মহিষ-মাছ-শুঁয়োপোকা

ট্রাম্পের ‘চেহারার সঙ্গে মিল’ আছে যেসব বিচিত্র প্রাণীর

খান আরাফাত আলী
খান আরাফাত আলী খান আরাফাত আলী , সহ -সম্পাদক
প্রকাশিত: ০৪:৩৩ পিএম, ১৬ মে ২০২৬
ট্রাম্পের চেহারার সঙ্গে মিল থাকা কিছু প্রাণী/ ছবি কোলাজ: জাগোনিউজ

মাথার সামনের দিকে কিছুটা লালচে-সোনালি চুলের নিখুঁত ছাঁট। গায়ের রং সাধারণ মহিষের মতো কুচকুচে কালো নয়, বরং হালকা গোলাপি বা শ্বেতশুভ্র। দূর থেকে দেখলে মনে হতে পারে, কোনো সেলুন থেকে অত্যন্ত যত্নসহকারে ‘হেয়ার স্টাইল’ করে মাঠে নামানো হয়েছে প্রাণীটিকে।

আসন্ন কোরবানি ঈদকে সামনে রেখে নারায়ণগঞ্জের রূপগঞ্জের পাইকপাড়ায় অবস্থিত রাবেয়া অ্যাগ্রো ফার্মের প্রায় ৭০০ কেজি ওজনের একটি বিরল অ্যালবিনো মহিষ সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে রীতিমতো ঝড় তুলেছে। খামারের মালিক ও দর্শনার্থীরা আদর করে এর নাম রেখেছেন ‘ডোনাল্ড ট্রাম্প’। খামারের মালিক জিয়াউদ্দিন মৃধার ছোট ভাই মহিষটির চুল ও গায়ের রং দেখে প্রথম এই নাম দেন। এরপর থেকেই সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ফেসবুক ও ইউটিউবে মহিষটির ভিডিও ভাইরাল হতে শুরু করে। এমনকি ঢাকায় অবস্থিত মার্কিন দূতাবাসের কর্মকর্তারাও এই ‘ট্রাম্প মহিষ’ দেখার ব্যাপারে গভীর আগ্রহ প্রকাশ করেছেন বলে নিশ্চিত করেছে স্থানীয় প্রাণিসম্পদ অধিদপ্তর।

তবে শুধু বাংলাদেশের এই আলোচিত মহিষই নয়, ডোনাল্ড ট্রাম্পের আইকনিক হেয়ারস্টাইল, মুখের অভিব্যক্তি কিংবা গায়ের রঙের সঙ্গে মিল থাকা আরও বেশ কিছু বিচিত্র প্রাণীর সন্ধান মেলে এই পৃথিবীতে। প্রকৃতি যেন নিজের খেয়ালেই এসব প্রাণীর অবয়ব গড়ে তুলেছে, যা দেখলে যে কেউ চমকে উঠতে বাধ্য।

নারায়ণগঞ্জের খামার থেকে বিশ্বমঞ্চে ‘ট্রাম্প মহিষ’

trump
মহিষটির নাম ডোনাল্ড ট্রাম্প/ ছবি: জাগোনিউজ

রাবেয়া অ্যাগ্রো ফার্মের মালিক জিয়াউদ্দিন মৃধা জানান, প্রায় ১০ মাস আগে তিনি রাজশাহীর সিটি হাট থেকে এই ব্যতিক্রমী অ্যালবিনো বা শ্বেত প্রজাতির মহিষটি কিনেছিলেন। সাধারণ মহিষের স্বভাব উগ্র হলেও এই ‘ডোনাল্ড ট্রাম্প’ অত্যন্ত শান্ত ও ভদ্র প্রকৃতির। প্রায় ৭০০ কেজির এই মহিষকে একনজর দেখতে এবং তার সঙ্গে সেলফি তুলতে প্রতিদিন শত শত মানুষ খামারে ভিড় করছেন।

আরও পড়ুন>>
চুলের স্টাইলে ‘ডোনাল্ড ট্রাম্প’, গোলাপি রঙের মহিষ ঘিরে কৌতূহল
নারায়ণগঞ্জে কোরবানির জন্য প্রস্তুত ‘ট্রাম্প-নেতানিয়াহু’

জিয়াউদ্দিন মৃধা বলেন, মাথার সামনের দিকে চুল থাকায় আমার ছোট ভাইয়ের মনে হয়েছে, এটি দেখতে ডোনাল্ড ট্রাম্পের মতো। পরে সেখান থেকেই নাম রাখা হয় ‘ডোনাল্ড ট্রাম্প’।

