বিচার বিভাগ অন্যায়ের প্রতিকারের শেষ ভরসাস্থল: হাইকোর্ট
বিচার বিভাগকে অভিযোগ ও অন্যায়ের প্রতিকারের শেষ ভরসাস্থল হিসেবে উল্লেখ করেছেন দেশের উচ্চ আদালত হাইকোর্ট। আদালত বলেছে, বিচার বিভাগ যেন কোনো ভয় বা পক্ষপাত ছাড়া কাজ করতে পারে এবং স্বাধীনভাবে প্রতিক্রিয়া জানাতে পারে। এ ধরনের স্বাধীনতা কেবল তখনই সম্ভব, যখন বিচার বিভাগকে প্রকৃত অর্থে নির্বাহী বিভাগ থেকে পৃথক করা হয়।
দেশের বিচার বিভাগের জন্য পৃথক সচিবালয় গঠনের চূড়ান্ত নির্দেশনা দিয়ে হাইকোর্টের দেওয়া পূর্ণাঙ্গ রায়ে আদালত এমন অভিমত প্রকাশ করেছেন। হাইকোর্টের সংশ্লিষ্ট বেঞ্চের দুই বিচারপতির সইয়ের পর মঙ্গলবার (৭ এপ্রিল) সুপ্রিম কোর্টের ওয়েবসাইটে ১৮৫ পৃষ্ঠার পূর্ণাঙ্গ রায়টি প্রকাশ করা হয়।
রায়ে সরকারকে নির্দেশ দেওয়া হয়েছে, সুপ্রিম কোর্ট কর্তৃপক্ষের প্রস্তাব অনুযায়ী বাংলাদেশ সুপ্রিম কোর্টের জন্য একটি স্বাধীন ও পৃথক সচিবালয় রায়ের কপি হতে পাওয়ার তিন মাসের মধ্যে প্রতিষ্ঠা করতে হবে।
আদালত মনে করে, প্রকৃত বিচার বিভাগীয় স্বাধীনতা নিশ্চিত করতে দ্বৈত শাসনব্যবস্থার অবসান জরুরি; অর্থাৎ সুপ্রিম কোর্ট ও আইন মন্ত্রণালয়ের যৌথ কর্তৃত্ব বিলুপ্ত করে বাংলাদেশের সুপ্রিম কোর্টের অধীনে একটি পৃথক সচিবালয় গঠন করতে হবে। বিচার বিভাগের স্বায়ত্তশাসন ও অখণ্ডতা নিশ্চিত করতে একটি স্বতন্ত্র সচিবালয় প্রতিষ্ঠা অপরিহার্য।
রায়ে বলা হয়, সুপ্রিম কোর্ট প্রাঙ্গণের ভেতরে একটি স্বতন্ত্র সুপ্রিম কোর্ট সচিবালয় প্রতিষ্ঠা করার নির্দেশ জারি করা আইনসম্মত ও যুক্তিযুক্ত হবে। আদালত দৃঢ়ভাবে বিশ্বাস করে, বিচার বিভাগের স্বাধীনতা শুধু কাগজে-কলমে সীমাবদ্ধ থাকলে চলবে না; এটি হতে হবে চেতনায়, কার্যক্রমে এবং দেশের নাগরিকদের দৃষ্টিতেও বাস্তব।
আদালত বিশ্বাস করে, প্রস্তাবিত এই সচিবালয় বিচার বিভাগীয় নীতিনির্ধারণে স্বচ্ছতা বৃদ্ধি করবে, যথাযথ বাজেট বরাদ্দ ও অবকাঠামো উন্নয়ন নিশ্চিত করবে এবং বিচারকদের বদলি ও পদোন্নতির ক্ষেত্রে স্পষ্টতা আনবে। বিচার বিভাগের প্রাতিষ্ঠানিক স্বাধীনতা নিশ্চিত করার জন্য একটি স্বতন্ত্র বিচার বিভাগীয় সচিবালয় প্রতিষ্ঠা করা অপরিহার্য; এর মাধ্যমেই একটি স্বাধীন বিচার বিভাগ কার্যকরভাবে পরিচালিত হতে পারে।
রায়ে আদালতের পর্যবেক্ষণ, একটি সাংবিধানিক রাষ্ট্রে বিচার বিভাগ ক্ষমতার অপব্যবহারের বিরুদ্ধে একটি গুরুত্বপূর্ণ সুরক্ষা হিসেবে কাজ করে। ন্যায়বিচারের সর্বশেষ আশ্রয়স্থল হিসেবে আদালতকে সম্পূর্ণ নিরপেক্ষতা ও স্বায়ত্তশাসনের সঙ্গে কাজ করতে হবে।
