নির্বাসন থেকে রাষ্ট্রের নেতৃত্বে
দেশের নতুন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান
বাংলাদেশের রাজনীতি মানেই উত্তাল ইতিহাস, আকস্মিক পতন আর অপ্রত্যাশিত প্রত্যাবর্তনের গল্প। বাংলাদেশের ৫৫ বছরের ইতিহাসে এটি কয়েকবার ঘটেছে। আজকের প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের ক্ষেত্রেও এটি ভিন্ন ছিল না। কিন্তু তারেক রহমানের জীবন যেন সেই ইতিহাসেরই এক জীবন্ত উপাখ্যান—ক্ষমতার প্রাসাদ থেকে কারাগার, সেখান থেকে দীর্ঘ নির্বাসন, আর অবশেষে সামনে থেকে নেতৃত্বে দিয়ে ত্রয়োদশ সংসদ নির্বাচনে দুই-তৃতীয়াংশ আসনে জয়। দেশের হাল ধরেছেন প্রধানমন্ত্রী হিসেবে।
শৈশব: রাষ্ট্রপতির সন্তান, যুদ্ধবীরের উত্তরাধিকার
১৯৬৫ সালের ২০ নভেম্বর জন্ম নেওয়া তারেক রহমান বেড়ে ওঠেন এমন এক পরিবারে, যার নাম উচ্চারণ হলেই বাংলাদেশের স্বাধীনতার স্মৃতি জেগে ওঠে। তার বাবা শহীদ প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রাহমান —মুক্তিযুদ্ধের বীর সেনানায়ক, বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর মেজর জেনারেল এবং পরবর্তীকালে রাষ্ট্রপতি। ১৯৭১ সালে স্বাধীনতার ঘোষণা পাঠ করে তিনি ইতিহাসের অংশ হয়ে যান। পরবর্তীতে তিনি প্রতিষ্ঠা করেন বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি), যা দ্রুত দেশের অন্যতম প্রধান রাজনৈতিক শক্তিতে পরিণত হয়।

রাষ্ট্রপতির সন্তান হিসেবে তারেক রহমানের শৈশব কেটেছে শৃঙ্খলা, নিরাপত্তা ও রাষ্ট্রীয় মর্যাদার পরিবেশে। ঢাকার বিএএফ শাহীন কলেজে প্রাথমিক শিক্ষা সম্পন্ন করার পর তিনি ১৯৮০-এর দশকে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিভাগে ভর্তি হন। বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়াকালীন তিনি সক্রেটিস, প্লেটো, অ্যারিস্টটল, হবস, লক, রুশো, ভলতেয়ার, কার্ল মার্কসসহ অন্যান্য অসাধারণ চিন্তাবিদদের রাজনৈতিক চিন্তাধারা অধ্যয়ন করেন।
অনেকেই ভাবতেন—তিনি হয়তো সামরিক বাহিনী বা প্রশাসনিক উচ্চপদে যাবেন। কিন্তু ইতিহাস তাকে টেনে নেয় রাজনীতির ভিন্ন এক স্রোতে।
আরও পড়ুন
তারেক রহমান সংসদ নেতা ও প্রধানমন্ত্রী
মন্ত্রিসভা গঠনে তারেক রহমানের সামনে ‘অভিজ্ঞতার হিসাব-নিকাশ’
দেড় বছর পর দায়িত্ব নিচ্ছে নির্বাচিত নতুন সরকার
বিপুল জনসমর্থনে তারেক রহমানের ম্যান্ডেটকে ‘ইতিবাচকভাবে’ দেখছে ভারত
একটি হত্যাকাণ্ড, এক পরিবারের পতন
১৯৮১ সালে চট্টগ্রামে এক সামরিক অভ্যুত্থানে জিয়াউর রহমান শহীদ হন। মাত্র ১৫ বছর বয়সে তারেক রহমান দেখলেন—রাষ্ট্রপতির বাড়ি মুহূর্তেই শোকের বাড়িতে পরিণত হলো। ক্ষমতা, প্রভাব, নিরাপত্তা—সব যেন হঠাৎ উবে গেল।
সেই সময় পরিবারটি রাজনৈতিকভাবে একঘরে হয়ে পড়ে। আর্থিক ও সামাজিক অনিশ্চয়তা ঘিরে ধরে তাদের জীবন। কৈশোরের স্বাভাবিক স্বপ্নগুলো চাপা পড়ে যায় দায়িত্ব ও বাস্তবতার ভারে।

