মেঘভাঙা বৃষ্টি কী? কেন এটি এত ভয়াবহ? কারণ ও প্রতিরোধের উপায়
দুদিন আগে বাংলাদেশের ফেনী জেলায় এক ঘণ্টায় ১২৬ মিলিমিটার বৃষ্টিপাত রেকর্ড করা হয়। স্মরণকালের ভয়াবহ এই দুর্যোগে বিপর্যস্ত হয়ে পড়েছে জেলার জনজীবন। এমন পরিস্থিতিতে ‘মেঘভাঙা বৃষ্টি’ বা ‘ক্লাউডবার্স্ট’ নিয়ে আলোচনা উঠেছে। যদিও, ফেনীর এই ঘটনাকে সরাসরি ‘মেঘভাঙা বৃষ্টি’ বলার সুযোগ নেই।
কী এই মেঘভাঙা বৃষ্টি?
আবহাওয়া বিজ্ঞান দপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, কোনো ছোট এলাকায় (এক থেকে দশ কিলোমিটার বিস্তৃত) এক ঘণ্টায় ১০ সেন্টিমিটার বা তার বেশি বৃষ্টিপাত হলে সেই ঘটনাকে ক্লাউডবার্স্ট বা মেঘ ভাঙা বলে চিহ্নিত করা হয়।
এদিকে, ভারতের আবহাওয়াবিদরা মেঘভাঙা বৃষ্টি বলতে বোঝান- ৩০ বর্গকিলোমিটার বা তার কম এলাকায় প্রতি ঘণ্টায় ১০০ মিলিমিটার বা তার বেশি বৃষ্টিপাত হওয়া। তবে এর পেছনে জটিল প্রাকৃতিক প্রক্রিয়া কাজ করে।
মেলবোর্ন বিশ্ববিদ্যালয়ের আবহাওয়াবিদ রুচিত কুলকার্নির মতে, এ ধরনের ঘটনা সাধারণত বর্ষাকালে পাহাড়ি এলাকায় বেশি ঘটে। আরব সাগর থেকে আসা আর্দ্র বায়ু পাহাড়ে ধাক্কা খেয়ে উপরের দিকে উঠে যায়—যাকে বলা হয় ‘অরোগ্রাফিক লিফট’। এতে বিশাল কিউমুলোনিম্বাস মেঘ তৈরি হয়।
তিনি বলেন, এই আর্দ্র বায়ু উপরে উঠতে থাকে, মেঘ বড় হতে থাকে এবং বৃষ্টির সুযোগ না পেলে একসময় এত ভারী হয়ে যায় যে হঠাৎ করেই ফেটে পড়ে। তবে সব সময় মেঘভাঙা বৃষ্টি একমাত্র কারণ নয়। হিমবাহ বা হিমবাহের হ্রদ ভেঙেও হঠাৎ বন্যা তৈরি হতে পারে।
কেন এটি খুবই ভয়াবহ?
হঠাৎ করে একটি ছোট এলাকায় বিপুল পরিমাণ (প্রায়শই প্রতি ঘণ্টায় ১০০ মিলিমিটারের বেশি) বৃষ্টি হওয়ায় মেঘভাঙা বৃষ্টি অত্যন্ত বিপজ্জনক। এর ফলে তীব্র আকস্মিক বন্যা ও বিধ্বংসী ভূমিধস সৃষ্টি হয়। এই ঘটনাগুলো সাধারণত পার্বত্য অঞ্চলে ঘটে থাকে, যা পানি নিষ্কাশন ব্যবস্থাকে অকার্যকর করে দেয় ও মারাত্মক ভূমিধসের সৃষ্টি করে। এতে মুহূর্তের মধ্যে অবকাঠামো, ঘরবাড়ি ও ভূদৃশ্য ধ্বংস করে দেয়।
বিভিন্ন পাহাড়ি অঞ্চলে এই ধরনের বৃষ্টি দেখা যায়। প্রচুর পরিমাণে উষ্ণ মৌসুমি বায়ু যখন কনকনে ঠান্ডা বায়ুর সংস্পর্শে আসে, তখন অনেকটা এলাকা জুড়ে ঘন মেঘের সৃষ্টি হয়। ভূপ্রকৃতিগত কিছু বৈশিষ্ট্যও এই মেঘ তৈরির ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ কারণ হয়ে দাঁড়ায়।
কেন হয়?
