বেকারত্ব, সংগ্রাম আর জাগো নিউজে ফিরে পাওয়া ভবিষ্যৎ

সাঈদ শিপন
সাঈদ শিপন সাঈদ শিপন , জ্যেষ্ঠ প্রতিবেদক
প্রকাশিত: ১২:১৮ পিএম, ১০ মে ২০২৬
জাগো নিউজের জ্যেষ্ঠ প্রতিবেদক সাঈদ শিপন

২০১৫ সালের এক শনিবার। অনলাইন গণমাধ্যম বাংলা নিউজ২৪ডটকম-এর সাপ্তাহিক মিটিং চলছে। মিটিং রুমের বাতাসে তখন চাপা উত্তেজনা। সেই মিটিংয়ে রিপোর্টিং বিভাগের শীর্ষ এক ব্যক্তির মিথ্যা বক্তব্য শুনে নিজের ভেতরের ক্ষোভ আর ধরে রাখতে পারিনি। প্রতিবাদ করেছিলাম সরাসরি, দৃঢ়ভাবে।

এমন প্রতিবাদ এর আগে প্রতিষ্ঠানের তৎকালীন সম্পাদক আলমগীর হোসেন ভাইয়ের সামনে কেউ করেননি। সেদিন মিটিং রুমে পাশে বসে থাকা জেসমিন পাপড়ি আপা বার বার আমাকে থামানোর চেষ্টা করেন।

প্রতিবাদের সেই মুহূর্তটি হয়তো ছিল আবেগের, কিন্তু সিদ্ধান্তটি ছিল কঠিন। পরদিনই ব্যক্তিগত কারণ দেখিয়ে পদত্যাগপত্র পাঠিয়ে দেয় ই-মেইলে। কর্তৃপক্ষও তাৎক্ষণিকভাবে সেটি গ্রহণ করে নেয়। সাংবাদিকতার জীবনে অনেক সিদ্ধান্ত মানুষ হিসাব করে নেয়, আবার কিছু সিদ্ধান্ত আসে আত্মসম্মান থেকে। সেটি ছিল তেমনই একটি সিদ্ধান্ত।

তখনকার চিফ রিপোর্টার সেরাজুল ইসলাম সেরাজ ভাই ঢাকার বাইরে ছিলেন। ঘটনাটি জানার দুদিন পর তিনি ফিরে এসে কিছুটা অভিমান, কিছুটা রাগ নিয়েই বলেছিলেন, ‘আমি নাই এই সময়ে আপনি চাকরি ছাড়লেন কেন? আগামীকাল থেকেই কাজে যোগ দেবেন, আমি আলমগীর ভাইয়ের সঙ্গে কথা বলছি।’

কিন্তু তখন সিদ্ধান্ত নিয়ে ফেলেছি, বাংলানিউজে আর ফিরবো না। তাই সেরাজ ভাইয়ের কথাও আর শোনা হয়নি।

চাকরি ছাড়ার সেই সময়টা জীবনের সবচেয়ে কঠিন অধ্যায়গুলোর একটি। কয়েক মাস আগেই বিয়ে করেছি। মাসখানেক আগে স্ত্রীকে ঢাকায় নিয়ে আসি। নতুন সংসার, নতুন স্বপ্ন, কিন্তু আয়ের নিশ্চয়তা নেই। একদিকে ঘরে নতুন বউ, অন্যদিকে বেকারত্বের চাপ। শহর ঢাকা তখন আরও কঠিন মনে হয়।

সেই দুঃসময়ে হাত বাড়িয়ে দেন দুই মানুষ। যোগাযোগ করি দ্য রিপোর্ট-এর সম্পাদক তৌহিদুল ইসলাম মিন্টু ভাইয়ের সঙ্গে। দুই বছর আগেই দ্য রিপোর্টের যাত্রার শুরুতে যোগ দেওয়ার একটি প্রস্তাব তিনি দিয়েছিলেন। মিন্টু ভাই কথা বলতে বলেন নির্বাহী সম্পাদক আমিরুল ইসলাম নয়ন ভাইয়ের সঙ্গে। নয়ন ভাইয়ের সঙ্গে পরিচয় আরও পুরোনো, শেয়ার নিউজ-এ কাজ করার সময়ও তিনি নির্বাহী সম্পাদক ছিলেন।

