যুক্তরাজ্য

প্রবল চাপের মুখে স্টারমার, নিজ দলের এমপিরাই চাচ্ছেন তার পদত্যাগ

আন্তর্জাতিক ডেস্ক
আন্তর্জাতিক ডেস্ক আন্তর্জাতিক ডেস্ক
প্রকাশিত: ০৯:৪৮ এএম, ১২ মে ২০২৬
ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী কিয়ার স্টারমার/ ছবি: এএফপি

ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী কিয়ার স্টারমারের ওপর চাপ ক্রমেই বাড়ছে। ক্ষমতাসীন লেবার পার্টির ভেতরেই এখন তার পদত্যাগের দাবি জোরালো হয়ে উঠেছে। দলটির বহু এমপি ও মন্ত্রী চাইছেন, স্টারমার যেন তার পদত্যাগের সময়সূচি ঘোষণা করেন।

ব্রিটিশ গণমাধ্যমের খবরে বলা হয়েছে, স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী শাবানা মাহমুদও সেই মন্ত্রীদের মধ্যে রয়েছেন, যারা স্টারমারকে পদত্যাগের সময়সূচি প্রকাশের আহ্বান জানাচ্ছেন। এতে সরকারের শীর্ষ পর্যায়েই বিভক্তি তৈরি হয়েছে।

মন্ত্রিপরিষদের ভেতরে অস্থিরতা

সোমবার ১০ নম্বর ডাউনিং স্ট্রিট ছয়জন মন্ত্রীসভার সহকারীকে (পিপিএস) সরিয়ে দেয়। তারা কেউ পদত্যাগ করেছিলেন, আবার কেউ স্টারমারের পদত্যাগের সময়সূচি ঘোষণার দাবি তুলেছিলেন।

এদিকে, মঙ্গলবার (১২ মে) ভোর পর্যন্ত লেবার পার্টির ৭২ জন এমপি স্টারমারের পদত্যাগ অথবা পদত্যাগের সময়সূচি ঘোষণার দাবি জানিয়েছেন। এদিন সকালে আনুষ্ঠানিকভাবে মন্ত্রিসভার বৈঠক হওয়ার কথা রয়েছে।

যারা পদত্যাগ করেছেন

সোমবার (১১ সে) পদত্যাগকারীদের তালিকায় ছিলেন স্বাস্থ্যমন্ত্রী ওয়েস স্ট্রিটিংয়ের পিপিএস জো মরিস। ওয়েস স্ট্রিটিংকে সম্ভাব্য ভবিষ্যৎ নেতৃত্বের দাবিদার হিসেবে দেখা হচ্ছে।

মরিস বলেন, প্রধানমন্ত্রী এখন আর জনগণের আস্থা ও বিশ্বাস ধরে রাখতে পারছেন না।

এছাড়া পদত্যাগ করেছেন, উপ-প্রধানমন্ত্রী ডেভিড ল্যামির পিপিএস মেলানি ওয়ার্ড, ক্যাবিনেট অফিসমন্ত্রী ড্যারেন জোনসের পিপিএস নওশাবাহ খান, পরিবেশমন্ত্রী এমা রেনল্ডসের পিপিএস টম রাটল্যান্ড।

আরও দুজন সরাসরি স্টারমারের বিদায়ের সময়সূচি ঘোষণার দাবি জানিয়েছেন। তারা হলেন- পেনশনমন্ত্রী প্যাট ম্যাকফ্যাডেনের পিপিএস গর্ডন ম্যাকি, স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী শাবানা মাহমুদের পিপিএস স্যালি জেমসন।

স্টারমারের অবস্থান

এর আগে এক ভাষণে স্টারমার জোর দিয়ে বলেন, তিনি সন্দেহকারীদের ভুল প্রমাণ করবেন ও পদত্যাগ করছেন না। তিনি স্বীকার করেন, তার সরকার কিছু ভুল করেছে। তবে তার দাবি, বড় রাজনৈতিক সিদ্ধান্তগুলো সঠিক ছিল।

কিন্তু এই বক্তব্যের পরও তার সরে যাওয়ার দাবিতে চাপ আরও বেড়েছে। বিশেষ করে গ্রেটার ম্যানচেস্টারের মেয়র অ্যান্ডি বার্নহামের সমর্থকরা স্টারমারের পদত্যাগের সময়সূচি নির্ধারণের দাবি তুলেছেন।