শোক থেকে সংগ্রামে খালেদা জিয়া
স্বামী হত্যার পর দীর্ঘ সময় রাজনীতি থেকে দূরে ছিলেন খালেদা জিয়া। কিন্তু আশির দশকের শুরুতে, যখন দেশে সামরিক শাসন জারি, তখন দল ও কর্মীদের আহ্বানে তিনি রাজনীতিতে সক্রিয় হন। প্রথমে অনীহা থাকলেও ধীরে ধীরে তিনি স্বৈরাচার এরশাদবিরোধী আন্দোলনের অন্যতম মুখ হয়ে ওঠেন।
১৯৮৩ সালে আনুষ্ঠানিকভাবে বিএনপির নেতৃত্ব গ্রহণ করেন খালেদা জিয়া। রাজপথের আন্দোলন, গ্রেপ্তার, গৃহবন্দিত্ব—সব পেরিয়ে ১৯৯১ সালে তিনি দেশের প্রথম নারী প্রধানমন্ত্রী হন। তার উত্থান ছিল এক শোকাহত গৃহিণীর সংগ্রামী রূপান্তরের গল্প।
এই সময় থেকেই তারেক রহমান রাজনীতির ভেতরের পাঠ নিতে শুরু করেন—মায়ের পাশে থেকে, দলীয় নেতাদের সঙ্গে যোগাযোগ রেখে, সাংগঠনিক কাঠামো বুঝে।

তারেকের রাজনৈতিক পথচলা
নব্বইয়ের দশকে তারেক রহমান সক্রিয়ভাবে বিএনপির রাজনীতিতে যুক্ত হন। তৃণমূল পর্যায়ে সংগঠন শক্তিশালী করা, নতুন নেতৃত্ব গড়ে তোলা এবং যুবসমাজকে দলে সম্পৃক্ত করার ক্ষেত্রে তিনি ভূমিকা রাখেন। তিনি বিএনপির সিনিয়র যুগ্ম মহাসচিব পদে আসীন হন এবং ধীরে ধীরে দলীয় কৌশল নির্ধারণে প্রভাবশালী হয়ে ওঠেন।
তবে ২০০১-২০০৬ মেয়াদে বিএনপি নেতৃত্বাধীন চারদলীয় সরকারের সময় তারেক রহমানের বিরুদ্ধে দুর্নীতির অভিযোগ ওঠে। সমর্থকেরা বলেন, তিনি রাজনৈতিক প্রতিহিংসার শিকার। সমালোচকেরা বলেন, তিনি বিতর্কিত ক্ষমতার কেন্দ্র।

গ্রেপ্তার, নির্যাতন ও নির্বাসনের শুরু
রাজনৈতিক অনৈক্যের ফলে ২০০৭ সালে জরুরি অবস্থার সময় তারেক রহমানকে গ্রেপ্তার করা হয়। এ সময় রিমান্ডের নামে শারীরিক ও মানসিক নির্যাতন এবং কারাবাস তার শারীরিক অবস্থার অবনতি ঘটায় বলে বিএনপি অভিযোগ করে। অবশেষে ২০০৮ সালের ১১ সেপ্টেম্বর তিনি চিকিৎসার জন্য লন্ডনে যান। সেই যাত্রাই হয়ে ওঠে দীর্ঘ নির্বাসনের শুরু।
তবে লন্ডনের দিনগুলো সহজ ছিল না। মামলা, দণ্ড, দেশে ফেরার অনিশ্চয়তা—সব মিলিয়ে তিনি কার্যত নির্বাসিত জীবন কাটান। তবুও রাজনীতি ছাড়েননি তারেক রহমান।

