তৌহিদুল হকের কবিতা
মৃত্যু অথবা অবিনশ্বরতা এবং অন্যান্য
মৃত্যু অথবা অবিনশ্বরতা
এক সংক্ষিপ্ত বয়ানে প্রত্যাশার বর্ণনা
নতুন মোড়কে ফিরে আসে কর্মের ব্যাপ্তিতে
প্রত্যাশায় ভাসে নতুন অবয়ব, ক্ষণিকের বাসনা—
তোমায় নিয়ে নিঃস্ব হবার অতি দামি স্বাদ, নির্ভেজাল।
এতটুকু, সত্যি এতটুকু, বাসনা বিলিয়ে দিতে
উদাত্ত চঞ্চলা মন, সারাক্ষণ অস্থির
বয়ানে অশান্ত করে—পালিয়ে যেতে উৎসুক হয়েও, ফিরে আসি
আশার বন্যায়—নেমে আসে হতাশার সম্ভাবনা!
তোলপাড় আবেগ, উত্তাপ, না-বলা শব্দমায়া
ঘিরে রাখে সকল বাসনার চাবি। কোনো এক ছুটি
নিয়ে যাবে দূরান্তে। সকল চাওয়া, সব অনুভূতি
পড়ে থাকবে। যেমন থাকে গাছের পাতা। নিষ্পাপ হাসি!
উদ্ভূত নয়নে, সজাগ দৃষ্টিতে
সব সরিয়ে অন্য আমি। নিথর অথবা অতি স্থবির
এ যেন মৃত্যু অথবা অবিনশ্বরতা।
****
উপসংহার
সকল লেনদেন ফুরিয়ে গেলে মানুষ হাল্কা হয়
জীবন আলিঙ্গন বিন্দুতে জমে ভাব-তরঙ্গ—একাকিত্ব
বণ্টনের হিসেব, প্রত্যাশা-প্রাপ্তির সব আয়োজন বিদায় নেয়—
যেমন পড়ে থাকে পাখির পালক।
অনেক কিছুর সাথে উপসংহার হয়, হয় সমাপ্তকরণ
সংযোগ, নৈকট্য, প্রতিদিনের অভ্যাস কি এত সহজে মিলিয়ে যায়?
রেখে দেওয়া খাম, লেগে থাকা ঘাম—স্মৃতির সোনালি ক্যানভাস
ফেলে আসা ঘাস, স্থান কিংবা আড্ডাকেন্দ্র
হৃদয়ের নিখুঁত কাতরতা খোঁজে।
সকল স্মৃতির তুলতুলে আদর, অভিনব মোহ।
সকল ঘটনা-বিন্যাস ফিরে ফিরে আসে হৃদয় সম্মুখে
কেবল-ই ছবি, হারানো মুখ, হারিয়ে ফেলা সুখ কিংবা একটি আদরমাখা হাত।
তেজস্বী কামনা—মুখোমুখি বাসনা।
কালের স্রোতে অবতীর্ণ বাক্য, অর্থ হারিয়ে দাঁড়িয়ে রয়, অসহায়।
যেমন দাঁড়িয়ে থাকে পথ হারিয়ে ফেলা বালক।
****
পা
এখন আর আগের মতো ফূর্তি নেই, নেই শরীর তথা পায়ের শক্তি। বিশ্রামে স্বস্তি!
মনের ইচ্ছা, বিশ্বস্ত মানুষের আলিঙ্গন ঘোমটার মতো নীরবে থিতু।
জীবনের মহোৎসবে প্রাণে বেগ আসে, নিভৃতে। ক্ষতিহীন প্রলয়ের স্তূপ।
পায়ের গোড়ালি—বারোমাসই নিরন্তর দাগে ভরা
পায়েরও দুঃখ থাকে, ব্যথায় ফেটে যেতে হয়
নিভৃত প্রাণে বয়ে বেড়ায় শতাব্দী সংলাপ
সময়ের আকুতি। শরীরী ভার—বেদনার কালো ঘোড়া। মনুষ্য বিষয়—
কালো দাগের অদ্ভূত আলো!
খরায় ফাটল ধরে শস্য ক্ষেতে, মরে যায় নতুন বুনিয়াদি স্বপ্ন।
একঝাক পাখির মতো কেউ আবার শুনিয়ে যায় নতুন দিনের গল্প।
শ্রান্ত হয়, বিলীন হয়, হয় অবধারিত।
জীবনের নামে উৎসব হয়, যেন ‘জীবন ক্ষয়’
আজও ভারী লাগে নিজের পা।
টেনে চলছি অবিরাম, অবাক হয়ে ভাবি
কে কাকে টানি?
****
অদৃশ্যায়ন
প্রশান্তকরণে, উদ্বুদ্ধ হয়ে ওঠে মনের জানালা
আশা-আকাঙ্ক্ষার গতি-প্রকৃতি, নির্জীবতার কোমল
কোলাহল। শুধু এতটুকু আশায়—
যা নির্ভেজাল, যা নির্মোহ অথবা শান্ত প্রকৃতির
অথবা যেখানে কারো কোনো অংশ নেই, নেই দাবি-দাওয়া
এমন অর্জন হোক আমার। হয় কি কারো কখনো?
সকল অর্জন ফেলে রেখে নির্বাসিত নয়ন, জীবন-ঘনিষ্ঠ
আয়োজন ব্যর্থ করে বিদায়ী উদ্ধৃতি, প্রীতি-সম্ভাষণ বিলুপ্ত করে
পেছনে ফেলে সকল তেজস্বী কামনা—অনুসন্ধানে নতুন নিয়তি!
হারানো শক্তির পুনর্জাগরণে বিলীন অবিশ্বস্ত মুখ, কৃত্রিম হাসি, স্পর্শ
আর অপূর্ব লেখ্য। যা জীবনের কথা বলে নির্মোহ আয়োজনে।
ফেলে রেখে সব সম্ভাবনা, সকল আশার আলো
দিয়েছি হাত অন্ধকারে। অন্ধকার কি সব সময় কালো কালিমার আধার?
অপরাজিত ভাব দূরে সরিয়ে
নব্য উল্লাস, প্রকৃতি-সদ্ভাব জীবন। মেনে নেওয়া পাখির শব্দ
কোলাহল, অনুপস্থিতি। পক্ষান্তরে, অদৃশ্যায়ন।
****
হৃদমন্দিরে
আমার না-বলা কথায়, না-তাকানো দৃশ্যে
কেঁপে ওঠে অন্তর্লীন অবয়ব, মনুষ্য আনাগোনায়
গড়ে ওঠা ছোট পরিসর, পেয়ে বসে আগ্রহসার।
এমনকি একা বয়ে বেড়ানো জীবনের স্বরলিপি।
স্মৃতি থেকে হারিয়ে যাওয়া শব্দ-অক্ষর।
অপলক দৃশ্য ডেকে নেয়; বারবার, বহুদিন, বহু স্মৃতিতে
মেখে দেয় আজব কল্পনা, নাম না-জানা শব্দের অর্থের মতো।
কেমন যেন, চেনা-জানা-অচেনা!
মুখ ভারী করে সমুদ্র দেখে নবীন কিশোরী
বুকে তার আকাশসম ভার, কপালের দু’পাশে চুলের রাশি—
ফিরে আসে বারবার।
নিষেধ বা নিষেধাজ্ঞা কেবল-ই প্রতীক চিহ্ন
কে শোনে কাকে, কার কথা
কে দিয়েছে কবে ডাক, হৃদমন্দিরে যাওয়ার প্রবল হাক!
এসইউ