শ্যামল কান্তিকে কান ধরে উঠবস : সত্যতা পেয়েছে বিচারিক তদন্ত কমিটি


প্রকাশিত: ০৬:৩১ পিএম, ১৯ জানুয়ারি ২০১৭

নারায়ণগঞ্জের পিয়ার সাত্তার লতিফ উচ্চ বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক শ্যামল কান্তি ভক্তকে এমপি সেলিম ওসমানের নির্দেশে কান ধরে উঠবসের ঘটনার সত্যতা পেয়েছে বিচারিক তদন্ত কমিটি। বৃহস্পতিবার ঢাকার চিফ মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট (সিএমএম) শেখ হাফিজুর রহমান হাইকোর্টে এ তদন্ত প্রতিবেদন দাখিল করেছেন।

প্রতিবেদনে বলা হয়, ভিডিও ফুটেজটি পর্যালোচনা করে এটাই প্রতীয়মান হয় শিক্ষক কোনো অবস্থায় স্বেচ্ছায় কান ধরে উঠবস করেননি বরং এমপি সেলিম ওসমানের নির্দেশেই তিনি তা করতে বাধ্য হয়েছিলেন। ফলে এমপি কোনোভাবেই দায় এড়াতে পারেন না।

যদিও এর আগে সেলিম ওসমানকে নিয়ে পুলিশের দেয়া তদন্ত প্রতিবেদেন বলা হয়েছিল তিনি পরিস্থিতির শিকার।

শ্যামল কান্তি ভক্তকে ‘কান ধরে উঠ-বস’ করানোর ঘটনায় পুলিশের তদন্ত প্রতিবেদন নাকচ করে দিয়ে ২০১৬ সালের ১০ আগস্ট ওই ঘটনার বিচার বিভাগীয় তদন্তের নির্দেশ দেন হাইকোর্ট। ওই নির্দেশের পরই ঢাকার সিএমএম তদন্ত কাজ সম্পাদনে মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট মো. গোলাম নবী ও মুহাম্মদ মাজহারুল ইসলামকে সহযোগী কর্মকর্তা হিসেবে নিয়োগ করেন।

বৃহস্পতিবার দাখিল করা ম্যাজিস্ট্রের প্রতিবেদনে একই সঙ্গে বলা হয়, ২০১৬ সালের  ৮ মে বিদ্যালয়ের ১০ম শ্রেণির ছাত্র রিফাত হাসানকে শিক্ষক শ্যামল কান্তি উপর্যুপুরি মারধর করেছেন। অন্যদিকে ২০১৬ সালের ১৩ মে স্কুল কমিটির সভা চলাকালে জনৈক শামসুল হকের পুত্র অপুর নেতৃত্বে ১০/১২ জন লোক সভাকক্ষে প্রবেশ করে শ্যামল কান্তিকে মারধরের সত্যতা পাওয়া গেছে। ওই শিক্ষক ইসলাম ধর্ম ও আল্লাহকে নিয়ে কটূক্তি করেছেন এমন দাবির সত্যতা পাওয়া যায়নি। শ্যামল কান্তিকে গাল ও কান জড়িয়ে এমপি কর্তৃক চারটি থাপ্পর মারার দাবির সত্যতা পাওয়া যায়নি। তবে অপু ছাড়া অন্যদের নাম কোনো সাক্ষী নিজের সাক্ষ্যে উল্লেখ করেননি।

সংশ্লিষ্ট আদালতের ডেপুটি অ্যাটর্নি জেনারেল মোতাহার হোসেন সাজু জানান, সাক্ষ্যগ্রহণ, অডিও রেকর্ড ও ভিডিও ক্লিপিং পর্যালোচনা করে পূর্ণাঙ্গ ৬৫ পৃষ্ঠার প্রতিবেদনটি হলফনামা করে আদালতে দেয়া হয়েছে। তিনি বলেন, আগামী রোববার (২২ জানুয়ারি) এ বিষয়ে বিস্তারিত শুনানি হবে। ওই দিন যথারীতি কার্যতালিকায় আসবে।

এ ঘটনায় স্থানীয় সংসদ সদস্য সেলিম ওসমানের সম্পৃক্ততা রয়েছে কি-না সাংবাদিকদের এমন প্রশ্নের জবাবে ডেপুটি অ্যাটর্নি জেনারেল বলেন, ‘সংশ্লিষ্ট এমপি সেলিম ওসমান দোষী প্রমাণিত হয়েছেন কি-না, এ বিষয়ে মন্তব্য করা যাচ্ছে না। কেননা বিষয়টি বিচারাধীন।

