গোষ্ঠীটি তা অস্বীকার করেছে। তালেবান সরকারও পাকিস্তানবিরোধী সশস্ত্র গোষ্ঠীকে আশ্রয় দেওয়ার অভিযোগ নাকচ করেছে।
গত অক্টোবর মাসে প্রাণঘাতী সীমান্ত সংঘর্ষের পর থেকে দুই প্রতিবেশী দেশের সম্পর্ক উত্তেজনাপূর্ণ রয়েছে। কাতারের মধ্যস্থতায় গত ১৯ অক্টোবর তাদের মধ্যে যুদ্ধবিরতি কার্যকর হয়।
সূত্র: আল-জাজিরা
কেএএ/