আরিফুল ইসলামের কবিতা: প্রতিবাদী মনের উদার আলাপ
আরিফুল ইসলাম মূলত কবি। তবে সাহিত্য সম্পাদক হিসেবেও তিনি বেশ পরিচিত সাহিত্যপাড়ায়। মনে-প্রাণে একজন নিবেদিত সাহিত্যকর্মী। আহামরি হাকডাক নেই। সাহিত্যের ছোটকাগজ 'রচয়িতা'র জন্য অন্তঃপ্রাণ। এখন আবার সাহিত্যের ওয়েবম্যাগ 'সাহিত্য বার্তা' নিয়ে সমানে লড়াই করে যাচ্ছেন। কবিতায় যেমন প্রতিবাদী; মানসিকতায় তেমনই উদার।
কবি, সাহিত্য সমালোচক ও সম্পাদক আরিফুল ইসলামের জন্ম ১৯৮২ সালের ১৫ এপ্রিল জামালপুরের ইসলামপুর উপজেলায়। মো. হাবিবুর রহমান ও মিসেস ফাতেমা বেগমের পাঁচ সন্তানের মধ্যে তিনি চতুর্থ। আপাদমস্তক একজন কবি এবং সাহিত্য সমালোচক আরিফুল ইসলাম পেশায় সফল উদ্যোক্তা। তিনি রুদ্র কম্পিউটার অ্যান্ড স্টেশনারি হাউজের নির্বাহী পরিচালক। এ ছাড়া রিতু ও জংশন প্রকাশনের সম্পাদক ও প্রকাশক হিসেবে দায়িত্ব পালন করে যাচ্ছেন।
তিনি বহুল আলোচিত ছোটকাগজ রচয়িতা’র সম্পাদক। যা উভয় বাংলার সাহিত্যিকদের কণ্ঠস্বরকে সংযুক্ত করেছে। এ ছাড়া ইসলামপুরের বেশ কয়েকটি উল্লেখযোগ্য প্রতিষ্ঠানের প্রতিষ্ঠাতা পরিচালক এই কবি। এর মধ্যে ব্রহ্মপুত্র কালচারাল একাডেমি, ইউট স্কুল (সুবিধাবঞ্চিত শিশুদের), রচয়িতা সাহিত্য পরিষদ ও ইসলামপুর সাহিত্য সংসদ অন্যতম।
উপন্যাস, প্রবন্ধ এবং কবিতায় সমানভাবে অগ্রগামী আরিফুল ইসলাম। তার প্রকাশিত বইয়ের মধ্যে আছে—‘কালো মুখোশ’ (কবিতা), ‘সাত তারার ময়ূখ’ (কবিতা), ‘বাংলা সাহিত্যে বাঁকবদল’ (প্রবন্ধ), ‘অপেক্ষার শেষ প্রহর’ (উপন্যাস), ‘গুমের চিতায় স্বাধীনতা’ (কবিতা), ‘রুদ্র ও অনন্যা কবিতা’ (কবিতা) ও ‘পৃথিবীর প্রথম দরজা’ (কবিতা)।
তার কবিতার ভাষা প্রাঞ্জল। সহজ-সরল অভিব্যক্তি। অনুভবে গভীর। ব্যঞ্জনায় সুস্বাদু। ধর্মান্ধতা, গোড়ামি ও অমানবিক কর্মকাণ্ডের বিরুদ্ধে সোচ্চার। সমকালীন তরুণ কবিদের কাতারে আরিফুল ইসলাম ফেলনা নয়। মফস্বল শহরে থেকেও হাতের মুঠোয় রাখেন পুরো দেশ। কখনো কখনো পৌঁছে যান দেশের সীমানা ছেড়ে। কবি বলতে চান, ‘এ শহরে একটাও মানুষ নেই। একটাও মাথা নেই। শুধু পথগুলো চিনে রাখে সতর্কমুখি পা। শরীরবিহীন জামাগুলো উলঙ্গ হয়ে ঘুরে বেড়ায় এ শহর থেকে সে শহরে। বাতাসে অক্সিজেনের পরিবর্তে বিষ উড়ে উড়ে বেড়ায়।’(প্রেম শরীর ও এ শহরের মানুষ)
কবি হিসেবে স্বভাবে সরল। ব্যক্তি হিসেবে কঠোর। কবিতার পথে হেঁটে চলা দীর্ঘদিনের। তার লেখা বিভিন্ন সময়ের কবিতা পাঠককে আকৃষ্ট করেছে। তার কাব্যগ্রন্থ ‘রুদ্র ও অন্যান্য কবিতা’ এবং ‘পৃথিবীর প্রথম দরজা’র জন্য ব্যাপক সাড়া পেয়েছেন পাঠকের কাছ থেকে। তার প্রত্যাশা অনেক। প্রতিশ্রুতিও অগণিত। তাই তো কবির ভাষায় বলতে হয়, ‘কথা ছিলো,/ দেশটা স্বাধীন হলে, দেশটা শকুনমুক্ত হলে একদিন সব বন্ধু মিলে জমিয়ে তাস নিয়ে বসবো, সারারাত ব্যাপী চলবে তাস খেলা। ভরদুপুরে মার্বেল নিয়ে বেড়িয়ে পড়বো মুক্ত আকাশের নিচে—টইটই করে যেদিকে ইচ্ছে চলে যাব।’ (অনেক কথা ছিল)
