১৩৯ জনের মৃত্যুদণ্ড, যাবজ্জীবন ১৮৫

নিজস্ব প্রতিবেদক
নিজস্ব প্রতিবেদক
প্রকাশিত: ১০:৩৪ এএম, ২৭ নভেম্বর ২০১৭ | আপডেট: ০১:৫৭ পিএম, ২৭ নভেম্বর ২০১৭
১৩৯ জনের মৃত্যুদণ্ড, যাবজ্জীবন ১৮৫

বহুল আলোচিত বিডিআর সদর দফতরের পিলখানা ট্র্যাজেডির ঘটনায় ৫৭ সেনা কর্মকর্তাসহ ৭৪ জনকে হত্যার মামলায় মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত ১৫২ জনের মধ্যে ১৩৯ জনের সাজা বহাল রেখেছেন হাইকোর্ট। এছাড়া আসামি ও রাষ্ট্রপক্ষের আংশিক আপিল গ্রহণ করে ১৮৫ জনকে যাবজ্জীবন কারাদণ্ড দেয়া হয়েছে। এদের মধ্যে ১০ আসামি মারা গেছেন এবং ২৮ জন আসামির কেউই কোনো আপিল করেননি।

অন্যদিকে হাইকোর্টের রায়ে ২০০ জনকে বিভিন্ন মেয়াদে কারাদণ্ড দেয়া হয়েছে। তবে, নিম্ন আদালতের দেয়া দণ্ড থেকে খালাস দেয়া হয়েছে ৪৫ জনকে। বিভিন্ন মেয়াদে দেয়া দণ্ডের মধ্যে ১৩ বছরের সাজা দেয়া হয়েছে দুজনকে, ১০ বছর ১৮২ জন, সাত বছর ১২ জন, তিন বছরের সাজা দেয়া হয়েছে চারজনকে।

আদালতের রায় ঘোষণার পর অ্যাটর্নি জেনারেল মাহবুবে আলম এ তথ্য নিশ্চিত করে সাংবাদিকদের জানিয়েছেন।

ডেথ রেফারেন্স ও আসামিদের করা আপিল আবেদনের ওপর শুনানি শেষে রাষ্ট্র ও আসামিপক্ষের আইনজীবী এবং গণমাধ্যমকর্মীদের উপস্থিতিতে রোববার ও সোমবার পরপর দুদিনে হাইকোর্টের বিচারপতি মো. শওকত হোসেনের নেতৃত্বাধীন বিশেষ (বৃহত্তর) বেঞ্চ এ রায় ঘোষণা করেন। সোমবার ছিল মূল রায়ে দণ্ড ঘোষণা করার নির্ধারিত শেষ দিন।

হাইকোর্টের বেঞ্চের অপর দুই বিচারপতি হলেন মো. আবু জাফর সিদ্দিকী ও মো. নজরুল ইসলাম তালুকদার।

আসামি ও রাষ্ট্রপক্ষের করা আপিল আংশিক গ্রহণ করে আদালত এ রায়কে ঐতিহাসিক বলে উল্লেখ করেছেন। বিডিআর বিদ্রোহের মতো এমন জঘন্য ঘটনা ভবিষ্যতে এড়ানোর জন্য রায়ে বিভিন্ন সুপারিশও করা হয়েছে।

সোমবার সকাল ১০টা ৫০ মিনিট থেকে রায় ঘোষণা শুরু করেন বেঞ্চের কনিষ্ঠ বিচারপতি মো. নজরুল ইসলাম তালুকদার। তারপর বেলা ২টা ৩৫ মিনিট থেকে আসামিদের দণ্ড ঘোষণা শুরু হয়। প্রথম দফায় বিভিন্ন মেয়াদে কারাদণ্ডপ্রাপ্তদের রায় দেন বেঞ্চের নেতৃত্বদানকারী বিচারপতি মো. শওকত হোসেন। তারপর যাবজ্জীবন দণ্ডপ্রাপ্তদের বিষয়ে রায় ঘোষণা করেন অপর সদস্য বিচারপতি মো. আবু জাফর সিদ্দিকী। এরপর রাষ্ট্রপক্ষের করা আপিলের রায় ঘোষণা করেন বিচারপতি মো. নজরুল ইসলাম তালুকদার।