সম্পাদক ও নির্বাহী সম্পাদকের সেই আস্থার সম্পর্কই যেন তখন আশ্রয় হয়ে দাঁড়ায়। একদিনের মধ্যেই দ্য রিপোর্টে যোগ দেওয়ার ব্যবস্থা হয়ে যায়। জীবনের কঠিন সময়ে যারা পাশে দাঁড়ান, তাদের প্রতি কৃতজ্ঞতা কখনও ফুরায় না। আজও তাই মিন্টু ভাই ও নয়ন ভাইয়ের প্রতি রয়েছে গভীর শ্রদ্ধা আর চিরকৃতজ্ঞতা।

কিন্তু তখন দ্য রিপোর্টের অবস্থাও খুব স্থিতিশীল ছিল না। প্রতিষ্ঠানটি যেন টিকে থাকার লড়াই করছে। এর মধ্যেই দ্য রিপোর্ট ছেড়ে জাগো নিউজ-এ যোগ দেন সহকর্মী জাহাঙ্গীর আলম। কয়েকদিন পর তিনিই প্রস্তাব দেন জাগো নিউজে চলে আসার।

যোগাযোগ হয় জাগো নিউজের তৎকালীন প্রধান বার্তা সম্পাদক মহিউদ্দিন সরকার ভাইয়ের সঙ্গে। তিনি অফিসে যেতে বলেন। ২০১৬ সালের অক্টোবরের এক দুপুরে দেখা হয় তার সঙ্গে। খুব বেশি কথা নয়, মাত্র পাঁচ-দশ মিনিটের আলাপ। কিন্তু সেই আলাপের দুদিন পরই ফোন আসে ‘তুই আগামীকাল এসে জাগো নিউজে যোগ দে।’

সাংবাদিকতা পেশায় কখনও কখনও কিছু মানুষ অভিভাবকও হয়ে ওঠেন। মহিউদ্দিন ভাই ছিলেন তেমন একজন। তার কথামতো জাগো নিউজে যোগও দিলাম। কিন্তু দুদিন অফিস করার পর আবার ফিরে গেলাম দ্য রিপোর্টে। কারণ তখনকার জাগো নিউজের পরিবেশ মন ছুঁতে পারেনি।

তবে মহিউদ্দিন ভাই ছিলেন নাছোড়বান্দা। তিনি যেন ঠিক করেই রেখেছিলেন- এই মানুষটিকে জাগো নিউজে নিতেই হবে। একদিন ফোন দিয়ে বললেন, ‘তোর মোবাইল ও ল্যাপটপ হেড অফিস থেকে পাঠিয়েছে। তুই এখানে চলে আয়। আবেগ নিয়ে পড়ে থাকিস না, তোর ভবিষ্যৎ আছে।’

এই একটি বাক্যই যেন জীবনের মোড় ঘুরিয়ে দেয়। একদিকে মহিউদ্দিন ভাইয়ের নিরন্তর ডাক, অন্যদিকে দিন দিন খারাপ হতে থাকা দ্য রিপোর্টের পরিস্থিতি। একসময় প্রতিষ্ঠানটির সম্পাদক ও নির্বাহী সম্পাদকও বলে দিলেন ‘ভালো জায়গায় সুযোগ থাকলে চলে যান। এই প্রতিষ্ঠানের ভবিষ্যৎ নিয়ে আমরা সংশয়ে আছি।’

তারপর এক মাসের মাথায় আবার ফিরে আসা জাগো নিউজে। ২০১৬ সালের নভেম্বরে যোগদান। আর সেই ফিরে আসাটাই হয়ে যায় দীর্ঘ এক যাত্রার শুরু।

দেখতে দেখতে কেটে গেছে প্রায় এক দশক। এই সময়ে বদলেছে অনেক কিছু। বদলেছে নিউজরুম, প্রযুক্তি, সাংবাদিকতার ধরন, মানুষের অভ্যাস। কিন্তু কিছু সম্পর্ক সময়ের সঙ্গে আরও গভীর হয়। জাগো নিউজের সঙ্গে সম্পর্কটাও তেমনই।

