সংক্রামক ব্যাধি হাসপাতাল

হু হু করে বাড়ছে হামের রোগী, ভোগাচ্ছে অবকাঠামো-জনবল সংকট

সালাহ উদ্দিন জসিম
সালাহ উদ্দিন জসিম সালাহ উদ্দিন জসিম , জ্যেষ্ঠ প্রতিবেদক
প্রকাশিত: ০৯:৪৬ পিএম, ২৯ মার্চ ২০২৬
১০০ শয্যার হাসপাতালটিতে গত শনিবার পর্যন্ত হামের উপসর্গ নিয়ে ভর্তি রোগী ছিল ১১২ জন/ছবি: মাহবুব আলম

দুই বছরের শিশু ফাদিন। বাড়ি সাভার। গত ২১ মার্চ থেকে পক্স আক্রান্ত। বাবা মেহেদী হাসান স্থানীয় হাসপাতাল থেকে ওষুধ এনে খাইয়েছেন। কাজ হয়নি। অসুস্থতা কমার পরিবর্তে বেড়েছে। এরমধ্যে জ্বর হয়ে গেছে। পরে চিকিৎসকের কাছে নেওয়া হলে চিকিৎসক রাজধানীর সংক্রামক ব্যাধি হাসপাতালে নেওয়ার পরামর্শ দেন। এরপর গত তিনদিন ধরে সংক্রামক ব্যাধি হাসপাতালে চিকিৎসা নিচ্ছে। এখন কিছুটা ভালো শিশু ফাদিন।

চার মাসের সন্তান আয়ানকে নিয়ে রাজধানীর কড়াইলের এরশাদ নগর থেকে এসেছেন মনির হোসেন ফাহিম। জানতে চাইলে তিনি জাগো নিউজকে বলেন, ‘প্রথমে হয়েছে ঠান্ডা জ্বর। ১৫-২০ দিন চিকিৎসা নেওয়ার পরও ভালো হয়নি। রেশ হয়ে গেছে। পরে আইইডিসিআরে (রোগতত্ত্ব, রোগ নিয়ন্ত্রণ ও গবেষণা ইনস্টিটিউ) গেলাম। সেখান থেকে সংক্রামক ব্যাধি হাসপাতালে এসেছি। তারা বলছে, হাসপাতালে ভর্তি থেকে চিকিৎসা নিতে হবে।এরপর এখানে ভর্তি করালাম।’

১৯ দিনের সন্তান মোবারককে নিয়ে টঙ্গীর চেরাগ আলী থেকে আসা সাখাওয়াত বলেন, ‘প্রথমে জ্বর এসেছে।পরে ফোটা ফোটা হয়ে গেছে। ডাক্তার দেখাইছি। তিনি এখানে পাঠাইছেন। দুদিন হলো চিকিৎসা চলছে।’

jagonews24

টঙ্গী থেকে সাত বছরের সন্তান সায়মাকে নিয়ে এসেছেন মা পারভীন আক্তার। তিনি বলেন, ‘চিকেন ফক্স হয়েছে সাতদিন আগে। জ্বর এসেছে। পরে খিচুনি হয়ে গেছে। যার কারণে এখানে এসে গত ৫-৬ দিন চিকিৎসা নিচ্ছি।’

ফাদিন, আয়ান, মোবারক ও সায়মা শুধু নয়—হাম আক্রান্ত ১১২ জন শিশু বর্তমানে ভর্তি হয়ে চিকিৎসা নিচ্ছে সংক্রামক ব্যাধি হাসপাতালে। রোববার (২৯ মার্চ) সরেজমিনে দেখা যায়, হাসপাতালটিতে তিল ধারণের ঠাঁই নেই। ১০০ শয্যার হাসপাতালে এখন উপচেপড়া রোগী।

সম্প্রতি দেশে হামের প্রাদুর্ভাব দেখা দিয়েছে। বিভিন্ন হাসপাতালে আক্রান্ত শিশুদের চাপ বাড়ছে। সংক্রামক এ রোগ মূলত শিশুর শ্বাসতন্ত্রকে ক্ষতিগ্রস্ত করে। এটি দ্রুত একজন থেকে অন্যজনে ছড়িয়ে পড়ে।

