মানবতাবিরোধী অপরাধ

ট্রাইব্যুনালে বিচারাধীন মামলা ২১, রায়ের অপেক্ষায় ২

মুহাম্মদ ফজলুল হক
মুহাম্মদ ফজলুল হক মুহাম্মদ ফজলুল হক , জ্যেষ্ঠ প্রতিবেদক
প্রকাশিত: ০৯:৩২ এএম, ২২ মার্চ ২০২৬
আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল-ফাইল ছবি

২০২৪ সালের জুলাই-আগস্টের গণঅভ্যুত্থানকে ঘিরে দায়ের হওয়া মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলাগুলোতে বিচার প্রক্রিয়া এখন গুরুত্বপূর্ণ পর্যায়ে পৌঁছেছে। আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে বর্তমানে ২১টি মামলা বিচারাধীন, দুটি মামলার রায় ঘোষণার অপেক্ষায় রয়েছে।

এর মধ্যে বহুল আলোচিত রংপুরের বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী শহীদ আবু সাঈদ হত্যা মামলার রায় আগামী ৯ এপ্রিল ঘোষণা করা হবে। অপরটি রামপুরায় কার্নিশে ঝুলে থাকা অবস্থায় গুলি করে দুইজনকে হত্যার ঘটনায় করা মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলা।

ট্রাইব্যুনাল পুনর্গঠনের পর থেকে এখন পর্যন্ত মোট তিনটি মামলায় রায় ঘোষণা করা হয়েছে। তিনটি মামলার বিচারে ক্ষমতাচ্যুত সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাসহ ২৬ জনের সাজা হয়েছে এবং রাজসাক্ষী হয়ে ক্ষমা পেয়েছেন একজন।

jagonews24

যে দুটি মামলা রায়ের জন্য অপেক্ষমাণ রয়েছে, সে দুটির বিষয়ে প্রসিকিউটর গাজী এমএইচ তামিম বলেন, একটি রংপুরের শহীদ আবু সাঈদ হত্যা মামলা এবং অপরটি রাজধানীর রামপুরায় কার্নিশে ঝুলে থাকা যুবক আমিরকে গুলি করার মামলা। এ দুই মামলায় আসামি ৩৫ জন।

মামলার সর্বশেষ তথ্য নিশ্চিত করে প্রসিকিউটর ফারুক আহমেদ জাগো নিউজকে বলেন, আন্তর্জাতিক অপরাধ (ট্রাইব্যুনাল-১ এ ১৮টি ও ট্রাইব্যুনাল-২ এ ৬টি) ফরমাল চার্জ দাখিল হয়েছে ২৪টি মামলায়; চলমান বিচার ২১টি। এর মধ্যে ট্রাইব্যুনাল-১ এ ১৬টি ও ট্রাইব্যুনাল-২ এ ৫টি। আর রায় ঘোষণা হয়েছে ৩টি (ট্রাইব্যুনাল-১ এ ২টি ও ট্রাইব্যুনাল-২ এ ১টি)। সাজাপ্রাপ্ত ২৬ জন, ক্ষমাপ্রাপ্ত ১ জন।

চলমান মামলায় সর্বমোট আসামির সংখ্যা ৪৫৭ জন। উভয় আদালতে গ্রেফতার আসামির সংখ্যা ১৬১ জন; পলাতক ২৯৩ জন; জামিন পেয়েছেন একজন; মারা গেছেন একজন এবং খালাস পেয়েছেন একজন।

চলমান মামলায় গ্রেফতার আসামিদের মধ্যে আওয়ামী লীগ মন্ত্রী-এমপিসহ অন্যান্য সিভিলিয়ান ৭৪ জন, পুলিশ ৬৫ জন, সেনাবাহিনীর ২০ জন এবং আনসার সদস্য ১ জন।