চির স্বপ্নচারী কবি আরিফুল ইসলাম কখনো কখনো বিপ্লবের সঙ্গে একসুতোয় বাঁধা পড়েন অবলীলায়। তার তীর্যক প্রতিবাদ, শ্লেষ ও হতাশার বহিঃপ্রকাশ লক্ষ্য করা যায় বেশ কয়েকটি কাব্যগ্রন্থে। কবির গোপন ব্যথা কিংবা মানসকন্যা মৌমিতা সেন থেকে হালের পথকলি, নির্যাতিত বোন, স্বদেশরক্ষাকারী অবহেলিত যোদ্ধা ও ব্যর্থ প্রেমিক কিংবা কবির প্রতিমূর্তি প্রতিফলিত হয়। কবি বলেছেন, ‘মৌমিতা,/ চলে যাওয়াটা কি এতই দরকার ছিল?/ ফিরে আসলেই বা কি এমন ক্ষতি হতো! এ জীবনে অনেককিছু ফিরে এসেছে, আসছে... শুধু তুমিটাই আসলে না।’ (মৌমিতারা আর ফিরে না)
পাঠককে স্মৃতিতাড়িত করার মতো কবিতা তার। মূলত কবির কোন কবিতা কোন পাঠকের ভালো লাগবে, এটা কবিও হয়তো জানেন না। জানেন না পাঠক নিজেও। হয়তো পড়তে পড়তে কোনো কালে মোহাবিষ্ট হয়ে পড়েন। কবি বলেছেন,‘আজ অনেকদিন পর, উলঙ্গ পা-দু’টো মাটিকে স্পর্শ করেছে! একদিন হয়তো,/ উলঙ্গ শরীরটাকেই স্পর্শ করবে মাটি।’
কবির বোধ পাঠককে ভাবনার অতলে নিয়ে যায়। ফিরে এসে রয়ে যায় দীর্ঘশ্বাস। আমি এই কবির মধ্যে অপার সম্ভাবনা দেখি। বেঁচে থাকার অনেক উপলক্ষ দেখি, যথেষ্ট কারণও দেখি। কবির ভাষায়,‘যদি হঠাৎ অপমৃত্যু আমায় বুকে টেনে নেয়!/ ভেবে নিও বন্ধু,/ কারো চোখের দৃষ্টি আমার গতিপথকে/ ভালোবেসেছিলো।’
তার কাব্যগ্রন্থে ঘুরেফিরে বাংলাদেশের স্বাধীনতা অর্জনের ইতিহাস, মানবতাবিরোধী অপরাধের প্রতি ঘৃণা, অবহেলিত মুক্তিযোদ্ধা ও বীরাঙ্গনাদের কথা এসেছে প্রবলভাবে। কবি বলেছেন,‘স্বাধীনতা তুই কোথায় থাকিস?/ কোন দিকে তোর আনাগোনা?’ (টোকাইয়ের স্বাধীনতা) অথবা‘দিন দিন গুম হয়ে যাচ্ছি.../ গুম হয়ে যাচ্ছে রক্তাক্ত স্বাধীনতা।’ (গুমের সাফ কথা) ফলে কবি দেশপ্রেমে উদ্বুদ্ধ হতে আহ্বান জানিয়েছেন,‘অন্ধকার। ঘুটঘুটে অন্ধকার।/ মানচিত্রের গায়ে উঁকুনের উৎপাত।/ কবিতার লাইনে দেশপ্রেমের আগুন নেই।’ (অল্প দেশপ্রেম)
সব মিলিয়ে তার সব কবিতাই প্রশংসার দাবিদার। তারপরও মুদ্রণজনিত কিছু ত্রুটি থেকে যায় গ্রন্থে। ছন্দ, উপমা, উৎপ্রেক্ষার যথাযথ ব্যবহারও বাঞ্ছনীয়। তবে আমি ভুলের বদলে ফুলের সৌরভেই মোহিত হয়েছি। আমি তার কবিতার বহুল পাঠ ও প্রচার কামনা করছি।
সবশেষে কবির সঙ্গে সুর মিলিয়ে বলতে হয়, ‘অদ্ভুত এক জীবন নিয়ে বেঁচে আছি। বেঁচে থাকা মানেই যদি জীবন হয়, তবে ভেবে নিও সুখে আছি। সুখে আছে প্রেম, মায়া ও সংসার।’ কবির কবিতার মতোই তার জীবন। অদ্ভুতভাবে বেঁচে আছেন তিনি। প্রেম ও সংসারের মাঝেই থিতু হয়ে আছেন কবিতায়। থিতু হয়ে আছেন সাহিত্যচর্চায়। অভাব থাকলেও অভিযোগ নেই। মন খারাপ থাকলেও প্রাণশক্তি প্রবল। এগিয়ে যাচ্ছেন সব প্রতিবন্ধতাকে উপেক্ষা করে।
এসইউ