সর্বশেষ সব আসামির দণ্ড ঘোষণা করেন বিচারপতি মো. শওকত হোসেন। এ সময় রাষ্ট্রপক্ষের আইনজীবী অ্যাটর্নি জেনারেল মাহবুবে আলম ও আসামিপক্ষের আইনজীবী এসএম শাহজাহান রায়ের বিষয়ে জিজ্ঞাসা করে বুঝে নেন।

তারা জানতে চান কাকে কত বছরের দণ্ড দেয়া হয়েছে। এ সময় আদালত এক এক করে অভিযুক্তদের নাম ও সাজার দণ্ড ঘোষণা করার বিষয়টি আইনজীবীদের বুঝিয়ে দেন।

রায় ঘোষণার পর রাষ্ট্রের প্রধান আইন কর্মকর্তা অ্যার্টনি জেনারেল মাহবুবে আলম সাংবাদিকদের জানান, ২০০৯ সালে পিলখানায় বিডিআর সদর দফতরে নারকীয় হত্যাকাণ্ডের ঘটনায় ৫৭ সেনা কর্মকর্তাসহ ৭৪ জনের প্রাণহানির আলোচিত এ মামলায় ৮৫০ আসামির মধ্যে ৫৬৮ জনকে সাজা দিয়েছিলেন নিম্ন (প্যানেল কোর্ট) আদালত।

তাদের মধ্যে ১৫২ আসামিকে মৃত্যুদণ্ড, ১৬০ আসামিকে যাবজ্জীবন কারাদণ্ড ও ২৫৬ জনকে বিভিন্ন মেয়াদে কারাদণ্ড দেয়া হয়েছিল। সে সময় খালাস পেয়েছিলেন ২৭৭ জন।

মাহবুবে আলম বলেন, আজ হাইকোর্টের দেয়া রায়ে নিম্ন আদালতের দেয়া ১৫২ জনের মৃত্যুদণ্ড থেকে কমিয়ে ১৮৫ জনের যাবজ্জীবন ও ১৮৯ জনের বিভিন্ন মেয়াদে সাজা বহাল রেখে রায় ঘোষণা করেছেন হাইকোর্ট। নিম্ন আদালতে বিচারের মুখোমুখি করা হয় ৮৪৬ বিডিআর জওয়ানকে। মামলার অন্য চার আসামি বিচার চলাকালে মারা যান। পরে হাইকোর্টের ডেথ রেফারেন্স ও আপিল শুনানির সময় আরো ৬ আসাসি মারা যায়। এ নিয়ে মোট ১০ জন আসামি মারা গেছেন। আসামির সংখ্যার দিক থেকে এটি পৃথিবীর সবচেয়ে বড় হত্যা মামলা।

আদালত এ রায়কে ঐতিহাসিক বলে উল্লেখ করেছেন। ভবিষ্যতে এ ধরনের ঘটনা এড়াতে রায়ে বিভিন্ন সুপারিশও করা হয়েছে। সোমবার হাইকোর্টের রায়ের মধ্য দিয়ে মামলাটির বিচারপ্রক্রিয়ার দুটি ধাপ শেষ হলো।

হাইকোর্টে কোনো রায় পড়তে দুদিন সময় লাগার বিয়ষটি অনেক আইনজীবীই নজিরবিহীন বলেছেন। এ মামলায় আদালত এক হাজার পৃষ্ঠার বেশি পর্যবেক্ষণ দিয়েছেন। সম্পূর্ণ রায় প্রায় ১০ হাজার পৃষ্ঠার মতো শোনা গেছে।

রায়ের পর্যবেক্ষণে হাইকোর্ট বলেছেন, তৎকালীন বিডিআর বিদ্রোহে অভ্যন্তরীণ ও বাইরের ষড়যন্ত্র থাকতে পারে। রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা নষ্ট করে গণতন্ত্র ধ্বংস করাই ছিল বিদ্রোহের অন্যতম উদ্দেশ্য।