বিবিধ মামলার সংখ্যা ৩৪টি (ট্রাইব্যুনাল-১ এ ৩২টি ও ট্রাইব্যুনাল-২ এ দুটি)। আসামির সংখ্যা ২০৭ জন; গ্রেফতার ৯৬ জন; পলাতক ১২৫ জন।

অপেক্ষায় শহীদ আবু সাঈদ হত্যা মামলার রায়

ট্রাইব্যুনালের অন্যতম প্রসিকিউটর মোহাম্মদ মিজানুল ইসলাম জাগো নিউজকে বলেন, ২০২৪ সালের গণঅভ্যুত্থানের মহানায়ক বেরোবির শিক্ষার্থী আবু সাঈদের হত্যার ঘটনায় সবচেয়ে আলোচিত মামলাটি তদন্ত ভিন্ন খাতে নেওয়ার চেষ্টা করা হয়েছিল। মামলাটি রায়ের জন্য অপেক্ষমাণ রয়েছে। আগামী ৯ এপ্রিল রায় ঘোষণার দিন ধার্য রয়েছে।

jagonews24

তিনি বলেন, মামলাটিতে ময়নাতদন্ত গোপন করা হয়েছিল এবং ঘটনাটি ভিন্ন খাতে নেওয়ার চেষ্টা করা হয়েছিল; তবে সব চেষ্টা ব্যর্থ হয়েছে। আশা করি আসামিরা উপযুক্ত সাজা পাবেন।

রামপুরায় কার্নিশে ঝুলে থাকা ব্যক্তিকে গুলির রায়

রামপুরার এ মামলার রায় ঘোষণার কথা থাকলেও তা পিছিয়ে দেওয়া হয়েছে। কারণ, ওই ঘটনায় একটি ডকুমেন্ট সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ভাইরাল হয়েছে। সেটি মামলার সঙ্গে সম্পৃক্ত হওয়ায় আদালতে ডকুমেন্টারি হিসেবে উপস্থাপনের আবেদন করা হয়। আদালত আবেদন গ্রহণ করে রায় স্থগিত করে আগামী এপ্রিলের প্রথম সপ্তাহে শুনানির দিন ধার্য করেছেন।

হাসানুল হক ইনু প্রসঙ্গ

হাসানুল হক ইনুর বিষয়ে মিজানুল ইসলাম জাগো নিউজকে বলেন, ১৪ দলীয় জোটের নেতা হিসেবে কোটা তথা গণঅভ্যুত্থানে আন্দোলনকারীদের দমানোর জন্য বিভিন্ন নেতাদের সঙ্গে বৈঠক এবং সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সঙ্গে ফোনে কথোপকথন ফরেনসিক করা হয়েছে, তাতে প্রমাণিত হয়েছে এসব হাসানুল হক ইনুর কথোপকথন। আশা করি অভিযোগ প্রমাণে সক্ষম হবো।

jagonews24

মিজানুল ইসলাম বলেন, আওয়ামী লীগের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক মাহাবুব উল আলম হানিফসহ চারজনের বিরুদ্ধে রাষ্ট্রপক্ষের ১৮ জন সাক্ষী গ্রহণ শেষ পর্যায়ে। এখন মামলার তদন্ত কর্মকর্তার সাক্ষী গ্রহণ অনুষ্ঠিত হলেই মামলায় যুক্তি-তর্ক উপস্থাপন করা হবে।

তিনি বলেন, ওবায়দুল কাদেরসহ সাতজনের বিরুদ্ধে ১০ জনের সাক্ষ্য গ্রহণ শেষ করা হয়েছে। জাসদ নেতা ও সাবেক মন্ত্রী রাশেদ খান মেনন এবং আওয়ামী লীগের সাবেক মন্ত্রী কামরুল ইসলামের বিরুদ্ধে সাক্ষী গ্রহণ চলছে। সাবেক আইন, বিচার ও সংসদ বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের মন্ত্রী আনিসুল হক এবং সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার উপদেষ্টা সালমান এফ রহমানের বিরুদ্ধে সাক্ষী গ্রহণ অনুষ্ঠিত হচ্ছে।

