শুভেন্দুর পশ্চিমবঙ্গে বাংলাদেশি ভ্রমণকারীরা কতটা নিরাপদ?
২০১৪ সালে ক্ষমতায় আসার পর থেকে ভারতের ক্ষমতাসীন বিজেপির অগ্রযাত্রা খুব কম ক্ষেত্রেই বাধার মুখে পড়েছে। তবে এক্ষেত্রে পশ্চিমবঙ্গ ছিল ব্যতিক্রম। ভারতের চতুর্থ সর্বাধিক জনবহুল এই রাজ্যের প্রায় ১০ কোটি ৫০ লাখ মানুষের মধ্যে ২৫ শতাংশের বেশি মুসলিম। গত ১৫ বছর ধরে এখানকার ভোটাররা হিন্দুত্ববাদী বিজেপিকে প্রত্যাখ্যান করে মধ্যপন্থি তৃণমূল কংগ্রেসকে সমর্থন দিয়ে আসছিলেন।
তৃণমূল নেত্রী মমতা ব্যানার্জী মুসলিম ও হিন্দু—উভয় সম্প্রদায়ের কাছেই গ্রহণযোগ্য হওয়ার চেষ্টা করেছিলেন। তবে নির্বাচনের পর পরিস্থিতি বদলে যায়। পশ্চিমবঙ্গের ২৯৪ সদস্যের বিধানসভায় বিজেপি ২০৭টি আসনে জয় পেয়ে চমকপ্রদ সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জন করে। এরই মধ্যে রাজ্যটিতে মুখ্যমন্ত্রী হিসেবে শপথগ্রহণ করেছেন মুসলিম ও বাংলাদেশবিরোধী নেতা হিসেবে পরিচিত শুভেন্দু অধিকারী।
শুভেন্দু অধিকারী ২০২৬ সালের বিধানসভা নির্বাচনে প্রচারণা শুরুর অনেক আগে থেকেই বাংলাদেশিদের বিরুদ্ধে বিষাদগার করে আসছেন। বিশেষ করে ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট বাংলাদেশে ক্ষমতার পট পরিবর্তনের পর বাংলাদেশের বিরুদ্ধে কঠোর অবস্থানগ্রহণ করেন তিনি। এমনকি ভারতীয় মুসলিমদেরকেও তিনি বিদেশি বা রোহিঙ্গা হিসেবে আখ্যায়িত করে আসছেন।
২০২৪ সালের আগে শুভেন্দু বাংলাদেশবিরোধী মন্তব্য করলেও পরিস্থিতি আরও জটিল হয় অভ্যুত্থানের পর। বাংলাদেশের রাজনৈতিক ও বিচ্ছিন্ন কিছু ঘটনাকে কেন্দ্র করে বিজেপি ফায়দা লুটতে সাম্প্রদায়িক প্রচারণা চালাতে থাকে। এক পর্যায়ে পশ্চিমবঙ্গে বাংলাদেশি পর্যটকদের নিষিদ্ধ পর্যন্ত করা হয়। হোটেল মোটেলগুলোতে বাংলাদেশিদের রুম না দেওয়ার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। এমনকি বাংলাদেশিদের চিকিৎসাসেবা দেওয়াও বন্ধ করে দেওয়া হয় পশ্চিমবঙ্গের হাসপাতালগুলোতে। আর এক্ষেত্রে সবচেয়ে বড় ভূমিকা রাখে শুভেন্দুর নিতৃত্বাধীন বিজেপি।
বাংলাদেশে সংখ্যালঘু নির্যাতনের অভিযোগ এবং চিন্ময় কৃষ্ণ দাসের মুক্তির দাবিকে সামনে রেখে শুভেন্দু প্রথম বড় ধরনের কড়া বার্তা দেন ২০২৪ সালের ২ ডিসেম্বর। পেট্রাপোল সীমান্তে এক সমাবেশে তিনি বলেন, বাংলাদেশে হিন্দুদের ওপর নির্যাতন বন্ধ না হলে এবং চিন্ময় কৃষ্ণ দাস মুক্তি না পেলে সীমান্ত বাণিজ্য বন্ধ করে দেওয়ার পদক্ষেপ নেওয়া হতে পারে। পাশাপাশি বাংলাদেশে আলু ও পেঁয়াজ রপ্তানি বন্ধের কথাও উল্লেখ করেন।
এর কয়েক দিন পর ৮ ডিসেম্বর এক জনসভায় বাংলাদেশ থেকে কলকাতা দখলের কথিত হুমকির প্রসঙ্গ টেনে তিনি বাংলাদেশের সামরিক সক্ষমতাকে তীব্রভাবে কটাক্ষ করেন। সে সময় ভারতের রাফাল যুদ্ধবিমান ও সামরিক শক্তির প্রসঙ্গ উল্লেখ করে তিনি দাবি করেন, সামরিক দিক থেকে বাংলাদেশ ভারতের সঙ্গে তুলনীয় নয়।