২০১৮ সালে খালেদা জিয়া কারাবন্দী হলে তারেক রহমান বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান হন। লন্ডনের একটি বাড়ি থেকেই ভার্চুয়াল সভা, বক্তব্য, সাংগঠনিক নির্দেশনা দিয়ে দলকে সচল রাখেন। তখন টানা ক্ষমতায় ছিল শেখ হাসিনার নেতৃত্বাধীন আওয়ামী লীগ। সেই সময়কার নির্বাচন প্রক্রিয়া ও গণতান্ত্রিক পরিবেশ নিয়ে বিতর্ক ছিল তীব্র।
আরও পড়ুন
দুই দশক পর ফের চালকের আসনে বিএনপি, কীভাবে এলো এ জয়
সবার সঙ্গে পরামর্শ করে দেশ পরিচালনা করবেন তারেক রহমান: চরমোনাই পীর
ত্রয়োদশ সংসদ নির্বাচন নিয়ে যা বলছেন দেশি-বিদেশি বিশ্লেষকরা
তারেক রহমানের বগুড়া-৬ আসন শূন্য ঘোষণা
২০২৪ সালের জুলাইয়ে পরিবর্তনের হাওয়া
২০২৪ সালের জুলাইয়ে শিক্ষার্থীদের নেতৃত্বে আন্দোলন দেশের রাজনৈতিক দৃশ্যপট বদলে দেয়। দীর্ঘ ১৭ বছরের শাসনের অবসান ঘটে এবং তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা দেশ ছেড়ে ভারতে আশ্রয় নেন। পরিবর্তিত বাস্তবতায় অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান উপদেষ্টা হন নোবেলজয়ী অর্থনীতিবিদ অধ্যাপক ড. মুহাম্মদ ইউনুস। দেশের রাজনৈতিক পরিবেশে আসে মোড়।

নির্বাসন থেকে দেশের মাটিতে তারেক
প্রায় ১৭ বছর পর, ২০২৫ সালের ২৫ ডিসেম্বর তারেক রহমান দেশে ফেরেন। সেদিন রাজধানীতে লাখ লাখ মানুষের উপস্থিতি যেন জানিয়ে দেয়—নির্বাসনের অধ্যায় শেষ, শুরু নতুন পথচলা।
কিন্তু নির্মম নিয়তি আবারও আঘাত হানে। দেশে ফেরার মাত্র পাঁচ দিনের মাথায় মারা যান খালেদা জিয়া। একদিকে মায়ের শোক, অন্যদিকে দলের পূর্ণ দায়িত্ব—দুইয়ের ভার কাঁধে নিয়ে তিনি সামনে এগিয়ে যান।

