ভোরে আটক বিকেলে কারাগারে, শিরীন শারমিনকে ঘিরে দিনভর যা হলো
জাতীয় সংসদের সাবেক স্পিকার শিরীন শারমিন চৌধুরীকে কেন্দ্র করে সকাল থেকে আদালতপাড়া ছিল সরগরম। মঙ্গলবার (৭ এপ্রিল) রাত সাড়ে ৪টার দিকে রাজধানীর ধানমন্ডির একটি বাসা থেকে তাকে আটক করে ঢাকা মহানগর গোয়েন্দা পুলিশ (ডিবি)। পরে মিন্টো রোডের ডিবি কার্যালয় থেকে নেওয়া হয় আদালতে। সবশেষ আদালতের নির্দেশে পাঠানো হয় কারাগারে।
বৈষম্যবিরোধী আন্দোলনের সময় হত্যাচেষ্টা ও ভাঙচুরের ঘটনায় রাজধানীর লালবাগ থানায় করা একটি মামলায় এদিন সাবেক স্পিকার শিরীন শারমিন চৌধুরীর রিমান্ড ও জামিন নামঞ্জুর করে তাকে কারাগারে পাঠান আদালত। এর আগে আটকের পর ওই মামলায় তাকে গ্রেফতার দেখায় পুলিশ।
সাবেক এ নারী স্পিকারকে দুপুরে কঠোর নিরাপত্তার মধ্য দিয়ে ঢাকার চিফ মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট জুয়েল রানার আদালতে হাজির করা হয়। আদালতে রাষ্ট্রপক্ষ তার বিরুদ্ধে গুরুতর অভিযোগ তুলে ধরে দুদিনের রিমান্ড আবেদন করে। অন্যদিকে, আসামিপক্ষ রিমান্ড বাতিল ও জামিনের আবেদন করে এবং দাবি করে- মামলায় অভিযোগ বিষয়ে কোনো সুনির্দিষ্ট কোনো প্রমাণ নেই।
উভয়পক্ষের শুনানি শেষে আদালত দুটি আবেদনই নামঞ্জুর করে আসামিকে কারাগারে পাঠানোর আদেশ দেন।

আদালত প্রাঙ্গণে এসময় উত্তেজনাপূর্ণ পরিবেশ সৃষ্টি হয়। একদিকে আসামিপক্ষের সমর্থকরা ‘জয় বাংলা’ স্লোগান দেন, অন্যদিকে বিরোধী আইনজীবীদের মধ্যে হট্টগোলের ঘটনাও ঘটে, যা পরে নিয়ন্ত্রণে আসে। পুরো সময়জুড়ে শিরীন শারমিন চৌধুরীকে নীরব ও বিষণ্ন দেখা যায়।
আরও পড়ুন
সাবেক স্পিকার শিরীন শারমিন চৌধুরী আটক
শিরীন শারমিন চৌধুরী এতদিন কোথায় ছিলেন?
আদালত সূত্রে জানা যায়, রাজধানীর লালবাগে ২০২৪ সালের বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের সময় হত্যাচেষ্টা ও ভাঙচুরের মামলায় গ্রেফতার হয়ে আদালতে হাজির করা হয় জাতীয় সংসদের সাবেক স্পিকার শিরীন শারমিন চৌধুরী। পরে আদালত জামিন ও রিমান্ড উভয় আবেদনই নামঞ্জুর করে তাকে কারাগারে পাঠানোর আদেশ দেন।
শিরীন শারমিন চৌধুরীকে মঙ্গলবার ভোর সাড়ে ৪টায় ধানমন্ডির ৮/এ বাসা থেকে আটক করা হয়। এরপর তাকে লালবাগ থানার মামলায় গ্রেফতার দেখিয়ে আদালতে তোলা হয়। আদালতে নিয়ে আসা হয় দুপুর ১টা ৫৫ মিনিটে। এসময় কড়া নিরাপত্তা ব্যবস্থায় অতিরিক্ত পুলিশ মোতায়েন করা হয়।
এ মামলায় শিরীন শারমিনের দুদিনের রিমান্ড চেয়ে আবেদন করেন মামলার তদন্তকারী কর্মকর্তা ঢাকা মহানগর গোয়েন্দা পুলিশের (ডিবি) পরিদর্শক মোহসীন উদ্দীন। অন্যদিকে, আসামিপক্ষের আইনজীবী মোকছেদুল হাসান মন্ডল রিমান্ড বাতিল চেয়ে জামিন আবেদন করেন।
রিমান্ড আবেদনে ডিবির পক্ষ থেকে বলা হয়, মামলার পলাতক আসামিদের অবস্থান জানা, গ্রেফতার ও প্রয়োজনীয় সাক্ষ্যপ্রমাণ সংগ্রহের জন্য আসামিকে দুদিনের রিমান্ডে নেওয়া প্রয়োজন।

