‘ধর্ষণের আগে প্রার্থনা করাতো আইএস জঙ্গিরা’

আন্তর্জাতিক ডেস্ক
আন্তর্জাতিক ডেস্ক
প্রকাশিত: ১২:৩১ পিএম, ২৫ নভেম্বর ২০১৭ | আপডেট: ০১:৪৩ পিএম, ২৫ নভেম্বর ২০১৭
‘ধর্ষণের আগে প্রার্থনা করাতো আইএস জঙ্গিরা’

জঙ্গিগোষ্ঠী ইসলামিক স্টেটের (আইএস) সদস্যরা তাকে যৌনদাসী হিসেবে ব্যবহার করে। শত শত ইয়াজিদি নারী আইএস জঙ্গিদের হাতে বন্দি। তার মতোই যৌনদাসী হয়ে জীবন কাটাচ্ছেন তারা। সেই নরক থেকে পালিয়ে এসে ভয়ানক দিনগুলোর অভিজ্ঞতা জানাতে হাতে তুলে নিয়েছিলেন কলম। ‘দ্য লাস্ট গার্ল’ নামে লেখা একটি বইয়ে সেই জীবনের কাহিনি তুলে ধরেছেন নাদিয়া মুরাদ।

প্রায় তিন বছর হয়ে গেছে, উত্তর ইরাকে আইএস জঙ্গিদের কবল থেকে পালিয়ে এসেছেন মুরাদ। লন্ডনের এক হোটেলে বসে সেই দিনগুলোর কথা বলেন তিনি। নাদিয়া মুরাদ বলেন, ‘কাউকে না কাউকে তো এসব কথা তুলে ধরতেই হতো।’

বর্তমানে জাতিসংঘের শুভেচ্ছা দূত হিসেবে কাজ করছেন তিনি। আইএস জঙ্গিদের হাতে বন্দি ইয়াজিদি নারী এবং যারা জঙ্গিদের হাত থেকে পালিয়ে এসেছে তাদের নিয়ে কাজ করছেন নাদিয়া। সাক্ষাত্কারে তিনি বলেন, ২০১৪ সালের কথা। তখন আইএস জঙ্গিদের দখলে চলে গেছে পুরো উত্তর ইরাক। ইরাকের এ অংশে ইয়াজিদি সম্প্রদায়ের অনেক মানুষ থাকতেন। জঙ্গিরা এসে গ্রামের পর গ্রাম উজাড় করে দেয়। খুন, ধর্ষণ, লুঠপাটের পাশাপাশি ইয়াজিদি নারী, তরুণী, কিশোরীদের তুলে নিয়ে যেতে শুরু করে। চলে তাদের যৌনদাসী বানানোর কাজ।

nadia

নাদিয়া মুরাদ জানান, তার এ বই প্রকাশ করার একমাত্র লক্ষ্য, গোটা বিশ্ব জানুক, কীভাবে ইয়াজিদি নারীদের ওপর অত্যাচার চালায় আইএস। উত্তর ইরাকের ছোট গ্রাম কোচো’তে পরিবারের সঙ্গে থাকতেন নাদিয়া। তিনি তখন পড়াশোনা করছেন। গ্রামের প্রতিটি পরিবার ছিল খুবই গরিব। কিন্তু দারিদ্খর‌্নযও সেই গ্রামের খুশি ছিনিয়ে নিতে পারেনি। সবকিছুই ঠিকঠাক চলছিল।

২০১৪ সালে গ্রামে জঙ্গিরা হানা দেয়। শিশু-বৃদ্ধসহ সকলকে গ্রামের একটা স্কুলে বন্দি করে তারা। নারী-পুরুষ আলাদা করা হলো। তাদের রাখা হয় স্কুলের বাইরে। তারপর কিছুক্ষণের মধ্যেই গুলির আওয়াজ, আর সেই শব্দকে ছাপিয়ে মানুষের আর্তনাদ। সেদিন নাদিয়ার ছয় ভাইকে গুলি করে হত্যা করে জঙ্গিরা। এরপর তিনি ও গ্রামের অন্য নারীদের বাসে করে নিয়ে যাওয়া হয় মসুলে। বাসেই চলে শারীরিক নিপীড়ন। মসুলে নিয়ে গিয়ে অল্পবসয়ী মেয়েদের যৌনদাসী হিসেবে বিক্রি করা হয়।

নাদিয়ার দাবি, একজন তার পেটে সিগারেটের আগুনে ছ্যাঁকা দেয়। সেই ব্যক্তিই তাকে কিনে নেয়। অনেক ইয়াজিদি নারী সম্ভ্রম বাঁচাতে আত্মহত্যা করেন। মুরাদ বলেন, ‘নরক থেকে পালানোর চেষ্টা করেছিলাম। কিন্তু ধরা পড়ে গিয়েছিলাম। ধরা পড়তেই চলে গণধর্ষণ। ভেঙে পড়িনি। আমার মতোই হাজারো নারী জঙ্গিদের কব্জায় ছিল, এটাই আমাকে সাহস জুগিয়েছিল। নিজেকে সান্ত্বনা দিয়ে বলতে থাকলাম একদিন মুক্ত হবোই।’

nadia

‘সেই সুযোগও এসে গেল একদিন। এক জঙ্গি দরজা না আটকে বেরিয়ে যায়। আইএসের সেই জঙ্গি চলে যেতেই দৌড় শুরু করেন তিনি। আর পেছনে ফিরে তাকাননি। ধরা পড়লেই মৃত্যু নিশ্চিত জেনেও সাহসে ভর করে বেরিয়ে পড়েছিলাম।’

অন্ধকার রাস্তা ধরে দীর্ঘ পথ হাঁটতে ক্লান্ত হয়ে এক বাড়িতে গিয়ে আশ্রয় চান। সেই পরিবারই তাকে মসুল থেকে পালিয়ে যেতে সাহায্য করেন। পরে ২০১৫ সালে জার্মানির শরণার্থী ক্যাম্পে আশ্রয় নেন তিনি।

নাদিয়া মুরাদ বলেন, ‘মসুলে ২০ লাখ মানুষের বাস। দু’হাজার মেয়েকে আটকে রেখেছিল জঙ্গিরা। মসুলের বাসিন্দারা কেউ এগিয়ে আসেননি তাদের উদ্ধারে। যারা এগিয়ে এসেছিলেন তারা হাজার হাজার ডলার দাবি করছিলেন।’ বন্দি থাকাকালীন ইউরোপ, সৌদি আরব, তিউনিশিয়া থেকে একের পর এক জঙ্গি আসতো, আর নিয়মিত ধর্ষণ করত তাকে। ধর্ষণের আগে প্রার্থনাও করিয়ে নেয়া হতো।

তার মতো অনেক ইয়াজিদি নারী এখনও আইএস জঙ্গিদের কবলে। তিনি বলেন, ‘জানি কী দুর্বিষহ দিন কাটাচ্ছেন তারা। নিজের অভিজ্ঞতা থেকেই আজ সেই সব মেয়েদের কাহিনি তুলে ধরছি।’ মুরাদ মেকআপ আর্টিস্ট হতে চান। আবার নতুন করে জীবন শুরু করতে চান তিনি। আনন্দবাজার।

এসআইএস/জেআইএম