সন্তানকে শারীরিক আঘাত করার প্রভাব জানেন কি
বাপ-মায়ের কাছে একটু মার না খেলে সন্তান মানুষ হবে না, স্কুল গুলোতে শিক্ষার্থীদের মারধোর বন্ধ করার পর থেকেই ছেলে-মেয়েগুলো বখে গেছে – এসব ধারণা আমাদের সমাজে নতুন নয়। অনেক বাবা-মা মনে করেন, হালকা চড়-থাপ্পড় শাসনের অংশ।
কিন্তু শারীরিক শাস্তি কি সত্যিই সন্তানকে শোধরায়, নাকি এর প্রভাব অনেক অন্যভাবে বের হয়ে আসে সন্তান বড় হওয়ার পরে? গবেষণা কী বলছে?
বিশ্বজুড়ে সাম্প্রতিক গবেষণাগুলো বলছে, শারীরিক আঘাত স্বল্পমেয়াদে শিশুকে চুপ করাতে পারে, কিন্তু দীর্ঘমেয়াদে এর মানসিক ও আচরণগত প্রভাব উদ্বেগজনক। যা সঙ্গে সঙ্গে বাবা-মা টের না পেলেও সন্তান প্রাপ্তবয়স্ক হয়ে যাওয়ার পর তা প্রকাশ পেতে পারে।
গবেষণায় কী পাওয়া গেছে?
আমেরিকান একাডেমি অব পেডিয়াট্রিকস ২০১৮ সালে প্রকাশিত নীতিমালায় স্পষ্টভাবে জানিয়েছে, শারীরিক শাস্তি শিশুদের আক্রমণাত্মক আচরণ বাড়িয়ে দেয় এবং মানসিক স্বাস্থ্যে নেতিবাচক প্রভাব ফেলে।
একইভাবে আমেরিকান সাইকোলজিক্যাল অ্যাসোসিয়েশন উল্লেখ করেছে, নিয়মিত শারীরিক শাস্তি পেলে শিশুদের মধ্যে উদ্বেগ, হতাশা এবং আত্মসম্মানবোধ কমে যাওয়ার ঝুঁকি বাড়ে।
আচরণে কী পরিবর্তন আসে?
গবেষণায় দেখা গেছে, যারা ছোটবেলায় শারীরিক আঘাত পেয়েছে, তারা বড় হয়ে সম্পর্কের ক্ষেত্রে বেশি আক্রমণাত্মক বা ভীতু হতে পারে।

বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা শিশুদের প্রতি সহিংসতাকে জনস্বাস্থ্য সমস্যা হিসেবে চিহ্নিত করেছে। তাদের মতে, শারীরিক শাস্তি শিশুর মস্তিষ্কের বিকাশ ও আবেগ নিয়ন্ত্রণে দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব ফেলতে পারে।
কেন শিশুরা বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়?
শিশুর মস্তিষ্ক এখনও বিকাশমান। এসময় ভয় বা ব্যথা বারবার অনুভব করলে ‘স্ট্রেস রেসপন্স সিস্টেম’ অতিরিক্ত সক্রিয় হয়ে যায়। এতে শেখার ক্ষমতা ও সামাজিক দক্ষতা ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে।
হার্ভার্ড ইউনিভার্সিটির সেন্টার অন দ্য ডেভেলপিং চাইল্ড জানিয়েছে, শৈশবের টক্সিক স্ট্রেস ভবিষ্যতে শারীরিক ও মানসিক স্বাস্থ্যঝুঁকি বাড়ায়।
তাহলে শাসন করবেন কীভাবে?
এসব শুনে মনে হতে পারে যে, তাহলে কি শিশু ভুল করলে তাকে শাসন করবো না? শিশু কীভাবে শিখবে যে, অবাধ্য হলে বা কোনো খারাপ কাজ করলে তার ফল পেতে হবে; শিশু খারাপ-ভালোর পার্থক্য করাই বা কীভাবে শিখবে? অবশ্যই এসব বিষয় শিশুকে শেখানো অত্যন্ত জরুরি। কিন্তু শারীরিক আঘাত শেখানো সঠিক রাস্তা নয়।
কারণ, শাসন মানে ভয় দেখানো নয়, সীমা শেখানো। গবেষকরা বলছেন—
>> শিশুকে শান্তভাবে নিয়ম বোঝান
>> ভুল করলে সেটার ফলাফল ব্যাখ্যা করুন
>> ভালো আচরণের প্রশংসা করুন
এসব পদ্ধতির ফল হয়তো তাৎক্ষণিক পাবেন না। একটা চড় খেয়ে শিশু যেমন হঠাৎ শান্ত হয়ে যায়, তা হবেনা। কিন্তু এটাও ভাবার বিষয় যে, সেই চুপ করে যাওয়া কিন্তু শিক্ষা থেকে না, ভয় থেকে আসে। আর শিশুকে বোঝানোর এই পদ্ধতিটি দীর্ঘমেয়াদে বেশি কার্যকর। কারণ এটি স্থায়ী শিক্ষার দিকে ফোকাস করে।
শিশু যখন নিরাপদ বোধ করে, তখনই সে শেখে। মারধর তাকে মুহূর্তের জন্য থামাতে পারে, কিন্তু ভেতরে জমে থাকা ভয় বা ক্ষোভ অদৃশ্য থাকে না।
আইন ও সচেতনতা
বিশ্বের অনেক দেশেই শিশুদের শারীরিক শাস্তি আইনত নিষিদ্ধ। শিশু অধিকার নিয়ে কাজ করা আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলো বলছে, শারীরিক আঘাতকে ‘স্বাভাবিক শাসন’ হিসেবে দেখা মানসিকতার পরিবর্তন জরুরি।
সন্তানকে মানুষ করার দায়িত্ব বড়। কিন্তু সেই দায়িত্ব পালনের পথে যদি আঘাতই হয়ে ওঠে হাতিয়ার, তবে তার মূল্য দিতে হয় সন্তানের ভবিষ্যৎ দিয়ে।
শাসনের নামে আমরা কি অজান্তেই ক্ষতির বীজ বুনছি? এখনই সময় প্রশ্ন তোলার, আর বিকল্প পথ খোঁজার।
সূত্র: আমেরিকান একাডেমি অব পেডিয়াট্রিকস (২০১৮ নীতিমালা), আমেরিকান সাইকোলজিক্যাল অ্যাসোসিয়েশন, বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা, হার্ভার্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের সেন্টার অন দ্য ডেভেলপিং চাইল্ড, ইউনিসেফ রিপোর্ট
এএমপি/এমএস