এর আগে ২০২৫ সালের ২ সেপ্টেম্বর হাইকোর্টের বিচারপতি আহমেদ সোহেল এবং বিচারপতি দেবাশীষ রায় চৌধুরীর সমন্বয়ে গঠিত বেঞ্চ এ রায় দেন। আদালতে রিটের পক্ষে ছিলেন আইনজীবী মোহাম্মদ শিশির মনির। অ্যামিকাস কিউরি ছিলেন সিনিয়র আইনজীবী শরীফ ভূঁইয়া। আর রাষ্ট্রপক্ষে ছিলেন অ্যাটর্নি জেনারেল মো. আসাদুজ্জামান।
রায়ে অধস্তন আদালতের বিচারকদের নিয়ন্ত্রণ ও শৃঙ্খলা বিধান সুপ্রিম কোর্টের কাছে ফিরিয়ে দেওয়া হয়। একই সঙ্গে অধস্তন আদালতের জন্য ২০১৭ সালে করা শৃঙ্খলা বিধি বাতিল করা হয়। এরপর ওই বছরের ৩০ নভেম্বর আইন, বিচার ও সংসদ বিষয়ক মন্ত্রণালয় থেকে বিচার বিভাগের পূর্ণ স্বাধীনতা নিশ্চিত করার লক্ষ্যে সুপ্রিম কোর্ট সচিবালয় অধ্যাদেশ-২০২৫ জারি করা হয়। অধ্যাদেশে বলা হয়, এর মাধ্যমে নির্বাহী বিভাগ থেকে পুরোপুরি পৃথক হলো বিচার বিভাগ।
২০২৪ সালের ২৫ আগস্ট সংবিধানের ১১৬ অনুচ্ছেদ এবং ২০১৭ সালের জুডিশিয়াল সার্ভিস (শৃঙ্খলা) বিধিমালার বৈধতা চ্যালেঞ্জ করে, বিচার বিভাগীয় পৃথক সচিবালয় প্রতিষ্ঠার নির্দেশনা চেয়ে সুপ্রিম কোর্টে সাতজন আইনজীবী রিট দায়ের করেন। পরে একই বছরের ২৭ অক্টোবর হাইকোর্ট রুল জারি করে।
সংবিধানের ১১৬ অনুচ্ছেদ অনুযায়ী, বিচারকর্মে নিয়োজিত ব্যক্তিদের এবং বিচার বিভাগীয় দায়িত্ব পালনরত ম্যাজিস্ট্রেটদের নিয়ন্ত্রণ (কর্মস্থল নির্ধারণ, পদোন্নতি ও ছুটি মঞ্জুরিসহ) ও শৃঙ্খলা বিধানের দায়িত্ব রাষ্ট্রপতির ওপর ন্যস্ত। রাষ্ট্রপতি সুপ্রিম কোর্টের সঙ্গে পরামর্শক্রমে তা প্রয়োগ করেন।
রিটকারীদের আইনজীবীর মতে, ১১৬ অনুচ্ছেদ অনুযায়ী অধস্তন আদালতের দায়িত্ব পালনরত ম্যাজিস্ট্রেটদের নিয়ন্ত্রণ ও শৃঙ্খলা বিধানের দায়িত্ব রাষ্ট্রপতির ওপর ন্যস্ত রয়েছে।
একই অনুচ্ছেদে বলা হয়েছে, রাষ্ট্রপতি এ দায়িত্ব পালনের ক্ষেত্রে সুপ্রিম কোর্টের সঙ্গে পরামর্শ করবেন। মূলত রাষ্ট্রপতির ওপর ন্যস্ত এ দায়িত্ব পালনের ক্ষেত্রে রাষ্ট্রের নির্বাহী বিভাগের সরাসরি হস্তক্ষেপ দেখা যায়, যা বিচার বিভাগের স্বাধীনতাকে ক্ষতিগ্রস্ত করে।
১৯৭২ সালের সংবিধানে অধস্তন আদালতের দায়িত্ব পালনরত ম্যাজিস্ট্রেটদের নিয়ন্ত্রণ ও শৃঙ্খলা বিধানের দায়িত্ব সুপ্রিম কোর্টের ওপর ন্যস্ত ছিল।
১৯৭৪ সালের সংবিধানের চতুর্থ সংশোধনের মাধ্যমে ম্যাজিস্ট্রেটদের নিয়ন্ত্রণ ও শৃঙ্খলা বিধানের দায়িত্ব রাষ্ট্রপতির ওপর ন্যস্ত করা হয়। পরে সংবিধানের পঞ্চম সংশোধনের মাধ্যমে এবং ‘সুপ্রিম কোর্টের সঙ্গে পরামর্শক্রমে রাষ্ট্রপতি কর্তৃক তা প্রয়োগ করা হবে’ শব্দগুলো সংযুক্ত করা হয়।
এরপর সুপ্রিম কোর্টের আপিল বিভাগ পঞ্চম সংশোধনী আইন অসাংবিধানিক ঘোষণা করলে, পঞ্চদশ সংশোধনী আইন, ২০১১-এর মাধ্যমে ১১৬ অনুচ্ছেদের বর্তমান বিধান প্রতিস্থাপন করা হয়। বর্তমানে সংবিধানের ১১৬ অনুচ্ছেদে এ বিধানই বিদ্যমান।
এফএইচ/ইএ