আরও কিছু গুরুত্বপূর্ণ মামলা

ক্ষমতাচ্যুত প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার তথ্য ও প্রযুক্তি বিষয়ক উপদেষ্টা ও তার ছেলে সজিব ওয়াজেদ জয় এবং আইসিটি প্রতিমন্ত্রী জুনায়েদ আহমেদ পলকের বিরুদ্ধে আনুষ্ঠানিক অভিযোগ গঠনের পর সাক্ষী গ্রহণ অনুষ্ঠিত হচ্ছে।

প্রসিকিউশনের অন্যতম সদস্য মিজানুল ইসলাম আরও বলেন, আওয়ামী লীগ সরকারের সময়ে টাস্কফোর্স ফর ইন্টারোগেশন সেলে (টিএফআই সেল) গুম করে নির্যাতনের ঘটনায় মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলায় ক্ষমতাচ্যুত প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ও ১০ সেনা কর্মকর্তাসহ ১৭ আসামির বিরুদ্ধে সাক্ষী গ্রহণ চলছে। একই সঙ্গে, আওয়ামী লীগের শাসনামলে জয়েন্ট ইন্টারোগেশন সেলে (জেআইসি সেল) গুমের ঘটনায় মানবতাবিরোধী অপরাধের অভিযোগে করা মামলায় সাক্ষ্য গ্রহণ চলছে।

jagonews24

এ ছাড়া আয়নাঘরের অন্যতম হোতা হিসেবে পরিচিত সাবেক মেজর জেনারেল জিয়াউল আহসানের বিরুদ্ধে আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে গুম, খুন এবং মানবতাবিরোধী অপরাধের শতাধিক সুনির্দিষ্ট অভিযোগে ট্রাইব্যুনালে বিচার চলছে। তার বিরুদ্ধেও সাক্ষী গ্রহণ চলমান রয়েছে।

অন্যদিকে বৈষম্যবিরোধী ছাত্র-জনতার আন্দোলন চলাকালে রাজধানীর রামপুরায় ২৮ জন নিহতের ঘটনায় মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলায় বর্ডার গার্ড বাংলাদেশের (বিজিবি) কর্মকর্তা লেফটেন্যান্ট কর্নেল রেদোয়ানুল ইসলামসহ চারজনের বিরুদ্ধে সাক্ষী গ্রহণ অব্যাহত রয়েছে। এসব মামলাসহ সর্বমোট ২৭ থেকে ২৮টি মামলা চলমান, এর মধ্যে ২৪টির ফরমাল চার্জ দাখিল করা হয়েছে। আবার কোনো কোনো মামলায় তদন্ত চলছে।

মিজানুল ইসলাম বলেন, বিভিন্ন মামলার সাক্ষীকে হুমকি-ধমকি দেওয়া হচ্ছে। আওয়ামী লীগের প্রভাবশালীদের ভয়ে অনেক সাক্ষী নিরাপত্তাহীনতায় ভুগছে। তারপরও তদন্ত সংস্থা ও প্রসিকিউশন টিম অক্লান্তভাবে কাজ করে চলছে।

চলতি বছর আরও আট থেকে দশটি মামলার রায় ঘোষণা করা হতে পারে বলে আশাবাদী প্রসিকিউশন।

এফএইচ/এসএইচএস

পাঠকপ্রিয় অনলাইন নিউজ পোর্টাল জাগোনিউজ২৪.কমে লিখতে পারেন আপনিও। লেখার বিষয় ফিচার, ভ্রমণ, লাইফস্টাইল, ক্যারিয়ার, তথ্যপ্রযুক্তি, ধর্ম, কৃষি ও প্রকৃতি। আজই আপনার লেখাটি পাঠিয়ে দিন [email protected] ঠিকানায়।