দলের ডানপন্থি অংশও চাপ দিচ্ছে

শুধু বামঘেঁষা অংশ নয়, লেবার পার্টির ডানপন্থি অংশ থেকেও দ্রুত নেতৃত্ব পরিবর্তনের দাবি উঠছে। স্বাস্থ্যমন্ত্রী ওয়েস স্ট্রিটিংয়ের ঘনিষ্ঠ নেতারাও দ্রুত স্টারমারের বিদায়ের পক্ষে অবস্থান নিয়েছেন। বিশ্লেষকদের মতে, এতে অ্যান্ডি বার্নহামের নেতৃত্বের দৌড়ে অংশ নেওয়ার সম্ভাবনা কমে যেতে পারে।

নির্বাচনে ভরাডুবির পর চাপ

সাম্প্রতিক স্থানীয় নির্বাচনে ইংল্যান্ডজুড়ে প্রায় ১ হাজার ৫০০ কাউন্সিলর হারানোর পর থেকেই স্টারমারের ওপর চাপ বাড়তে থাকে। একই সঙ্গে রিফর্ম ইউকের জনপ্রিয়তা বাড়ছে ও গ্রিন পার্টিও লন্ডনসহ বিভিন্ন শহরে লেবারের ভোটব্যাংকে বড় ধাক্কা দিচ্ছে।

শুধু তাই নয়, ওয়েলসেও শত বছরের রাজনৈতিক আধিপত্য হারিয়েছে লেবার।

স্কটিশ পার্লামেন্টে ১২৯ আসনের মধ্যে দলটি পেয়েছে মাত্র ১৭টি আসন, যা হোলিরুড নির্বাচনের ইতিহাসে তাদের সবচেয়ে খারাপ ফল।

এমপিদের ক্ষোভ

এক বিবৃতিতে হেক্সহামের এমপি জো মরিস বলেন, লেবার কাউন্সিলর ও প্রার্থীদের এমন সিদ্ধান্তের দায় নিতে হয়েছে, যেগুলো তাদের ছিল না। প্রধানমন্ত্রীর সর্বোচ্চ চেষ্টা সত্ত্বেও ভোটাররা বিশ্বাস করছে না যে তিনি সেই পরিবর্তন আনতে পারবেন, যার জন্য তারা ভোট দিয়েছিল।

তিনি আরও বলেন, দেশ ও দলের স্বার্থে প্রধানমন্ত্রীর দ্রুত একটি সময়সূচি ঘোষণা করা উচিত, যাতে নতুন নেতা জনগণের আস্থা ফিরিয়ে আনতে পারেন ও সরকারের দেওয়া প্রতিশ্রুতিগুলো বাস্তবায়ন করতে পারে।

ইস্ট ওর্থিং অ্যান্ড শোরহামের এমপি টম রাটল্যান্ড বলেন, আমার কাছে পরিষ্কার যে প্রধানমন্ত্রী শুধু পার্লামেন্টারি লেবার পার্টির ভেতরেই নয়, পুরো দেশেই তার কর্তৃত্ব হারিয়েছেন ও তিনি তা আর ফিরে পাবেন না।

গিলিংহ্যাম অ্যান্ড রেইনহামের এমপি নওশাবাহ খান বলেন, প্রধানমন্ত্রী জনগণের আস্থা হারিয়েছেন।

তিনি বলেন, আমি রাজনীতিতে এসেছি ব্যর্থতা দেখে চুপ করে থাকার জন্য নয়। এখনই আমাদের পরিষ্কার দিক পরিবর্তন প্রয়োজন, কোনো রাজনৈতিক খেলা নয়।”

তার ভাষায়, আমি নতুন নেতৃত্ব চাই, যাতে আমরা জনগণের আস্থা পুনর্গঠন করতে পারি এবং ব্রিটিশ জনগণ যে ভালো ভবিষ্যতের জন্য ভোট দিয়েছে, তা নিশ্চিত করতে পারি।

পিপিএস কী?