আবহবিদেরা জানিয়েছেন, উষ্ণ বাতাস উপরের দিকে উঠতে থাকায় মেঘে সঞ্চিত জলকণা বৃষ্টি হয়ে স্বাভাবিক প্রক্রিয়ায় ঝরে পড়তে বাধা পায়। ঝরে পড়া বৃষ্টিবিন্দুগুলিকেও শুষে নিয়ে উপরে ওঠে গরম বাতাস।
স্বাভাবিক প্রক্রিয়ায় বৃষ্টি না হওয়ার ফলে মেঘের মধ্যেই জল জমতে থাকে। আরও ভারী হতে থাকে বৃষ্টিবিন্দু। মেঘের ঘনত্বও ক্রমে বাড়তে থাকে। একসময় হাওয়ার ধাক্কায় মেঘ আর সেই জল ধরে রাখতে পারে না। তখন একসঙ্গে অনেকটা জল মেঘ ফেটে বেরিয়ে আসে। সেই জল আর বিন্দু বিন্দু বৃষ্টির আকারে থাকে না। জলের ধারা নেমে আসে মেঘের বুক থেকে।
জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব
বিজ্ঞানীরা বলছেন, বৈশ্বিক উষ্ণতা বাড়ায় এ ধরনের বৃষ্টিপাত আরও ঘন ঘন ও তীব্র হচ্ছে। উষ্ণ বায়ু বেশি আর্দ্রতা ধারণ করে, যা পাহাড়ে ধাক্কা খেলে হঠাৎ ভারী বৃষ্টিতে রূপ নেয়।
প্রতি ১ ডিগ্রি সেলসিয়াস তাপমাত্রা বাড়লে বাতাসে আর্দ্রতা প্রায় ৭ শতাংশ বৃদ্ধি পায়, যা ভারী বৃষ্টির শঙ্কা বাড়ায়।
দক্ষিণ এশিয়ায় ঝুঁকি
ভারত, পাকিস্তান, বাংলাদেশসহ দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলোতে বর্ষাকালে ভারত মহাসাগর ও আরব সাগর থেকে আসা বায়ু বৃষ্টিপাত ঘটায়। সাম্প্রতিক বছরগুলোতে এই সমুদ্রগুলো দ্রুত উষ্ণ হওয়ায় বৃষ্টির তীব্রতাও বেড়েছে।
বাংলাদেশেও মাঝে মাঝে স্বল্প সময়ে অস্বাভাবিক বৃষ্টির ঘটনা দেখা যায়- বিশেষ করে পাহাড়ি অঞ্চল যেমন সিলেট ও চট্টগ্রামে। যদিও এগুলো আনুষ্ঠানিকভাবে সবসময় ‘মেঘভাঙা বৃষ্টি’ হিসেবে চিহ্নিত না হলেও এর বৈশিষ্ট্য অনেকটাই একই।
অতীতের ভয়াবহ উদাহরণ
২০১৩ সালের জুনে ভারতের উত্তরাখণ্ড রাজ্যের কেদারনাথ এলাকায় ভয়াবহ বন্যায় ৬ হাজারেরও বেশি মানুষের মৃত্যু হয়। জাতিসংঘের এক প্রতিবেদনে এই বিপর্যয়ের জন্য মেঘভাঙা বৃষ্টিকে দায়ী করা হয়েছিল।
একটি গবেষণায় দেখা যায়, ওই বৃষ্টিপাতের অর্ধেকের বেশি অংশই বায়ুমণ্ডলে গ্রিনহাউজ গ্যাস ও অ্যারোসল বৃদ্ধির সঙ্গে সম্পর্কিত।
ভারতসহ দক্ষিণ এশিয়ায় সাম্প্রতিক দশকগুলোতে চরম বৃষ্টিপাতের ঘটনা বেড়েছে। জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে তাপমাত্রা বাড়ায় বাতাসে বেশি আর্দ্রতা জমা হয়, যা হঠাৎ তীব্র বৃষ্টির ঝুঁকি বাড়ায়।
তাছাড়া গত বছর ভারত ও পাকিস্তানের পাহাড়ি অঞ্চলে ভারী বৃষ্টির ফলে সৃষ্ট বন্যা ও ভূমিধসে ৪৩০ জনেরও বেশি মানুষ মারা যান। পাকিস্তানের খাইবার পাখতুনখোয়া প্রদেশেই ১৫ আগস্টের পর থেকে ৩৭০ জনের বেশি নিহত হন, যার মধ্যে শুধু বুনের জেলাতেই ২২৮ জন মারা যান।
অন্যদিকে, ভারতের কাশ্মীর অঞ্চলে আকস্মিক বন্যায় অন্তত ৬০ জন নিহত ও ২০০ জনেরও বেশি মানুষ নিখোঁজ হন ।
ভবিষ্যৎ ঝুঁকি
বিজ্ঞানীরা সতর্ক করে বলছেন, বর্তমান ১.২ ডিগ্রি বৈশ্বিক উষ্ণতায়ই এই ধরনের বিপর্যয় ঘটছে। শতাব্দীর শেষে তাপমাত্রা ৩ ডিগ্রি পর্যন্ত বাড়লে পরিস্থিতি আরও ভয়াবহ হতে পারে।
প্রতিরোধের উপায়
বিশেষজ্ঞদের মতে, ঝুঁকিপূর্ণ এলাকায় বসতি, নির্মাণ ও খনন কার্যক্রম কমানো, জলবায়ু সহনশীল অবকাঠামো তৈরি এবং আগাম সতর্কতা ব্যবস্থা জোরদার করা জরুরি।
দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলোর মধ্যে সমন্বয়ও গুরুত্বপূর্ণ। কারণ একটি দেশের আবহাওয়া পরিবর্তনের প্রভাব অন্য দেশেও পড়ে।
সব মিলিয়ে, কুমিল্লার সাম্প্রতিক বৃষ্টির মতো ঘটনাগুলো ভবিষ্যতের বড় সংকেত- যেখানে জলবায়ু পরিবর্তনের সঙ্গে তাল মিলিয়ে বাড়ছে হঠাৎ, তীব্র ও বিধ্বংসী বৃষ্টিপাতের ঝুঁকি।
সূত্র: সিএনএন, গার্ডিয়ান, ইউএন নিউজ
এসএএইচ