নির্বাচনের ময়দান থেকে নেতৃত্বের শীর্ষে
দল পুনর্গঠন, প্রার্থী নির্বাচন, জোট সম্প্রসারণ—সবক্ষেত্রে সক্রিয় নেতৃত্ব দেন তারেক রহমান। গণতন্ত্র পুনঃপ্রতিষ্ঠা, প্রাতিষ্ঠানিক সংস্কার ও অর্থনৈতিক পুনরুদ্ধারের প্রতিশ্রুতি দিয়ে বিএনপি অংশ নেয় ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে।
ফলাফল—ভূমিধস বিজয়। নির্বাচনে বিএনপি জোট ২৯৭টির মধ্যে ২১২টিতে জিতেছে। সর্বাধিক আসন নিয়ে তারা সরকার গঠন করেছে এবং তারেক রহমানকে সংসদ নেতা ও প্রধানমন্ত্রী হিসেবে নির্বাচিত করেছে।
কৈশোরে পিতৃহত্যা, যৌবনে কারাবাস, মধ্যবয়সে নির্বাসন—সব পেরিয়ে তারেক রহমান আজ প্রধানমন্ত্রীর দায়িত্বে। মায়ের পথ অনুসরণ করে, কিন্তু নিজের অভিজ্ঞতার আলোয় গড়া এক ভিন্ন অধ্যায়ের সূচনা করলেন।
এক মানুষের গল্প, এক দেশের প্রতিচ্ছবি
তারেক রহমানের যাত্রা কেবল ব্যক্তিগত উত্থান–পতনের গল্প নয়। এটি বাংলাদেশের রাজনীতিরই প্রতিচ্ছবি—যেখানে শোক শক্তিতে রূপ নেয়, নির্বাসন প্রত্যাবর্তনের স্বপ্ন জাগায়, আর ইতিহাস কখনও সরলরেখায় এগোয় না।
নির্বাসন থেকে রাষ্ট্রক্ষমতার দোরগোড়ায়—এই পথচলা প্রমাণ করে, রাজনৈতিক জীবনে শেষ শব্দ বলে কিছু নেই। কখনও কখনও দীর্ঘতম রাতের পরই ভোর সবচেয়ে উজ্জ্বল হয়।
আইএইচও/এমএমএআর
টাইমলাইন
- ০৪:৩৩ পিএম, ১৭ ফেব্রুয়ারি ২০২৬ ৫০ জনের মন্ত্রিসভায় নতুন মুখ ৪১
- ০৪:২৯ পিএম, ১৭ ফেব্রুয়ারি ২০২৬ প্রতিমন্ত্রী হিসেবে শপথ নিলেন ২৪ জন
- ০৪:২২ পিএম, ১৭ ফেব্রুয়ারি ২০২৬ মন্ত্রী হিসেবে শপথ নিলেন ২৫ জন
- ০৪:১৬ পিএম, ১৭ ফেব্রুয়ারি ২০২৬ নির্বাসন থেকে রাষ্ট্রের নেতৃত্বে
- ০৪:১৪ পিএম, ১৭ ফেব্রুয়ারি ২০২৬ দেশের ১১তম প্রধানমন্ত্রী হলেন তারেক রহমান
- ০৩:৪৯ পিএম, ১৭ ফেব্রুয়ারি ২০২৬ যানজটের কারণে হেঁটে শপথ অনুষ্ঠানে গেলেন মন্ত্রিসভায় ডাক পাওয়া সদস্যরা
- ০৩:২৪ পিএম, ১৭ ফেব্রুয়ারি ২০২৬ সবচেয়ে বেশি মন্ত্রী পাচ্ছে চট্টগ্রাম বিভাগ, কম সিলেট
- ০২:২৪ পিএম, ১৭ ফেব্রুয়ারি ২০২৬ স্বাস্থ্য ও ডাক-টেলিযোগাযোগ প্রতিমন্ত্রী হচ্ছেন ড. মুহিত
- ০২:০৫ পিএম, ১৭ ফেব্রুয়ারি ২০২৬ বিএনপি সরকারের পূর্ণ মন্ত্রী হচ্ছেন ২৫ জন
- ০২:০১ পিএম, ১৭ ফেব্রুয়ারি ২০২৬ বিএনপি সরকারের নতুন মন্ত্রিসভায় কারা থাকছেন
- ০১:৫৪ পিএম, ১৭ ফেব্রুয়ারি ২০২৬ গঠিত হচ্ছে ৫০ সদস্যের মন্ত্রিসভা
- ০১:৫১ পিএম, ১৭ ফেব্রুয়ারি ২০২৬ প্রতিমন্ত্রী হিসেবে মন্ত্রিপরিষদে যাচ্ছেন যারা
- ০১:৫০ পিএম, ১৭ ফেব্রুয়ারি ২০২৬ খলিলুর রহমান টেকনোক্র্যাট মন্ত্রী হচ্ছেন
- ০১:৩৩ পিএম, ১৭ ফেব্রুয়ারি ২০২৬ মন্ত্রিসভায় ডাক পেয়েছেন ববি হাজ্জাজ
- ০১:২৫ পিএম, ১৭ ফেব্রুয়ারি ২০২৬ নতুন মন্ত্রীদের জন্য ৫০ গাড়ি গেলো সংসদ ভবনে
- ১২:৫৪ পিএম, ১৭ ফেব্রুয়ারি ২০২৬ মন্ত্রিসভার সদস্য হিসেবে শপথ নিচ্ছেন জাকারিয়া তাহের