খামার সূত্রে জানা গেছে, এই মহিষের দৈনিক খাবার তালিকায় রয়েছে ১২ ধরনের উপাদানের মিশ্রণে তৈরি বিশেষ ঘাস, ভুট্টা এবং ভুসি। এরই মধ্যে মহিষটি কেজি দরে (প্রতি কেজি ৫৫০ টাকা) বিক্রি হয়ে গেছে এবং ঈদের আগেই নতুন মালিকের কাছে এটি হস্তান্তর করা হবে।

পীত বসন আর সোনালি ঝুঁটির ‘গোল্ডেন ফেজেন্ট’

golden
গোল্ডেন ফেজেন্ট পাখি/ ছবি: পেক্সেলস

ডোনাল্ড ট্রাম্পের চুলের স্টাইলের সঙ্গে বিশ্বের সবচেয়ে নিখুঁত মিল খুঁজে পাওয়া যায় যে প্রাণীটির, সেটি হলো ‘গোল্ডেন ফেজেন্ট’ বা সোনালি রাজহাঁস প্রজাতির পাখি। মূলত চীনের পাহাড়ি বনাঞ্চলে এই পাখির আদি নিবাস। এই প্রজাতির পুরুষ পাখির মাথার ওপর থাকে চমৎকার উজ্জ্বল সোনালি-হলুদ রঙের পালকের একটি মুকুট বা ঝুঁটি। ২০১৬ সালে ডোনাল্ড ট্রাম্প যখন প্রথমবার যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত হন, ঠিক সেই সময়ে চীনের হাংঝৌ চিড়িয়াখানার ‘লিটল রেড’ নামের একটি গোল্ডেন ফেজেন্ট পাখির ছবি আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমে ভাইরাল হয়েছিল। দর্শনার্থীদের দাবি ছিল, পাখিটির মাথার সোনালি পালকের ছাঁট এবং ডোনাল্ড ট্রাম্পের বাতাসে ওড়া হেয়ারস্টাইলের মধ্যে কোনো তফাৎ নেই।

ট্রাম্পের হেয়ারস্টাইলের জীবন্ত রূপ: ফ্লানেল মথ

trump hair
ফ্লানেল মথ’-এর শুঁয়োপোকা/ ছবি: ক্যাটার্স নিউজ এজেন্সি

কীটপতঙ্গের জগতেও ট্রাম্পের একজন ‘জমজ’ রয়েছে। এটি হলো লাসোক্র্যাম্পিডি পরিবারের অন্তর্ভুক্ত ‘ফ্লানেল মথ’-এর শুঁয়োপোকা। পেরুর আমাজন রেইনফরেস্টে এই বিচিত্র পোকাটির দেখা মেলে। এই শুঁয়োপোকার পুরো শরীরজুড়ে থাকে অত্যন্ত নরম, ঘন এবং সোনালি-হলুদ রঙের লম্বা লোম। দূর থেকে দেখলে মনে হবে একটি আস্ত সোনালি পরচুলা বা ‘উইগ’ গাছের ডাল বেয়ে হেঁটে বেড়াচ্ছে। এর অবিকল ট্রাম্প-সদৃশ চুলের কারণে স্থানীয় মানুষ ও পর্যটকেরা একে মজা করে ‘ট্রাম্প ক্যাটারপিলার’ বা ট্রাম্প শুঁয়োপোকা নামে ডাকেন। তবে দেখতে অত্যন্ত আকর্ষণীয় ও নরম হলেও এই পোকাটি অত্যন্ত বিষাক্ত। এর শরীরে হাত দিলে তীব্র অ্যালার্জি ও যন্ত্রণার সৃষ্টি হয়।

সমুদ্রের তলদেশের ‘হলুদ কাউফিশ’

fishভাইরাল হর্নড কাউফিশ/ ছবি: সানডে টাইমস

কেবল স্থলের মহিষ বা আকাশের পাখিই নয়, সমুদ্রের নীল জলেও ট্রাম্পের চেহারার প্রতিচ্ছবি খুঁজে পেয়েছেন নেটিজেনরা। সম্প্রতি ‘হর্নড কাউফিশ’ বা হলুদ শিংযুক্ত কাউফিশ নামের একটি সামুদ্রিক মাছের ছবি ইন্টারনেটে ব্যাপক আলোড়ন সৃষ্টি করেছে। উজ্জ্বল হলুদ রঙের এই মাছটির চোখের অবস্থান, চওড়া কপালের গড়ন এবং বিশেষ করে এর মুখের সম্মুখভাগের অভিব্যক্তি ডোনাল্ড ট্রাম্পের বিভিন্ন রাজনৈতিক ভাষণের সময়কার মুখের অবয়বের সঙ্গে হুবহু মিলে যায়। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে এই মাছ এবং ট্রাম্পের ছবির কোলাজ তৈরি করে লাখ লাখ মানুষ শেয়ার করছেন, যা ইন্টারনেট ট্রোলের অন্যতম প্রধান উপাদানে পরিণত হয়েছে।

