নিজেদের মধ্যে অনৈক্যের মাশুল গুনছেন পশ্চিমবঙ্গের মুসলিমরা

মো: শাহিন মিয়া
মো: শাহিন মিয়া মো: শাহিন মিয়া
প্রকাশিত: ০৩:৫৯ পিএম, ১৪ মে ২০২৬
পশ্চিমবঙ্গে ভোট দেওয়ার পর এক নারী/ ছবি: এএফপি (ফাইল)

পশ্চিমবঙ্গের মোট জনসংখ্যার প্রায় ৩০ শতাংশ মুসলিম ভোটার। আগের নির্বাচনে, বিশেষ করে ২০২১ সালে এই ভোটব্যাংকের বড় অংশ মমতা ব্যানার্জীর নেতৃত্বাধীন তৃণমূল কংগ্রেসের পক্ষে একজোট হয়েছিল। তখন সংখ্যালঘু ভোটের ঐক্য বিজেপির আগ্রাসী উত্থান ঠেকাতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছিল।

তবে এবার (২০২৬ সাল) বিধানসভা নির্বাচনে সেই ঐক্যে বড় ধরনের ভাঙন দেখা গেছে। সংখ্যালঘু অধ্যুষিত বেশ কয়েকটি জেলায় মুসলিম ভোট ভাগ হয়ে যায় তৃণমূল কংগ্রেস, কংগ্রেস, বাম দল এবং হুমায়ুন কবিরের এজেইউপি ও আইএসএফের মতো ছোট আঞ্চলিক দলগুলোর মধ্যে। ফলে যেসব আসনে বিজেপিবিরোধী ভোট এক জায়গায় থাকতো, এবার সেই বিভাজনই ফল নির্ধারণে বড় ভূমিকা রেখেছে।

মুর্শিদাবাদে, যেখানে মুসলিম জনসংখ্যা প্রায় দুই-তৃতীয়াংশ, সেখানে তৃণমূলের আসন সংখ্যা ২০ থেকে নেমে দাঁড়িয়েছে ৯-এ। অন্যদিকে বিজেপি দুটি আসন থেকে বেড়ে ৯টি আসন পেয়েছে। মালদা ও উত্তর দিনাজপুরেও একই প্রবণতা দেখা গেছে, যা সংখ্যালঘু ভোটারদের মধ্যে গভীর রাজনৈতিক বিভাজনের ইঙ্গিত দিচ্ছে।

তাছাড়া নির্বাচনের সময় ভোটার তালিকার বিশেষ সংশোধন বা ‘স্পেশাল ইনটেনসিভ রিভিশন’ নিয়েও ব্যাপক বিতর্ক হয়। রাজ্যজুড়ে প্রায় ৯১ লাখ ভোটারের নাম বাদ দেওয়া হয়। বিরোধী দলগুলোর অভিযোগ, বাদ পড়া ভোটারদের বড় অংশই ছিল তৃণমূল সমর্থক মুসলিম ভোটার।

ফলাফল বিশ্লেষণে স্পষ্টভাবে দেখা যাচ্ছে, মুসলিমদের মধ্যে অনৈক্য বিজেপির নজিরবিহীন জয়ে বড় ভূমিকা রেখেছে। তবে জয়ের পরে বিজেপি মুসলিমদের বিরুদ্ধে একের পর এক পদক্ষেপ নিতে শুরু করেছে। তাছাড়া বিজেপির নেতারা প্রথম থেকেই বলে আসছেন এই জয় হিন্দুদের জয়। নির্বাচনের আগে বিভিন্ন নির্বাচনি ক্যাম্পেইনে মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী মুসলিমদের শিক্ষা দেওয়ার কথা বলেন। এমনকি তাদের পশ্চিমবঙ্গ থেকে তাড়িয়ে দেওয়ার কথাও বলা হয়েছে।

