স্ত্রী যখন এগিয়ে, স্বামী তখন মানসিক চাপে
দাম্পত্য সম্পর্ককে সাধারণত ভালোবাসা, আস্থা আর পারস্পরিক সহযোগিতার ভিত্তিতে দেখা হয়। কিন্তু আধুনিক সমাজে আর্থিক স্বাধীনতা ও শিক্ষাগত অগ্রগতির কারণে সম্পর্কের ভেতরে এক নতুন বাস্তবতা তৈরি হয়েছে-অনেক ক্ষেত্রে স্ত্রী এখন স্বামীর চেয়ে বেশি আয় করছেন, বেশি যোগ্যতা বা প্রতিষ্ঠিত অবস্থানে পৌঁছাচ্ছেন।
এই পরিবর্তন যেমন সমাজের অগ্রগতির প্রতিফলন, তেমনি কিছু দম্পতির জীবনে এটি মানসিক অস্বস্তি ও চাপের কারণও হয়ে উঠছে।
পরিবর্তিত সামাজিক বাস্তবতা
আগে দাম্পত্য জীবনে অর্থনৈতিক দায়িত্ব মূলত পুরুষের কাঁধে থাকত। পুরুষই ছিলেন প্রধান উপার্জনকারী, আর নারী ছিলেন গৃহস্থালির দায়িত্বে। কিন্তু সময় বদলেছে। এখন নারীরা শিক্ষা, চাকরি, ব্যবসা-সব ক্ষেত্রেই এগিয়ে যাচ্ছেন। অনেক পরিবারে দেখা যাচ্ছে, স্ত্রীর আয় স্বামীর তুলনায় বেশি। এই পরিবর্তনকে ইতিবাচক অগ্রগতি হিসেবে দেখা হলেও, সামাজিক মানসিকতার পরিবর্তন এখনো পুরোপুরি হয়নি। ফলে অনেক পুরুষ এই বাস্তবতাকে সহজভাবে গ্রহণ করতে পারছেন না।
হীনমন্যতার জন্ম কীভাবে হয়
বিশেষজ্ঞদের মতে, পুরুষদের একটি বড় অংশ ছোটবেলা থেকেই ‘পরিবারের প্রধান উপার্জনকারী’ হওয়ার ধারণা নিয়ে বড় হন। ফলে যখন স্ত্রী আয় বা অবস্থানে এগিয়ে যান, তখন তাদের ভেতরে অজান্তেই আত্মসম্মান নিয়ে প্রশ্ন তৈরি হয়। এই অনুভূতি থেকেই জন্ম নেয় হীনমন্যতা। তারা ভাবতে শুরু করেন-
- আমি কি যথেষ্ট ভালো নই?
- আমার ভূমিকা কি কমে যাচ্ছে?
- সমাজ আমাকে কীভাবে দেখছে?
এই প্রশ্নগুলো ধীরে ধীরে মানসিক চাপ তৈরি করে।
সম্পর্কের ভেতরে অদৃশ্য টানাপোড়েন
যেখানে বোঝাপড়া শক্তিশালী, সেখানে স্ত্রীর সাফল্য সম্পর্ককে আরও দৃঢ় করে। কিন্তু কিছু ক্ষেত্রে দেখা যায়, স্বামীর অনিরাপত্তা সম্পর্কের মধ্যে দূরত্ব তৈরি করে। এই টানাপোড়েন বিভিন্নভাবে প্রকাশ পেতে পারে। যেমন-
- অকারণে রাগ বা বিরক্তি
- স্ত্রীর কাজ বা সফলতাকে ছোট করে দেখা
- নিয়ন্ত্রণমূলক আচরণ
- যোগাযোগ কমে যাওয়া
এগুলো ধীরে ধীরে দাম্পত্য সম্পর্ককে দুর্বল করে দিতে পারে।
নারীর সাফল্য কি সমস্যা?
আসলে নারীর এগিয়ে যাওয়া কোনো সমস্যা নয়। সমস্যা হলো সেই অগ্রগতিকে গ্রহণ করার মানসিক প্রস্তুতি না থাকা। একটি সুস্থ সম্পর্ক কখনোই প্রতিযোগিতার ওপর দাঁড়িয়ে থাকে না, বরং সহযোগিতার ওপর দাঁড়িয়ে থাকে। যখন স্বামী-স্ত্রী একে অপরের সাফল্যকে সম্মান করেন, তখন আর্থিক বা পেশাগত পার্থক্য সম্পর্ককে ভাঙে না, বরং আরও শক্তিশালী করে।
আরও পড়ুন:
- নেতিবাচকতার ভিড়ে যেভাবে থাকবেন ইতিবাচক
- সন্তান কি সত্যিই বাড়ায় দাম্পত্য দূরত্ব?
- চিৎকার নয়, বোঝাপড়ায় বড় হোক সন্তান
সমাজের ভূমিকা
এই মানসিকতা শুধুমাত্র ব্যক্তিগত নয়, সামাজিকও। পরিবার ও সমাজে এখনো অনেক জায়গায় পুরুষকে ‘উপরে’ এবং নারীকে ‘নিচে’ রাখার পুরোনো ধারণা কাজ করে। এই ধারণা বদলানো জরুরি। শিক্ষা, গণমাধ্যম এবং পারিবারিক মূল্যবোধ-সবখান থেকেই বার্তা আসা দরকার যে, সাফল্য লিঙ্গভিত্তিক নয়; এটি সক্ষমতার ফল।
সমাধানের পথ
বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, এই সমস্যার সমাধান সম্ভব যদি- দম্পতির মধ্যে খোলামেলা আলোচনা থাকে, একে অপরের সাফল্যকে উদযাপন করা হয়, আত্মসম্মানকে আয় বা পেশার সঙ্গে না জোড়া হয়, প্রয়োজনে কাউন্সেলিং বা পারিবারিক পরামর্শ নেওয়া। সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো, সম্পর্ককে ‘কে এগিয়ে’ সেই দৃষ্টিকোণ থেকে না দেখে ‘আমরা একসাথে কতটা এগোচ্ছি’ সেই দৃষ্টিতে দেখা।
স্ত্রী যখন এগিয়ে যান, তখন স্বামীর মানসিক চাপ তৈরি হওয়া কোনো ব্যতিক্রম নয়, বরং একটি সামাজিক-মনস্তাত্ত্বিক বাস্তবতা। কিন্তু এই চাপকে অতিক্রম করাই একটি পরিণত সম্পর্কের পরিচয়। দাম্পত্যের সৌন্দর্য প্রতিযোগিতায় নয়, বরং পারস্পরিক সম্মান, বোঝাপড়া এবং একে অপরের পাশে দাঁড়ানোর মধ্যেই নিহিত।
তথ্যসূত্র: জার্নাল অফ হেলথ অ্যান্ড সোশ্যাল বিহেইভর
জেএস/