তদন্ত প্রতিবেদনে সাক্ষ্য-প্রমাণের ভিত্তিতে ৬ দফা সিদ্ধান্ত তুলে ধরা হয়েছে।

ধর্ম নিয়ে কটূক্তির অভিযোগে ২০১৬ সালের ১৩ মে নারায়ণগঞ্জের বন্দর উপজেলার ওই স্কুলটির প্রধান শিক্ষক শ্যামল কান্তিকে লাঞ্ছনার ঘটনা ঘটে। স্থানীয় সংসদ সদস্য সেলিম ওসমান সেদিন শ্যামল কান্তিকে কান ধরে উঠবস করার নির্দেশ দিয়েছিলেন। পরে এই ঘটনা প্রকাশ পেলে নিন্দার ঝড় ওঠে। এ ঘটনায় বিভিন্ন জাতীয় দৈনিকে প্রকাশিত প্রতিবেদন সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী এম কে রহমান ও মহসিন রশিদ হাইকোর্টের নজরে নেন।

এর পরিপ্রেক্ষিতে হাইকোর্ট স্বতঃপ্রণোদিত হয়ে রুল জারি করেন। একইসঙ্গে এ ঘটনায় সংসদ সদস্য সেলিম ওসমানসহ জড়িতদের বিরুদ্ধে কী আইনগত পদক্ষেপ নেয়া হচ্ছে তা প্রতিবেদন আকারে আদালতে দাখিল করতে নারায়ণগঞ্জের ডিসি, এসপি ও ওসিকে নির্দেশ দেন।

আদালতের নির্দেশনার আলোকে ২০১৬ সালের ২৯ মে শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের নির্দেশে গঠিত তদন্ত কমিটির প্রতিবেদন, নারায়ণগঞ্জের জেলা প্রশাসক, পুলিশ সুপার ও বন্দর থানার ওসির প্রতিবেদন আদালতে দাখিল করে রাষ্ট্রপক্ষ। ওইসব প্রতিবেদন ‘দায়সারা’ বলে অসন্তোষ জানান হাইকোর্ট। এরপর গত বছরের ৮ জুন জেলা প্রশাসককে নতুন করে প্রতিবেদন দাখিলের নির্দেশ দেন হাইকোর্ট।

পাশাপাশি ওই ঘটনায় বন্দর থানায় করা একটি জিডির তদন্তে অগ্রগতি আছে জানিয়ে নারায়ণগঞ্জের পুলিশ সুপার ও বন্দর থানার ওসি ৬০ দিন সময় চেয়ে আবেদন করেন। আদালত তখন জিডির তদন্তে আসা ফল হলফনামা আকারে ৪ আগস্ট আদালতে দাখিল করতে নারায়ণগঞ্জের পুলিশ সুপার ও বন্দর থানার ওসিকে নির্দেশ দেন।

২০১৬ সালের ৭ আগস্ট পুলিশের প্রতিবেদন হাইকোর্টে উপস্থাপন করেন ডেপুটি অ্যাটর্নি জেনারেল মোতাহার হোসেন সাজু। প্রতিবেদনে বলা হয়, শিক্ষক শ্যামল কান্তি কর্তৃক ছাত্র রিফাতকে মারধর এবং ধর্মীয় অনুভূতিতে আঘাত দেয়ার বিষয়টি নিষ্পত্তির জন্য ২০১৬ সালে ১৩ মে স্কুল ম্যানেজিং কমিটির উন্নয়ন সভা অনুষ্ঠিত হয়।

সভা চলাকালে প্রধান শিক্ষকের বিচার স্কুলে হবে- উল্লেখ করে জুমার নামাজের পূর্বে মাইকে ঘোষণা করা হয়। ঘোষণার পরেই হাজার হাজার লোক বিদ্যালয় প্রাঙ্গণে জড়ো হয়। এ সময় উত্তেজিত জনতার মধ্য থেকে কতিপয় ব্যক্তি শিক্ষক শ্যামল কান্তিকে লাঞ্ছিত করেন।

এ ঘটনার সংবাদ পেয়ে বন্দর থানা পুলিশ, উপজেলা নির্বাহী অফিসার, উপজেলা চেয়ারম্যান, স্থানীয় চেয়ারম্যান এবং এলাকার জনপ্রতিনিধি ও গণ্যমান্য ব্যক্তিরা ঘটনাস্থলে উপস্থিত হয়ে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনেন।

সর্বশেষ স্থানীয় সংসদ সদস্য একেএম সেলিম ওসমান বিকেল পৌনে ৪টার দিকে উপস্থিত হলে উত্তেজিত জনতা পুনরায় ওই শিক্ষকের বিচারের দাবি জানায়। প্রধান শিক্ষককে জনগণের রোষানল থেকে রক্ষার জন্য তাদের দাবির প্রেক্ষিতে কান ধরে উঠবস করার ঘটনাটি আকস্মিকভাবে ঘটে।

এফএইচ/বিএ

আপনার মতামত লিখুন :