সোমবার রায় পড়তে গিয়ে বিচারপতি নজরুল বলেন, তৎকালীন বিডিআরের নিজস্ব গোয়েন্দারা কেন এ ধরনের ঘটনা ঘটতে পারে তা আগে জানতে পারেনি, সেই ব্যর্থতা খুঁজতে একটি তদন্ত কমিটি করা দরকার। তিনি মহাপরিচালকের উদ্দেশ্যে বলেন, কোনো সমস্যা এলে তা তাৎক্ষণিক সমাধান করতে হবে। বিজিবির জওয়ানরা কোনো সমস্যা নিয়ে এলে তা মীমাংসা করতে হবে এবং বিজিবিতে সেনা কর্মকর্তা ও জওয়ানদের মধ্যে পেশাদারি সম্পর্ক থাকতে হবে।

নজরুল ইসলাম প্রশ্ন করেন, কেন সে সময়ের বিডিআর ডাল-ভাত কর্মসূচি নিল। ভবিষ্যতে এ ধরনের কোনো কর্মসূচি যেন না নেয়া হয়, সে ব্যাপারে বিজিবিকে সতর্ক করেন তিনি।

আরেক বিচারপতি মো. শওকত হোসেন বলেন, কোনো সেনা কর্মকর্তা সীমান্তরক্ষী বাহিনীতে থাকবে না, এটাই ছিল বিদ্রোহে অংশ নেয়া ব্যক্তিদের মূল মনোভাব। তিনি জওয়ানদের সঙ্গে ঔপনিবেশিক (কলোনিয়াল) আমলের মতো ব্যবহার না করার কথা বলেন। তিনি বলেন, একই দেশ। এখানে সবাই ভাই ভাই।

নারকীয় এ হত্যাকাণ্ডকে নৃশংস ও বর্বরোচিত বলে উল্লেখ করা হয়েছে রোববারের পর্যবেক্ষণে। রোববার আদালত বলেন, মুক্তিযুদ্ধের সময় তৎকালীন ইপিআর পাকিস্তান বাহিনীর সঙ্গে যুদ্ধে বীরত্বপূর্ণ অবদান রেখেছে। সীমান্তরক্ষায় নিয়োজিত এ বাহিনী দেশে-বিদেশে সম্মানের সঙ্গে কাজ করেছে। কিন্তু ২০০৯ সালে পিলখানায় তৎকালীন বিডিআরের কিছু সদস্য আইনকে বৃদ্ধাঙ্গুলি দেখিয়ে হত্যাকাণ্ড ঘটিয়েছেন। এ কলঙ্কচিহ্ন তাদের অনেক দিন বয়ে বেড়াতে হবে। একসঙ্গে ৫৭ জন সেনা কর্মকর্তাকে হত্যার নজির ইতিহাসে নেই। বর্তমান প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা দৃঢ় মনোবল নিয়ে পরিস্থিতি মোকাবেলায় যৌক্তিক পদক্ষেপ নিয়েছেন।

২০১৩ সালের ৬ নভেম্বর এ মামলায় ১৫২ জনকে ফাঁসিতে ঝুলিয়ে মৃত্যুর আদেশ দেন বিচারিক আদালত। এদের একজন ছাড়া সবাই তৎকালীন বিডিআরের সদস্য। যাবজ্জীবন কারাদণ্ড দেয়া হয় ১৬ জনকে। সর্বোচ্চ ১০ বছরের কারাদণ্ডসহ বিভিন্ন মেয়াদে সাজা পান আরও ২৫৬ জন। অভিযোগ প্রমাণিত না হওয়ায় খালাস পান ২৭৭ জন আসামি। সাজা হয় মোট ৫৬৮ জনের।

এরপর আসামিদের ডেথ রেফারেন্স (মৃত্যুদণ্ড অনুমোদন) হাইকোর্টে আসে। সাজার রায়ের বিরুদ্ধে দণ্ডিত ব্যক্তিরাও জেল আপিল ও আপিল করেন। ৬৯ জনকে খালাসের বিরুদ্ধে রাষ্ট্রপক্ষ আপিল করে। এসবের ওপর ২০১৫ সালের ১৮ জানুয়ারি হাইকোর্টে শুনানি শুরু হয়, শেষ হয় ৩৭০তম দিনে গত ১৩ এপ্রিল। সেদিন শুনানি শেষে আদালত মামলাটি রায়ের জন্য অপেক্ষমাণ (সিএভি) রাখেন। এরপর হাইকোর্ট রায়ের জন্য ২৬ নভেম্বর তারিখ ধার্য করেন।

এআর/এফএএইচ/জেএ/এনএফ/এসএইচএস/জেডএ/আইআই