নির্বাচনের আগেই প্রশ্ন উঠেছিল বিজেপি ক্ষমতায় এলে পশ্চিমবঙ্গের বাঙালিরা তাদের ধর্মীয় রীতি আগের মতো পালন করতে পারবেন কি না। কারণ বিজেপিশাসিত অন্য রাজ্যগুলোতে মাংস ও মাছ খাওয়া প্রায় অলিখিতভাবে নিষিদ্ধ। বিশেষ করে মুসলিমদের অধিকারকে সেসব রাজ্যে স্বীকৃতি দেওয়া হয় না। মোদীর গুজরাট বা যোগী আদিত্যনাথের উত্তর প্রদেশে গরুর মাংস খেলে পিটিয়ে মারা হয়। মসজিদ ও মুসলিদের বাড়িঘর বুলডোজার দিয়ে ধ্বংস করে দেওয়া হয়।

এখন সেই আশঙ্কা পশ্চিমবঙ্গেও দেখা যাচ্ছে। পশ্চিমবঙ্গে বিজেপি সরকার গঠনের কয়েক দিনের মধ্যেই উত্তরপ্রদেশের আদলে ‘বুলডোজার অভিযান’ দেখা গেলো। রাজ্যের রাজধানী কলকাতার তপসিয়ার তিলজলা এলাকায় একটি চামড়ার কারখানায় ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ডের পর অবৈধ নির্মাণের অভিযোগ তুলে ভবনটি বুলডোজার দিয়ে গুঁড়িয়ে দেওয়া হয়। তাছাড়া নির্বাচনে জয়ের পরের দিন তৃণমূলের অনেক রাজনৈতিক কার্যালয় ভেঙে ফেলা হয়েছে।

কলকাতার নিউমার্কেট চত্বরের হক মার্কেট সংলগ্ন এলাকায় তৃণমূল কংগ্রেসের দলীয় কার্যালয় এবং মাংসের দোকান বুলডোজার দিয়ে গুঁড়িয়ে দেওয়া হয়েছে। এর পাশাপাশি কলকাতা নিউমার্কেট চত্বরের বিভিন্ন ছোট ছোট ব্যবসায়ী এবং রাস্তার হকারদের দোকানও ভাঙচুর করা হয়েছে বলে অভিযোগ পাওয়া গেছে।

পশ্চিমবঙ্গের উত্তর ২৪ পরগনা জেলার বারাসাত থানার অন্তর্গত নোয়াপাড়া অঞ্চলের ‘মসজিদবাড়ি রোডের’ নাম বদলে রাখা হয়েছে ‘নেতাজি পল্লী রোড’। পাশাপাশি বারাসাতের ‘সিরাজ উদ্যান’ পার্কের নাম পরিবর্তন করে রাখা হয়েছে ‘শিবাজী উদ্যান’।

পশ্চিমবঙ্গের বিভিন্ন স্থানে সড়কে দাঁড়িয়ে ঈদের নামাজ আদায় বহু বছরের ঐতিহ্য। কিন্তু এবার বিজেপি ক্ষমতায় আসার পর সেই ধারা অব্যাহত থাকবে কি না তা নিয়ে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে অনেকের মনে। এ বিষয়ে উত্তর ২৪ পরগনা জেলার নোয়াপাড়ার বিধায়ক অর্জুন সিং বলেন, নামাজ পড়তে পারবে, কিন্তু রাস্তায় পড়া যাবে না। রাস্তায় নামাজ পড়া ঠিক নয়। মসজিদে যত ইচ্ছা নামাজ পড়ুক, কোনো অসুবিধা নেই। কিন্তু রাস্তায় মানুষের পথ রোধ করে কীভাবে নামাজ পড়তে পারে? নতুন সরকারের পক্ষ থেকেও একই রকম বার্তা দেওয়া হচ্ছে।

ক্ষমতায় এসেই গরু, মহিষ জবাই সংক্রান্ত কঠিন নির্দেশ শুভেন্দু অধিকারীর বিজেপি সরকারের। বিজ্ঞপ্তি জারি করে শুভেন্দু অধিকারীর বিজেপি সরকার জানিয়েছে, ‘প্রকাশ্যে যত্রতত্র নয়, শুধু সরকার স্বীকৃত কসাইখানায়ই জবাই দিতে হবে গরু, মহিষ। জবাই দিতে লাগবে নির্দিষ্ট পশুর ফিটনেস সার্টিফিকেট বা অনুমতিপত্র।

