ভালোবাসা ত্যাগ করে কেউ পালায় না

আন্তর্জাতিক ডেস্ক
আন্তর্জাতিক ডেস্ক আন্তর্জাতিক ডেস্ক
প্রকাশিত: ০৫:২৫ পিএম, ২৩ আগস্ট ২০১৮

ব্রাজিলের একটি কারাগারে বন্দী রয়েছেন তাতিয়ানা কোরেইয়া দ্য লিমা (২৬) নামের এক নারী। প্রথম যেদিন কারাগারে নিজের সেলে ঢুকলেন, সেদিন আয়নায় নিজেকে দেখে চিনতে পারেননি তিনি। আয়নায় নিজেকে দেখে এত অদ্ভুত লাগছিল! দেখে চিনতেই পারছিলেন না। কারণ তিনি এর আগে যে কারাগারে ছিল সেখানকার চিত্র ছিল ভয়াবহ। প্রায়ই সেখানে দাঙ্গা আর খুনের মতো ঘটনা ঘটত। তার ওপর দিয়েও অনেক কিছু ঘটে গেছে।

কিন্তু এখন তিনি যেখানে আসেন সেটা ঠিক কারাগারের মতো লাগে না তার। বারো বছরের সাজা মাথায় নিয়ে জেল খাটছেন দুই সন্তানের এই জননী। লিমাকে মূল কারাগার থেকে সরিয়ে ইটুয়ানার যে কারাগারে নেয়া হয়েছে সেটি পরিচালনা করে অ্যাসোসিয়েশন ফর দ্যা প্রোটেকশন অ্যান্ড অ্যসিসটেন্স টু কনভিক্টস (এপ্যাক) নামের একটি সংস্থা।

ব্রাজিলে অন্য কারাগারের চেয়ে এই কারাগারটি একেবারেই ভিন্ন। এখানে নেই কোন কারারক্ষী। নেই কোন অস্ত্র। মূল কারাগারে যেখানে বন্দীদের জন্য রয়েছে নির্দিষ্ট পোশাক, সেখানে এই কারাগারটিতে লিমা তার নিজের কাপড়ই পরতে পারেন। তার সেলে রয়েছে আয়না, মেকআপ করার সরঞ্জাম।

প্রায়ই বাইরের জগতের সাথে বন্দীদের সখ্যতা গড়ে ওঠে। এভাবেই লিমা খুঁজে পেয়েছেন তার ভালবাসার পুরুষকে। সহ-বন্দী ভিভিয়েন কাম্পোসকে সাথে নিয়ে সেলের মধ্যে বসে তিনি বলছিলেন কিভাবে তার সাথে পরিচয় ঘটলো সেই পুরুষটির, যিনি নিজেও শহরের অন্য প্রান্তে আরেকটি এপ্যাক কারাগারে বন্দী।

jail-2

এপ্যাকের এই কারাগারের দেয়ালে লেখা রয়েছে: ভালোবাসা ত্যাগ করে কেউ পালায় না। বন্দীরা হয়তো এই কথাটাই দৃঢ়ভাবে সমর্থন করেন তাই এখানে কোন রক্ষী বা অস্ত্রের দরকার পড়ে না।

ব্রাজিলের কারা সঙ্কটের পটভূমিতে এপ্যাক পরিচালিত কারাগারগুলি অনেক বেশি নিরাপদ, সস্তা, এবং মানবিক বলে স্বীকৃতি পাচ্ছে। গত ২০ মার্চ ব্রাজিলের উত্তরাঞ্চলের রনডোনিয়া এলাকায় এপ্যাক পরিচালিত একটি কারাগারের উদ্বোধন করা হয়। সারা দেশে এধরনের ৪৯টি কারাগার রয়েছে।

এখানে যে ধরনের বন্দীদের আনা হয় তাদের বেশিরভাগই আসে মূল কারা ব্যবস্থা থেকে। এরা যে তাদের অপরাধের জন্য অনুশোচনা করছেন সেটা তাদেরকে প্রমাণ করতে হয়। নিয়মিত শ্রম দেয়া এবং শিক্ষা গ্রহণ করার ব্যাপারে এই কারাগারের যেসব নিয়মকানুন রয়েছে তা কঠোরভাবে পালন করা হয়।

কারাগারে রয়েছে কনজ্যুগাল সুইট। অর্থাৎ দু'জনের থাকার ব্যবস্থা। দেখা করতে আসা স্বামীদের সঙ্গে তাদের বন্দী স্ত্রীরা এখানে ঘনিষ্ঠ সময় কাটাতে পারেন। কারাগারের একপাশে নারীরা সাবানের বোতলে লেবেল লাগানোর কাজ করেন। বন্দীদের তৈরি এই তরল সাবান বাইরে বিক্রি করা হয়।

প্রথম এপ্যাক কারাগার স্থান করা হয় ১৯৭২ সালে। একদল ক্যাথলিক খ্রিস্টান এটি তৈরি করেছিলেন। এখন এভিএসআই ফাউন্ডেশন নামে ইতালির একটি এনজিও এবং ব্রাজিলের সাবেক কারাবাসীদের একটি প্রতিষ্ঠান এর অর্থায়ন করে থাকে।