বৈজ্ঞানিক স্বীকৃতিতে ‘ডার্মোফিস ডোনাল্ডট্রাম্পি’

trumpউভচর প্রাণীটির মাথায় ট্রাম্পের চুল বসানো হয়েছে/ ছবি: এনভাইরোবিল্ড

ব্যঙ্গবিদ্রূপের বাইরে গিয়ে বৈজ্ঞানিক জগতেও ট্রাম্পের নাম যুক্ত হয়েছে একটি প্রাণীর সঙ্গে। তবে এটি কোনো সম্মানসূচক নামকরণ ছিল না, ছিল একটি পরিবেশবাদী বার্তা। পানামার বনাঞ্চলে আবিষ্কৃত চোখহীন, কৃমির মতো দেখতে একটি বিশেষ উভচর প্রাণীর অফিশিয়াল বৈজ্ঞানিক নামকরণ করা হয়েছে ‘ডার্মোফিস ডোনাল্ডট্রাম্পি’।

পরিবেশবাদী প্রতিষ্ঠান ‘এনভায়রোবিল্ড’ এই প্রাণীটির নামকরণের অধিকার চড়া মূল্যে নিলামে কিনে নেয়। ডোনাল্ড ট্রাম্পের জলবায়ু পরিবর্তন সংক্রান্ত নীতি এবং প্যারিস জলবায়ু চুক্তি থেকে যুক্তরাষ্ট্রের নাম প্রত্যাহার করে নেওয়ার সিদ্ধান্তের প্রতিবাদ জানাতে তারা এই নামটি বেছে নেয়। প্রাণীটি তার মাথার অংশ মাটির নিচে গুঁজে রাখে, যা বিজ্ঞানীদের মতে, জলবায়ু পরিবর্তন নিয়ে ট্রাম্পের চোখ বুজে থাকার নীতির প্রতীকী রূপ।

মিল দেখার কারণ কী?

বিশ্ব রাজনীতিতে ডোনাল্ড ট্রাম্প সবসময়ই একজন আলোচিত ও বিতর্কিত চরিত্র। তার কথা বলার ধরণ, শারীরিক ভাষা এবং চিরচেনা চুল নিয়ে বিশ্বজুড়ে তৈরি হয়েছে হাজারও মিম ও কৌতুক। কিন্তু বাংলাদেশের প্রত্যন্ত খামারের মহিষ থেকে শুরু করে আমাজনের শুঁয়োপোকা কিংবা প্রশান্ত মহাসাগরের কাউফিশের মধ্যে যেভাবে তার অবয়ব ফুটে উঠেছে, তা এক কথায় বিস্ময়কর।

বিশেষজ্ঞদের মতে, মানুষের চেনা কোনো অবয়ব বা পরিচিত চেহারা অন্য কোনো জড় বস্তু বা প্রাণীর মধ্যে খুঁজে পাওয়ার এই মনস্তাত্ত্বিক প্রবণতাকে বলা হয় ‘প্যারাইডোলিয়া’। মানুষ অবচেতনভাবেই ডোনাল্ড ট্রাম্পের মতো বিশ্বখ্যাত চরিত্রের বৈশিষ্ট্যগুলো এসব প্রাণীর মধ্যে খুঁজে পায় এবং আনন্দ লাভ করে।

সূত্র: রয়টার্স, দ্য গার্ডিয়ান, টাইম, নিউইয়র্ক পোস্ট, দ্য সানডে টাইমস
কেএএ/

পাঠকপ্রিয় অনলাইন নিউজ পোর্টাল জাগোনিউজ২৪.কমে লিখতে পারেন আপনিও। লেখার বিষয় ফিচার, ভ্রমণ, লাইফস্টাইল, ক্যারিয়ার, তথ্যপ্রযুক্তি, ধর্ম, কৃষি ও প্রকৃতি। আজই আপনার লেখাটি পাঠিয়ে দিন [email protected] ঠিকানায়।