পিপিএস বা পার্লামেন্টারি প্রাইভেট সেক্রেটারি হলো একটি অবৈতনিক পদ। কোনো মন্ত্রী নিজের সহকারী হিসেবে একজন এমপিকে এই দায়িত্ব দিয়ে থাকেন।

সেপ্টেম্বরে বিদায়ের আহ্বান

শাবানা মাহমুদের পিপিএস স্যালি জেমসন বলেছেন, স্টারমারের উচিত সেপ্টেম্বর অথবা তার অল্প কিছুদিন পরের মধ্যে বিদায়ের একটি পরিষ্কার সময়সূচি ঘোষণা করা।

ডনকাস্টার সেন্ট্রালের এমপি জেমসন আরও বলেন, লেবার পার্টির ন্যাশনাল এক্সিকিউটিভ কমিটির (এনইসি) উচিত সম্ভাব্য সব প্রার্থীকে নেতৃত্ব নির্বাচনে অংশ নেওয়ার সুযোগ নিশ্চিত করা।

এর আগে চলতি বছরের শুরুতে এনইসি অ্যান্ডি বার্নহামকে গর্টন অ্যান্ড ডেন্টনের উপ-নির্বাচনে প্রার্থী হতে দেয়নি।

বার্নহামকে অনেক লেবার এমপি সমর্থন করেন। তবে দলীয় নেতৃত্বে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করতে হলে তাকে অবশ্যই এমপি হতে হবে। এজন্য অন্য কোনো এমপিকে পদত্যাগ করে তার জন্য উপনির্বাচনের সুযোগ তৈরি করতে হবে।

স্টারমারের পাল্টা চেষ্টা

নির্বাচনের খারাপ ফলের পর নিজের অবস্থান শক্ত করতে শুক্রবার (৮ মে) স্টারমার একটি ভাষণ দেন। তিনি প্রতিশ্রুতি দেন, বড় চ্যালেঞ্জগুলোর মুখোমুখি হবেন।

স্টারমার ইউরোপীয় ইউনিয়নের (ইইউ) সঙ্গে আরও ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক গড়ার ইচ্ছার কথা পুনর্ব্যক্ত করেন। একই সঙ্গে ব্রিটিশ স্টিল জাতীয়করণের ঘোষণা দেন এবং এ বিষয়ে চলতি সপ্তাহেই আইন আনার কথা জানান।

তিনি আরও বলেন, আমি দায়িত্ব ছেড়ে পালিয়ে যাব না। কারণ এতে দেশ বিশৃঙ্খলার মধ্যে পড়বে, যেমনটি কনজারভেটিভরা বারবার করেছে।

ক্যাথরিন ওয়েস্টের অবস্থান পরিবর্তন

ডাউনিং স্ট্রিট সাময়িক স্বস্তি পায়, যখন লেবার এমপি ক্যাথরিন ওয়েস্ট নেতৃত্বের চ্যালেঞ্জ থেকে সরে আসেন। সপ্তাহ শেষে উত্তর লন্ডনের এই এমপি নেতৃত্ব নির্বাচনে নিজের নাম তোলার হুমকি দিয়েছিলেন।

তবে স্টারমারের ভাষণ শোনার পর তিনি সরাসরি প্রতিদ্বন্দ্বিতায় না গিয়ে সেপ্টেম্বরে তার বিদায়ের সময়সূচি ঘোষণার দাবি জানান। যদিও নিজে নেতা হতে চাননি, তবে অন্যদের নেতৃত্ব নির্বাচনে উৎসাহিত করতে চেয়েছিলেন ওয়েস্ট।

লেবারের সম্ভাব্য আরেক নেতৃত্বপ্রার্থী ও সাবেক উপ-প্রধানমন্ত্রী অ্যাঞ্জেলা রেইনার কমিউনিকেশন ওয়ার্কার্স ইউনিয়নের এক সম্মেলনে বলেন, দল হিসেবে আমাদের এর চেয়ে ভালো করতে হবে।

তিনি বলেন, স্টারমার ভোটারদের হতাশা স্বীকার করেছেন। তবে আমাদের বিচার করা হবে কাজ দিয়ে, শুধু কথায় নয়। রেইনার আবারও অ্যান্ডি বার্নহামকে পার্লামেন্টে ফেরার সুযোগ দেওয়ার আহ্বান জানিয়েছেন।

সূত্র: বিবিসি

এসএএইচ

পাঠকপ্রিয় অনলাইন নিউজ পোর্টাল জাগোনিউজ২৪.কমে লিখতে পারেন আপনিও। লেখার বিষয় ফিচার, ভ্রমণ, লাইফস্টাইল, ক্যারিয়ার, তথ্যপ্রযুক্তি, ধর্ম, কৃষি ও প্রকৃতি। আজই আপনার লেখাটি পাঠিয়ে দিন [email protected] ঠিকানায়।