তাতিয়ানা কোরেইয়া দ্য লিমা যখন এপ্যাক কারাগারে ঢোকেন তখন তার সুযোগ সুবিধা ছিল কম। জেলের মধ্যে স্বাধীনতা ভোগ করতে হলে তাকে সেই সুবিধা অর্জন করতে হবে। এটা সব নতুন কারাবন্দীর জন্য প্রযোজ্য।

কোন একজন বন্দী যখন ধাপে ধাপে অগ্রসর হয়, তখন এক পর্যায়ে তাকে স্বল্প সময়ের জন্য বাইরে যাওয়ার অনুমতি দেয়া হয়।

এভিএসআই ফাউন্ডেশনের সহ-সভাপতি জ্যাকোপো সাবাতিয়েলো বলেন, তাদের কারাগারের মূল নীতি হচ্ছে কঠোর পরিশ্রম এবং অন্যের প্রতি ভালবাসা। তিনি বলেন, আমরা সব বন্দীকে তাদের নাম ধরে ডাকি। নাম্বার দিয়ে কোন বন্দীর পরিচয় দেই না।

এই কারাগারের বন্দীদের ডাকা হয় রিকুপারেন্দোস নামে অর্থাৎ যাদের আরোগ্যলাভের প্রক্রিয়া চলছে। এক্যাপ বন্দীদের পুনর্বাসনের দিকে জোর দিয়ে থাকে। বন্দীদের সারাদিন ধরে কাজ এবং পড়াশুনা করতে হয়। কখনও কখনও স্থানীয় লোকজনের সঙ্গে কাজ করতে হয়।

কোন বন্দী পালানোর চেষ্টা করলে মূল কারা ব্যবস্থার হাতে তাকে ফিরিয়ে দেয়া হয়। সাবাতিয়েলো বলেন, এপ্যাকের কারাগারে মারামারির দু'একটা ঘটনা ঘটলেও খুন রাহাজানির মতো কোন বড় অপরাধের নজির নেই। তিনি বলেন, কারাগারে কোন রক্ষী না থাকায় উত্তেজনা কম থাকে। এখানে কিছু নারী রয়েছেন যারা যাবজ্জীবন সাজা খাটছেন। এদের মধ্যে কেউ কেউ ভায়াবহ অপরাধ ঘটিয়েছেন।

ব্রাজিলে কারাবন্দীর মোট সংখ্যা বিশ্বের চতুর্থ। কারাগারের ভেতরের শোচনীয় অবস্থা নিয়ে প্রায়ই তুমুল আলোচনা চলে। পাশাপাশি রয়েছে ধারণ ক্ষমতার বেশি বন্দী এবং কারাগারের ভেতরে গুণ্ডা দলের দৌরাত্ম্য, মাঝে মধ্যেই যা থেকে দাঙ্গা হাঙ্গামা তৈরি হয়।

মাদক চোরাচালানের দায়ে মূল কারাগারে চার মাস ছিলেন আগিমারা পাত্রিসিয়া সিলভিয়া কাম্পোস। তিনি বলেন, আমি এখনও আমার পুরনো বন্দী সংখ্যা ভুলে যাওয়ার চেষ্টা করছি। আমাদের গাদাগাদি করে থাকতে হতো। ছোট একটা ঘরে ২০ জন বন্দী। ঘুমাতে হতো নোংরা তোষকের ওপর। আর যে খাবার দেয়া হতো তা মুখে তোলার মত ছিল না।

তার সাথে দেখা করতে আসা আত্মীয়দের নগ্ন করে তল্লাশি করা হতো বলে জানান তিনি। কাম্পোস যে পরিবেশের কথা বলছেন তা ব্রাজিলের কারা ব্যবস্থার একটা বড় সঙ্কটের ইঙ্গিত দিচ্ছে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, ব্রাজিলে প্রায়ই নারীদের কারাগারে যেতে হয় তার পুরুষ সঙ্গীর অপরাধের জন্য। এরপর দাগী আসামীদের মধ্যে তাদের ছেড়ে দেয়া হয়। অনেকেই কারাগারের মধ্যেই অপরাধের তালিম নেন।

কাম্পোস বলেন, আমি যখন জেলে যাই, তখন এই ধরনের অপরাধ সম্পর্কে আমার কোন ধারনাই ছিল না। আমার পাশে যে মহিলা ঘুমাতো সে তার প্রতিবেশীর মাথা কেটে ফেলেছিল। আর সেই কাটা মাথা একটি সুটকেসে ভরে রেখেছিল।
তিনি এখন আট বছরের জেল খাটছেন।

বিচারক অ্যান্তনিও দ্য করাভালহো বলেন, মূল কারা ব্যবস্থায় কাজ এবং শিক্ষার মাধ্যমে দণ্ড কমানোর প্রথা থাকলেও এটা প্রয়োগ করা হয় সামান্যই। তিনি এপ্যাক কারা ব্যবস্থার একজন সমর্থক।

তার মতে, মূল কারা ব্যবস্থার বর্তমান হাল খুবই দুঃখজনক। ব্রাজিলের বিচার ব্যবস্থার মধ্যে থেকে বন্দীর মানবাধিকার রক্ষা করতে চাইলে এপ্যাক ব্যবস্থাই সবচেয়ে কার্যকারী।

টিটিএন/পিআর

আপনার মতামত লিখুন :