ঢাকার সঙ্গে সরাসরি ফ্লাইট স্থগিত করলো এয়ার ইন্ডিয়া
ঢাকার সঙ্গে সরাসরি ফ্লাইট সাময়িক স্থগিতসহ একাধিক আন্তর্জাতিক রুটে বড় ধরনের পরিবর্তনের ঘোষণা দিয়েছে ভারতের রাষ্ট্রায়ত্ত বিমানসংস্থা ‘এয়ার ইন্ডিয়া’। জেট ফুয়েলের রেকর্ড উচ্চ দামে, দীর্ঘপাল্লার আন্তর্জাতিক ফ্লাইট পরিচালনায় বাড়তি খরচ ও আকাশপথের বিধিনিষেধের কারণে এই পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে বলে জানিয়েছে এয়ারলাইনটি।
জানা গেছে, চলতি বছরের জুন থেকে আগস্ট পর্যন্ত বিভিন্ন আন্তর্জাতিক রুটে সাময়িকভাবে ফ্লাইট কমানো, স্থগিত ও সময়সূচি পুনর্বিন্যাসের সিদ্ধান্ত নিয়েছে এয়ারলাইনটি। গ্রীষ্মকালীন ভ্রমণের ব্যস্ত মৌসুমে নেওয়া এই সিদ্ধান্তে হাজারো আন্তর্জাতিক যাত্রী প্রভাবিত হতে পারেন বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে।
এয়ারলাইনটির ভাষ্য, নতুন সূচির লক্ষ্য হচ্ছে ‘নেটওয়ার্ক স্থিতিশীলতা’ নিশ্চিত করা ও হঠাৎ ফ্লাইট বাতিল বা শেষ মুহূর্তের যাত্রী ভোগান্তি কমানো। যদিও একাধিক রুটে ফ্লাইট কমানো বা স্থগিত করা হয়েছে, তবুও এয়ার ইন্ডিয়া জানিয়েছে তারা প্রতি মাসে ১ হাজার ২০০টির বেশি আন্তর্জাতিক ফ্লাইট পরিচালনা অব্যাহত রাখবে ও পাঁচ মহাদেশের সঙ্গে সংযোগ বজায় রাখবে।
পশ্চিম এশিয়া ও পূর্ব ইউরোপের কিছু অংশে আকাশসীমা ব্যবহারে বিধিনিষেধের কারণে এয়ারলাইনগুলোকে দীর্ঘ পথ ঘুরে যেতে হচ্ছে। এতে জ্বালানি খরচ, ক্রুদের কর্মঘণ্টা ও বিমান পরিচালনার ব্যয় উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়ে গেছে।
এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে বিমান জ্বালানি বা এভিয়েশন টারবাইন ফুয়েলের ঐতিহাসিক উচ্চ মূল্য। ফলে অতিদীর্ঘ রুটের অনেক ফ্লাইট পরিচালনা বাণিজ্যিকভাবে কঠিন হয়ে পড়েছে। বিশেষ করে, গ্রীষ্মকালীন ছুটিতে বিদেশগামী ভারতীয় যাত্রীদের জন্য এই পরিবর্তন ফ্লাইটের প্রাপ্যতা, টিকিটের দাম ও ভ্রমণ পরিকল্পনায় সরাসরি প্রভাব ফেলতে পারে বলে মনে করা হচ্ছে।
উত্তর আমেরিকার রুটে বড় পরিবর্তন
এয়ার ইন্ডিয়ার উত্তর আমেরিকা নেটওয়ার্কে সবচেয়ে বড় পরিবর্তন এসেছে। দিল্লি-শিকাগো রুট পুরোপুরি সাময়িকভাবে স্থগিত করা হয়েছে। এতে যুক্তরাষ্ট্রের মিডওয়েস্ট অঞ্চলে যাতায়াতকারী যাত্রীরা সমস্যায় পড়তে পারেন।