জানা গেছে, চলতি বছরের শুধু ফেব্রুয়ারি-মার্চে ৫৬০ জন রোগী হামের উপসর্গ নিয়ে সংক্রামক ব্যাধি হাসপাতালে এসে চিকিৎসা নিয়েছেন। যার মধ্যে চলতি মাসে ১৯ জনসহ এখন পর্যন্ত ২২ জনের প্রাণহানি হয়েছে। অথচ গত বছর পুরো বছরজুড়ে হাম আক্রান্ত সন্দেহে ভর্তি ছিল ৬৯ রোগী। পরে তাদের মধ্যে ১৩ জনের হাম ছিল বলে পরীক্ষায় শনাক্ত হওয়া যায়।

jagonews24

শুধু হাম নয়, ধনুষ্টংকার, ডিপথেরিয়া, ভাইরাল হেপাটাইটিস, জলবসন্ত, মামস, পোলিওসহ নানাবিধ সংক্রামক ব্যাধি নিয়ে সারাদেশ থেকে আক্রান্তরা এসে চিকিৎসা নেন এই সংক্রামক ব্যাধি হাসপাতালে। অথচ হাসপাতালটিতে অবকাঠামো এবং জনবলের ঘাটতি চরমে।

১০০ শয্যার হাসপাতালটিতে হাম আক্রান্ত রোগীই ১১২ জন। অথচ, প্রতিটি রোগই উচ্চ সংক্রামক ঝুঁকির। চলতি মাসের মাঝামাঝি রোগীর এই চাপ ছিল দুইশোরও বেশি। তখন বারান্দায়ও চিকিৎসা নিতে হয়েছে অনেককে।

শুধু তা-ই নয়, এই হাসপাতালটিতে জনবল সংকটও প্রকট। সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন, বর্তমান ২০ জন চিকিৎসক আছেন, অথচ আরও অন্তত ১৪ জন দরকার। নার্স দিয়ে দেওয়া হয় টিকিট, নেই চতুর্থ শ্রেণির জনবল। ২৫ জন কর্মরত থাকলেও পদ শূন্য ৫৯ জনের।

বলা হচ্ছে, টিকাদান কর্মসূচিতে ঘাটতি হামের প্রাদুর্ভাব বাড়ার অন্যতম কারণ। অনেক শিশু নিয়মিত টিকাদান কর্মসূচি বা ইপিআই থেকে বাদ পড়ায় তাদের শরীরে রোগ প্রতিরোধক্ষমতা তৈরি হয়নি। ঘনবসতিপূর্ণ এলাকা বা অপুষ্টিও এ ভাইরাসের বিস্তারের কারণ। টিকা না নেওয়া বা অসম্পূর্ণ ডোজ নেওয়ার কারণেও ঝুঁকিতে রয়েছে অনেক শিশু। এটিও ভাইরাসটির প্রাদুর্ভাব বাড়ার বড় কারণ।

jagonews24

সংক্রামক ব্যাধি হাসপাতালের তত্ত্বাবধায়ক (ভারপ্রাপ্ত) ডা. তানজিনা জাহান হাসপাতালের রোগী ও শয্যা বরাদ্দের চিত্র তুলে ধরে জাগো নিউজকে বলেন, ‘স্বাভাবিক হিসাব অনুযায়ী আমাদের হামের জন্য বরাদ্দ সিট ১০টি। কিন্তু হুট করেই হামের প্রাদুর্ভাব বাড়ায় একটু হিমশিম খেতে হচ্ছে।’

‘তবে, আমাদের বিদ্যমান অবকাঠামো ও জনবলের মাধ্যমে সাধ্যের সবটুকু দিয়ে রোগীদের সেবা দেওয়ার চেষ্টা করছি। সহকর্মীদের নিরলস প্রচেষ্টায় আমরা পরিস্থিতি সামাল দিচ্ছি। আশা করি, কেউ চিকিৎসাবঞ্চিত হবে না’—বলেন তিনি।

হাসপাতালের কনসালটেন্ট ডা. এ আর এম সাখাওয়াত হোসেন বলেন, ‘গতকাল (শনিবার) পর্যন্ত হামের লক্ষণ নিয়ে ১১২ জনের মতো ভর্তি ছিল। ফেব্রুয়ারি ও মার্চে ৫৬০ জন হামের রোগী পেয়েছি। অথচ, গত বছর পুরো বছরে এ সংখ্যা ছিল ৬৯ জন। ফলে এবার চাপটা একটু বেশিই।’

এসইউজে/এমকেআর

পাঠকপ্রিয় অনলাইন নিউজ পোর্টাল জাগোনিউজ২৪.কমে লিখতে পারেন আপনিও। লেখার বিষয় ফিচার, ভ্রমণ, লাইফস্টাইল, ক্যারিয়ার, তথ্যপ্রযুক্তি, ধর্ম, কৃষি ও প্রকৃতি। আজই আপনার লেখাটি পাঠিয়ে দিন [email protected] ঠিকানায়।