একটি প্রতিষ্ঠান শুধু কর্মস্থল নয়, কখনও কখনও সেটি হয়ে ওঠে জীবনের অংশ। যেখানে কেটেছে অসংখ্য দিন-রাত, ভাঙা-গড়ার গল্প, সাফল্য-ব্যর্থতার স্মৃতি। যে প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে জড়িয়ে থাকে সন্তানের বেড়ে ওঠা, সংসারের হাসি-কান্না, জীবনের সবচেয়ে মূল্যবান সময়গুলো।

২০২১ সালের একদিন মহিউদ্দিন ভাই জাগো নিউজ ছেড়ে নতুন প্রতিষ্ঠান (ঢাকা পোস্ট) গড়ে তোলেন। সঙ্গে নিয়ে যান জাগো নিউজের বেশিরভাগ সহকর্মীকে। ভালো অফার ছিল আমারও। কি জানি একটানে সেদিন মহিউদ্দিন ভাইয়ের সঙ্গে না গিয়ে জাগো নিউজেই থেকে যাই।

এক ভঙ্গুর পরিস্থিতিতে জাগো নিউজের হাল ধরেন বর্তমান সম্পাদক কে. এম. জিয়াউল হক ভাই। সময়ের সঙ্গে তাল মিলিয়ে জাগো নিউজের কলেবর বৃদ্ধি পেয়েছে। টিমে যুক্ত হয়েছেন নতুন নতুন সদস্য। ‘বস্তুনিষ্ঠ সংবাদের অনলাইন ঠিকানা’ এই স্লোগান নিয়ে এগিয়ে চলেছে জাগো নিউজ।

হাঁটি হাঁটি পা পা করে আজ জাগো নিউজ ১২ বছরে পা দিয়েছে। আর এই দীর্ঘ যাত্রার প্রায় ১০ বছর পথচলার সঙ্গী হয়ে আছি। এই সময়ে পেরিয়ে গেছে অনেক চড়াই-উতরাই, এসেছে অসংখ্য চ্যালেঞ্জ। তবুও থেকে গেছে এক ধরনের আবেগ, এক ধরনের ভালোবাসা।

আজ জাগো নিউজের জন্মদিনে ফিরে তাকালে মনে হয়, সেই ২০১৫ সালের প্রতিবাদ, সেই বেকার দিনগুলো, নতুন সংসারের অনিশ্চয়তা, দ্য রিপোর্টের সংগ্রাম কিংবা মহিউদ্দিন ভাইয়ের ফোন সবকিছুই যেন জীবনের একেকটি ধাপ ছিল। প্রতিটি ধাপই এনে দাঁড় করিয়েছে আজকের এই জায়গায়।

সাংবাদিকতার পেশায় মানুষ প্রতিদিন খবর লিখেন, অন্যের গল্প বলে। কিন্তু নিজের জীবনের গল্পগুলো খুব কমই বলা হয়। অথচ সেই গল্পগুলোর ভেতরেই লুকিয়ে থাকে সংগ্রাম, আত্মসম্মান, ভালোবাসা আর টিকে থাকার ইতিহাস।

জাগো নিউজের এই ১২ বছরে তাই শুধু একটি প্রতিষ্ঠানের জন্মদিন নয়, উদযাপন হচ্ছে অসংখ্য মানুষের স্বপ্ন, পরিশ্রম আর সম্পর্কের গল্পও। আর সেই গল্পের এক নীরব অথচ গর্বিত অংশ হয়ে থাকার অনুভূতি নিঃসন্দেহে অনেক বড় প্রাপ্তি।

এমএএস/এমআইএইচএস

পাঠকপ্রিয় অনলাইন নিউজ পোর্টাল জাগোনিউজ২৪.কমে লিখতে পারেন আপনিও। লেখার বিষয় ফিচার, ভ্রমণ, লাইফস্টাইল, ক্যারিয়ার, তথ্যপ্রযুক্তি, ধর্ম, কৃষি ও প্রকৃতি। আজই আপনার লেখাটি পাঠিয়ে দিন [email protected] ঠিকানায়।