শুভেন্দু অধিকারী বলেন,পশ্চিমবঙ্গ আসামের মডেল অনুসরণ করবে। এক বক্তব্যে তিনি জানান, সীমান্ত সুরক্ষা জোরদার করতে তার সরকার কঠোর ব্যবস্থা নেবে এবং এ বিষয়ে আসামের অভিজ্ঞতা কাজে লাগানো হবে।

আসামের ৩ কোটি ১০ লাখ বাসিন্দার প্রায় এক-তৃতীয়াংশই মুসলিম, যা ভারতের রাজ্যগুলোর মধ্যে সর্বোচ্চ অনুপাত। মিয়া নামে অবমাননাকরভাবে পরিচিত এই জনগোষ্ঠী দীর্ঘদিন ধরে নেতিবাচক প্রচারণার লক্ষ্যবস্তু হয়ে আসছে, যা ২০১৬ সালে বিজেপি ক্ষমতায় আসার পর আরও জোরদার হয়েছে।

১২৬ সদস্যের আসাম বিধানসভায় ১০২টি আসন নিয়ে মুখ্যমন্ত্রী হিমন্ত বিশ্ব শর্মা ২০২১ সালের তুলনায় আরও বড় ব্যবধানে ক্ষমতায় ফিরেছেন। বিশ্লেষকদের মতে, এই বড় জয় মুসলিমদের বিরুদ্ধে তার আরও কঠোর অবস্থানকে উৎসাহিত করতে পারে। গত পাঁচ বছরে তিনি এবং তার সরকার মুসলিম সম্প্রদায়কে অনুপ্রবেশকারী হিসেবে আখ্যা দিয়ে তাদের বিরুদ্ধে প্রচারণা চালিয়েছে, বহু মানুষকে উচ্ছেদ করেছে এবং ঘরবাড়ি ভাঙার অভিযোগ উঠেছে।

আসামে ২০২৩ সালের সীমানা পুনর্নির্ধারণ বা ডিলিমিটেশন প্রক্রিয়া রাজ্যের রাজনৈতিক চিত্রে বড় ধরনের পরিবর্তন আনে। ২০০১ সালের আদমশুমারির ভিত্তিতে পরিচালিত এই প্রক্রিয়ার মাধ্যমে মুসলিম-অধ্যুষিত বিধানসভা আসনের সংখ্যা আনুমানিক ৩৩-৩৫ থেকে কমে ২০-২৩টিতে নেমে আসে। এই পুরো প্রক্রিয়াই আসাম মডেল নামে পরিচিত।

দীর্ঘ সময়ের জন্য ক্ষমতা ধরে রাখতে ভবিষ্যতে পশ্চিমবঙ্গেও একই প্রক্রিয়া বাস্তবায়ন করতে পারে শুভেন্দু অধিকারীর নেতৃত্বাধীন বিজেপি সরকার। যাতে মুসলিমরা নির্বাচনে আর প্রভাব ফেলতে না পারে।

মমতা ব্যানার্জীর তৃণমূল সরকারের আমলে মুসলিম অধ্যুষিত এলাকার উন্নয়ন নিয়ে অনেক প্রশ্ন আছে। তবে তার সরকার মুসলিমবিরোধী কোনো পদক্ষেপ নেইনি। তাছাড়া হিন্দু-মুসলিম দ্বন্দ্ব বা দাঙ্গা পশ্চিমবঙ্গে দেখা যায়নি। সব সম্প্রদায়ের মানুষ স্বাধীনভাবে তাদের ধর্মীয় রীতি পালন করেন। কিন্তু বিজেপির সরকারের সময় সেই সাম্প্রদায়িক সম্পৃতি বা ধর্মীয় স্বাধীনতা পশ্চিমবঙ্গে আর থাকবে না বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে। এক্ষেত্রে মুসলিম ভোট ও নেতাদের মধ্যে বিভাজন ও অনৈক্যও কম দায়ী নয়।

এমএসএম

পাঠকপ্রিয় অনলাইন নিউজ পোর্টাল জাগোনিউজ২৪.কমে লিখতে পারেন আপনিও। লেখার বিষয় ফিচার, ভ্রমণ, লাইফস্টাইল, ক্যারিয়ার, তথ্যপ্রযুক্তি, ধর্ম, কৃষি ও প্রকৃতি। আজই আপনার লেখাটি পাঠিয়ে দিন [email protected] ঠিকানায়।