রিমান্ড আবেদনে আরও জানানো হয়, ২০২৪ সালের ১৮ জুলাই কোটা সংস্কার আন্দোলনের অংশ হিসেবে লালবাগের আজিমপুর সরকারি কলোনি এলাকায় নিরস্ত্র ছাত্র-জনতা শান্তিপূর্ণ মিছিল করছিল। এসময় আন্দোলন দমনের উদ্দেশে পুলিশ ও অজ্ঞাতনামা আওয়ামী লীগের সন্ত্রাসীরা আন্দোলনকারীদের ওপর দেশীয় ও বিদেশি আগ্নেয়াস্ত্র ব্যবহার করে গুলিবর্ষণ করেন। এ ঘটনায় আন্দোলনকারী আশরাফুল ফাহিমের বাম চোখ, মাথা ও শরীরের বিভিন্ন জায়গায় গুলি লাগে। এ ঘটনায় ২০২৫ সালের ১৭ জুলাই লালবাগ থানায় মামলা করেন ফাহিম।
মামলায় বাদীর অভিযোগ, গুলিবিদ্ধ হওয়ার পর স্থানীয় লোকজন তাকে উদ্ধার করে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের জরুরি বিভাগে ভর্তি করেন। সেখানে প্রাথমিক চিকিৎসার পর উন্নত চিকিৎসার জন্য জাতীয় হৃদরোগ ইনস্টিটিউটে অস্ত্রোপচার করা হয় এবং পরে জাতীয় চক্ষুবিজ্ঞান ইনস্টিটিউটে পাঠানো হয়। চিকিৎসকদের মতে, এ ঘটনায় তার বাঁ চোখের দৃষ্টিশক্তি নষ্ট হয়ে যায়।
মামলার এজাহারে আরও বলা হয়, ১৮ জুলাই ‘কমপ্লিট শাটডাউন’ কর্মসূচি চলাকালে প্রায় ৩১ জন আন্দোলনকারী নিহত হন। মামলার প্রধান আসামি শেখ হাসিনা এবং তৃতীয় আসামি শিরীন শারমিন চৌধুরীসহ অন্য আসামিরা রাষ্ট্রীয় গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত গ্রহণে জড়িত ছিলেন। তাদের পরিকল্পনা ও প্রত্যক্ষ-পরোক্ষ নির্দেশে এ ঘটনা ঘটেছে বলে অভিযোগ করা হয়।
বাদী আরও অভিযোগ করেন, আওয়ামী লীগ সভাপতি ও তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার নির্দেশে বিপ্লব বড়ুয়া, ওবায়দুল কাদের ও আসাদুজ্জামান খান কামালের পরিকল্পনা এবং নির্দেশে পুলিশ সদস্য ও অজ্ঞাতনামা ব্যক্তিরা আন্দোলনে অংশ নেওয়া ছাত্র-জনতার ওপর আগ্নেয়াস্ত্র ব্যবহার করে গুলিবর্ষণ করেন। এ মামলায় ৩ নম্বর আসামি হিসেবে শিরীন শারমীন চৌধুরীর নাম উল্লেখ করা হয়েছে।
আরও পড়ুন
শিরীন শারমিনের রিমান্ড ও জামিন নামঞ্জুর, কারাগারে পাঠানোর নির্দেশ
শিরীন শারমিনকে কারাগারে নেওয়ার সময় আদালতে ‘জয় বাংলা’ স্লোগান
এদিন শুনানি শেষে আসামিপক্ষের আইনজীবী মোকছেদুল হাসান মন্ডল জাগো নিউজকে বলেন, ‘আমরা আদালতে বলেছি, একজন নারী স্পিকার প্রটোকল নিয়ে গুলি চালাতে পারেন না। মামলায় শুধু নাম উল্লেখ আছে, কোনো প্রমাণ নেই। তার বিরুদ্ধে পূর্বেও কোনো অভিযোগ ছিল না। আইনজীবীরা এই বিষয়ে জোর দেন এবং জামিন চান।’

শুনানির সময় প্রথমে আদালতে অভিযোগ পড়ে শোনান মামলার তদন্তকারী পুলিশ কর্মকর্তা। রাষ্ট্রপক্ষের পাবলিক প্রসিকিউটর ওমর ফারুক আদালতকে বলেন, আসামি ফ্যাসিস্ট সরকারের সঙ্গে যুক্ত থেকে অপরাধ করেছেন। এরপর আদালত উভয়পক্ষের আবেদন নামঞ্জুর করে আসামিকে কারাগারে পাঠানোর আদেশ দেন।
আদালত থেকে বের হওয়ার সময় উপস্থিত সমর্থক-জনতা ‘জয় বাংলা’ স্লোগান দিয়ে শিরীন শারমিন চৌধুরীকে সমর্থন জানান। এসময় আদালত চত্বরে আইনজীবীদের মধ্যে হট্টগোল দেখা দেয়। পরে জ্যেষ্ঠ আইনজীবীদের হস্তক্ষেপে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আসে।
এর আগে সাবেক এই স্পিকারকে আদালতে তোলা ও শুনানি চলাকালে আদালতে সাধারণের প্রবেশেও কিছুটা কড়াকড়ি দেখা যায়।
এদিন শিরীন শারমিন চৌধুরীকে আদালতে তোলার পুরো সময়েই তিনি বিষণ্ন ছিলেন। তাকে কোনো মন্তব্য করতে দেখা যায়নি। এরপর এজলাস থেকে তাকে মাইক্রোবাসে তুলে পুলিশি নিরাপত্তায় দ্রুত কারাগারে নিয়ে যাওয়া হয়।
এমডিএএ/এমকেআর