২০২৫ সালের শুরুতে তার ভাষা আরো আক্রমণাত্মক হয়ে ওঠে। ১২ জানুয়ারি তিনি বলেন, ভারত চাইলে আধুনিক ড্রোন প্রযুক্তির মাধ্যমেই বাংলাদেশকে দ্রুত মোকাবিলা করতে সক্ষম। এরপর ১৯ জানুয়ারি বারাসাতের এক অনুষ্ঠানে তিনি মন্তব্য করেন, বাংলাদেশ-ভারত সংঘাত হলে ভারতের জন্য সেটি দীর্ঘমেয়াদি যুদ্ধ নয়, বরং ‘কয়েক মিনিটেই’ সমাধান হয়ে যাবে।
বছরের শেষ দিকে ২২ ডিসেম্বর তিনি বাংলাদেশে পেঁয়াজ রপ্তানি বন্ধের আহ্বান জানান এবং বাংলাদেশ ডেপুটি হাইকমিশন ঘেরাওয়ের ঘোষণা দেন। তিনি বলেন, আমরা পুনরায় ১০ হাজার মানুষ নিয়ে বাংলাদেশ ডেপুটি হাইকমিশন অভিযান করবো।
এর মাত্র কয়েক দিন পর, ২৭ ডিসেম্বর, ২০২৫: ইসরায়েল যেমন গাজায় শিক্ষা দিয়েছে, সেভাবে বাংলাদেশকে শিক্ষা দেওয়ার কথা বলেন শুভেন্দু।
গত বছরের ডিসেম্বর মাসে পশ্চিমবঙ্গের মধ্যাঞ্চলের মালদ জেলায় যান বিজেপি নেতা শুভেন্দু অধিকারী। মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠ এই জেলায় এক সমাবেশে তিনি প্রকাশ্যে ‘হিন্দু ঐক্য’র ডাক দেন এবং এটিকে হিন্দু ধর্মের টিকে থাকার লড়াই হিসেবে তুলে ধরেন।
সমাবেশে তিনি বলেন, অন্য ধর্মের মানুষের নিজেদের অনেক দেশ আছে। হিন্দুদের শুধু ভারত রয়েছে। আমাদের ধর্ম বাঁচাতে হিন্দুদের ঐক্যবদ্ধ হতে হবে। ১৯৪৭ সালের দেশভাগে আমরা ভুগেছি এবং আফগানিস্তান, পাকিস্তান ও বাংলাদেশে আমরা প্রান্তিক হয়ে পড়েছি।
এছাড়া গত বছর পশ্চিমবঙ্গের সীমান্তবর্তী মুর্শিদাবাদ জেলায় ওয়াকফ (সংশোধনী) আইনবিরোধী মুসলিম সংগঠনগুলোর বিক্ষোভ সহিংস হয়ে ওঠার ঘটনায় তিনজন নিহত হন। সেই সময় শান্তির আহ্বান জানানোর বদলে শুভেন্দু অধিকারী ডিসেম্বর মাসে ‘হিন্দু বাঁচাও র্যালি’ আয়োজন করেন। সেখানে তিনি বলেন, স্লোগান হলো ‘হিন্দু বাঁচাও’। আমাদের পশ্চিমবঙ্গের হিন্দুদের রক্ষা করতে হবে।
বিজেপি ভারতের যেসব রাজ্যে ক্ষমতায় আছে সেসব রাজ্যে মুসলিমদের অধিকার এরই মধ্যে কেড়ে নেওয়া হয়েছে। ধর্মীয় রীতি পালনে বাধা দেওয়া হচ্ছে। ভেঙে ফেলা হচ্ছে মসজিদ ও মুসলিমদের বাড়িঘর। মোদীর গুজরাট ও যোগী আদিত্য নাথের উত্তর প্রদেশে তো গরুর মাংস খেলে পিটিয়ে মারা হয়।
তবে আগে যেখানে ধর্মীয় কারণে পিটিয়ে মারার ঘটনা ঘটছে, সেখানে এখন বাংলাদেশি সন্দেহেও সম্প্রতি পিটিয়ে মারা হয়েছে বিভিন্ন রাজ্যে। সম্প্রতি অন্ধ্র প্রদেশের প্রকাশম জেলার কোমারোলু এলাকায় পশ্চিমবঙ্গের দক্ষিণ ২৪ পরগনার বাসিন্দা ৩২ বছর বয়সী মঞ্জুর আলম লস্করকে পিটিয়ে হত্যা করা হয়। অভিযোগ রয়েছে, এক দশক ধরে জরি কারিগর হিসেবে কর্মরত থাকা সত্ত্বেও তাকে বাংলাদেশি আখ্যা দিয়ে চুরির মিথ্যা অপবাদ দেওয়া হয় এবং একদল উগ্রবাদী তাকে নির্মমভাবে হত্যা করে। উড়িষ্যার সম্বলপুরে বাংলাদেশি সন্দেহে ১৯ বছর বয়সি জুয়েল রানা নামের পশ্চিমবঙ্গের এক নির্মাণ শ্রমিককে পিটিয়ে হত্যা করা হয়। তিনি কাজের সন্ধানে মুর্শিদাবাদ থেকে সেখানে গিয়েছিলেন। কেরালার পালাক্কাড় জেলায় বাংলাদেশি সন্দেহে রামনারায়ণ বাঘেল নামের ছত্তিশগড়ের ৩১ বছর বয়সী এক পরিযায়ী শ্রমিককে পিটিয়ে হত্যা করা হয়। পরে জানা যায় তিনি ভারতেরই আদিবাসী হিন্দু পরিবারের সন্তান ছিলেন, অথচ সন্দেহের বশবর্তী হয়ে তাকে গণপিটুনিতে হত্যা করা হয়। মূলত বিজেপির উসকানিতেই এসব ঘটনা ঘটে।