ভারত ও ক্যালিফোর্নিয়ার প্রযুক্তি কেন্দ্র সান ফ্রান্সিসকোর মধ্যে অন্যতম ব্যস্ত রুট দিল্লি-সান ফ্রান্সিসকো ফ্লাইট আগস্ট পর্যন্ত সাপ্তাহিক ১০টি থেকে কমিয়ে ৭টিতে নামানো হয়েছে। একইভাবে দিল্লি-টরন্টো রুট জুলাই পর্যন্ত সাপ্তাহিক ১০টির বদলে ৫টি ফ্লাইট পরিচালনা করবে। আগস্টে আবার দৈনিক ফ্লাইট চালু হবে।
দিল্লি-ভ্যাঙ্কুভার রুটও দৈনিক ফ্লাইট থেকে কমিয়ে সপ্তাহে ৫ দিন করা হয়েছে। তবে মুম্বাই-নিউয়ার্ক (নিউ জার্সি) রুটে ফ্লাইট বাড়ানো হয়েছে। আগে এই রুটে সপ্তাহে ৩টি ফ্লাইট থাকলেও, এখন তা দৈনিক করা হয়েছে।
বিশ্লেষকদের মতে, যেসব রুটে যাত্রী চাহিদা ও বাণিজ্যিক সম্ভাবনা বেশি, সেদিকে কৌশলগতভাবে সক্ষমতা বাড়াচ্ছে এয়ার ইন্ডিয়া।
এদিকে দিল্লি-নিউয়ার্ক ও মুম্বাই-নিউইয়র্ক (জেএফকে) রুট সাময়িকভাবে স্থগিত করা হয়েছে। তবে দিল্লি-নিউইয়র্ক (জেএফকে) রুটে দৈনিক ফ্লাইট চলবে।
যুক্তরাষ্ট্র ও কানাডাগামী যাত্রীদের জন্য এর অর্থ হচ্ছে- সরাসরি ফ্লাইটের সংখ্যা কমে যাওয়া এবং বিকল্প শহর বা রুটের ওপর নির্ভরশীলতা বাড়া।
ইউরোপের রুটেও কাটছাঁট
এয়ার ইন্ডিয়ার ইউরোপ নেটওয়ার্কেও একাধিক রুটে ফ্লাইট কমানো হয়েছে। বর্তমানে দিনে দুইবার পরিচালিত দিল্লি-প্যারিস রুট এখন দিনে একবার চলবে। ফলে সাপ্তাহিক ফ্লাইট ১৪টি থেকে কমে ৭টিতে নেমে আসছে।
এছাড়া দিল্লি থেকে ইউরোপের আরও কয়েকটি শহরে ফ্লাইট কমানো হয়েছে-
কোপেনহেগেন: সপ্তাহে ৪টি থেকে ৩টি
মিলান: ৫টি থেকে ৪টি
ভিয়েনা: ৪টি থেকে ৩টি
জুরিখ: ৪টি থেকে ৩টি
রোম: ৪টি থেকে ৩টি
গ্রীষ্ম মৌসুমে ইউরোপ ভারতীয় পর্যটকদের অন্যতম জনপ্রিয় গন্তব্য হওয়ায় অবকাশযাপনকারী ও ব্যবসায়িক- উভয় ধরনের যাত্রীই এতে প্রভাবিত হতে পারেন। বিশেষ করে ফ্রান্স, ইতালি ও সুইজারল্যান্ডগামী যাত্রীদের জন্য অবশিষ্ট ফ্লাইটে ভাড়া আরও বাড়তে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে।
অস্ট্রেলিয়া রুটেও কমছে ফ্লাইট
অস্ট্রেলিয়াগামী ফ্লাইটও কমিয়েছে এয়ার ইন্ডিয়া। দিল্লি থেকে মেলবোর্ন ও সিডনি রুটে দৈনিক ফ্লাইটের বদলে জুন থেকে আগস্ট পর্যন্ত সপ্তাহে ৪টি করে ফ্লাইট পরিচালিত হবে। এতে অস্ট্রেলিয়ায় পড়তে যাওয়া ভারতীয় শিক্ষার্থী, কর্মজীবী ও পর্যটকেরা ভোগান্তিতে পড়তে পারেন।
দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়া ও সার্ক রুটে বড় ধাক্কা