পশ্চিমবঙ্গে এখন বিজেপি সরকার ক্ষমতায়। বাংলাদেশবিরোধী শক্ত অবস্থান নেওয়া শুভেন্দু এখন মুখ্যমন্ত্রী। যিনি বারবার মুসলিমদেরকে পশ্চিমবঙ্গে থেকে তাড়িয়ে দেওয়ার কথা বলেছেন। বিজেপির জয়ের পরই পশ্চিমবঙ্গে বেশকিছু মাংসের দোকান বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে। প্রকাশ্যে পশু জবাইয়ে আরোপ করা হয়েছে বিধিনিষেধ। দলটির নেতা অর্জুনসিংহ রাস্তায় নামাজ পড়া নিয়ে প্রশ্ন তুলছেন। এরই মধ্যে মুসলিমদের নামে থাকা বেশকিছু স্থানের নামের পরিবর্তন করা হয়েছে রাজ্যটিতে।
এখন প্রশ্ন উঠছে নির্বাচনের আগে বাংলাদেশ ও বাংলাদেশিদের নিয়ে শুভেন্দু অধিকারী যেসব মন্তব্য করেছেন তাকি শুধুই রাজনৈতিক বা নির্বাচনে সুবিধা পাওয়ার জন্য। তবে বিজেপি শাসিত অন্যান্য রাজ্যের দিকে তাকালে মনে হয় তার এই কথার বাস্তব প্রতিফলন দেখা যাবে। যা আস্তে আস্তে পরিষ্কার হবে। তবে বিজেপি যে উগ্রপন্থি আদর্শ লালন করে তাতে পশ্চিমবঙ্গ আর বাংলাদেশিদের জন্য আগের মতো নিরাপদ ও স্বস্তিদায়ক নাও হতে পারে। যা শুভেন্দু অধিকারীর মন্তব্য থেকেই স্পষ্ট। বাংলাদেশ থেকে ভারতে সম্প্রতি ভ্রমণকারীর সংখ্যা উল্লেখযোগ্য হারে কমে গেছে। এর পেছনে যেমন ভারতের ভিসা বিধিনিষেধ রয়েছে, ঠিক তেমনি নিরাপত্তা নিয়েও বাংলাদেশিদের মধ্যে উদ্বেগ রয়েছে। যার অন্যতম কারণ হলো বিজেপি নেতাদের হুমকি ও বাংলাদেশবিরোধী মন্তব্য।
২০২৫ সালে ভারতে বিদেশি পর্যটকের সংখ্যা মহামারির আগের অবস্থায় ফিরতে পারেনি। ২০২৫ সালে ভারতে বিদেশি পর্যটক আগমন (এফটিএ) ছিল ৯০ লাখ ১৬ হাজার, যা গত তিন বছরের মধ্যে সর্বনিম্ন। এর প্রধান কারণ বাংলাদেশ থেকে যাওয়া পর্যটকের সংখ্যা প্রায় ৭৩ শতাংশ কমে যাওয়া।
২০২৫ সালে ভারত সফর করেছেন মাত্র ৪ লাখ ৭০ হাজার বাংলাদেশি পর্যটক। অথচ ২০২৪ সালে এই সংখ্যা ছিল ১৭ লাখ ৫০ হাজার এবং ২০২৩ সালে ছিল ২১ লাখ ২০ হাজার।
২০১৭ থেকে ২০২৩ সাল পর্যন্ত মোট বিদেশি পর্যটকের প্রায় ২০ থেকে ২৩ শতাংশই ছিল বাংলাদেশি। ফলে ভারত ভ্রমণকারী প্রতি চার থেকে পাঁচজন বিদেশি পর্যটকের একজনই ছিলেন বাংলাদেশ থেকে।
২০১৭ সালের পর থেকে ২০২০ পর্যন্ত প্রতি বছর ২০ লাখের বেশি বাংলাদেশি ভারতে গেছেন। ২০১৯ সালে সর্বোচ্চ ২৫ লাখ ৮০ হাজার বাংলাদেশি ভারত ভ্রমণ করেন। ২০২২ সালে এই সংখ্যা ছিল ১২ লাখ ৮০ হাজার।
বাংলাদেশি পর্যটকদের হিসাব অন্তর্ভুক্ত করলে দেখা যায়, ২০২৫ সালে ভারতে বিদেশি পর্যটক আগমন গত তিন বছরের মধ্যে সবচেয়ে কম ছিল।
এমএসএম