সবচেয়ে বেশি কাটছাঁট হয়েছে দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়া ও দক্ষিণ এশিয়ার প্রতিবেশী দেশগুলোর রুটে। দিল্লি-সাংহাই রুট আগস্ট পর্যন্ত বন্ধ থাকবে। একই সময়ে চেন্নাই-সিঙ্গাপুর ফ্লাইটও স্থগিত করা হয়েছে।
ভারতীয় যাত্রীদের অন্যতম ব্যস্ত গন্তব্য সিঙ্গাপুরে সংযোগ উল্লেখযোগ্যভাবে কমানো হয়েছে। দিল্লি-সিঙ্গাপুর রুটে সাপ্তাহিক ফ্লাইট ২৪টি থেকে কমে ১৪টিতে নেমেছে। মুম্বাই-সিঙ্গাপুর রুটে ১৪টির বদলে ৭টি ফ্লাইট চলবে।
থাইল্যান্ডগামী যাত্রীদের ক্ষেত্রেও বিকল্প কমে যাচ্ছে। জুলাই থেকে দিল্লি-ব্যাংকক রুটে সাপ্তাহিক ২৮টির বদলে ২১টি ফ্লাইট চলবে। মুম্বাই-ব্যাংকক রুটে ১৩টি থেকে কমিয়ে ৭টি করা হয়েছে।
এছাড়া দিল্লি-কুয়ালালামপুর রুটে ১০টি থেকে ৫টি তে নামিয়ে আনা হয়েছে। এছাড়া দিল্লি-হো চি মিন সিটি রুটে ৭টি থেকে ৪টি, দিল্লি-হ্যানয় রুটে ৫টি থেকে ৪টি ফ্লাইট নির্ধারণ করা হয়েছে।
সার্ক অঞ্চলের রুটগুলোতেও বড় পরিবর্তন
দিল্লি-কাঠমান্ডু রুটে জুনে সাপ্তাহিক ৪২টির বদলে ২৮টি এবং জুলাই-আগস্টে ২১টি ফ্লাইট পরিচালিত হবে।
সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তন এসেছে বাংলাদেশ রুটে। দিল্লি-ঢাকা রুটে দৈনিক ফ্লাইট কমিয়ে সপ্তাহে ৪ দিন করা হয়েছে। একই সঙ্গে, মুম্বাই-ঢাকা সরাসরি ফ্লাইট সাময়িকভাবে স্থগিত করেছে এয়ার ইন্ডিয়া।
এছাড়া শ্রীলঙ্কা ও মালদ্বীপ রুটেও পরিবর্তন আনা হয়েছে। মুম্বাই-কলম্বো রুটে দৈনিকের বদলে সপ্তাহে ৪টি ফ্লাইট চলবে। দিল্লি-কলম্বো রুটে ১৪টির বদলে ১২টি ফ্লাইট পরিচালিত হবে।
রক্ষণাবেক্ষণ কাজের কারণে দিল্লি-মালে ফ্লাইট আগস্ট পর্যন্ত বন্ধ রাখা হয়েছে। এতে মালদ্বীপ ভ্রমণ পরিকল্পনা করা পর্যটকরা সমস্যায় পড়তে পারেন।
যাত্রীদের সহায়তার আশ্বাস
এয়ার ইন্ডিয়া জানিয়েছে, ক্ষতিগ্রস্ত যাত্রীদের বিকল্প ফ্লাইটে স্থানান্তরের চেষ্টা করা হবে। এছাড়া নির্দিষ্ট শর্তসাপেক্ষে যাত্রার তারিখ বিনামূল্যে পরিবর্তন অথবা পুরো অর্থ ফেরত নেওয়ার সুযোগও থাকবে।
যাত্রীদের সহায়তায় এয়ার ইন্ডিয়ার ২৪ ঘণ্টার কল সেন্টার ও অনলাইন সাপোর্ট চালু থাকবে বলে জানিয়েছে সংস্থাটি। একই সঙ্গে, আগামী তিন মাস আন্তর্জাতিক রুটে যাত্রীদের ভ্রমণের আগে ফ্লাইটের সর্বশেষ তথ্য ও বুকিং স্ট্যাটাস যাচাই করার পরামর্শ দেওয়া হয়েছে।
সূত্র: টাইমস অব ইন্ডিয়া
এসএএইচ