‘আবরার-রাজীবের মতো কারও প্রাণ না গেলে এখানে পদচারী সেতু হবে না’
- প্রগতি সরণির বাড্ডা লিংক রোড ও হোসেন মার্কেট অংশে রাস্তা পারাপারে প্রতিদিন ঘটছে দুর্ঘটনা
- এলাকাবাসী আবেদন করলে পদচারী সেতু নির্মাণে সম্ভাব্যতা যাচাই করা হবে: ডিএনসিসি প্রশাসক
রাজধানীর অন্যতম ব্যস্ত সড়ক প্রগতি সরণি। এখানে সড়কে নিয়মিত রিকশা-ভ্যান থেকে শুরু করে বাস-মিনিবাস, ট্রাক-পিকআপ চলাচল করে। এর সঙ্গে পাল্লা দিয়ে চলছে দূরপাল্লার বাস। দিন-রাত ২৪ ঘণ্টাই সড়কটিতে যানবাহনের তীব্র চাপ থাকে। অথচ প্রগতি সরণির কিছু অংশে রাস্তা পারাপারে নেই পর্যাপ্ত পদচারী সেতু।
পথচারীদের অভিযোগ, যানবাহনের চাপের মধ্যেই জীবনের ঝুঁকি নিয়ে সড়ক পারাপার হচ্ছেন তারা। এতে প্রতিদিনই ঘটছে দুর্ঘটনা। বিশেষ করে মধ্য বাড্ডা ও উত্তর বাড্ডার পথচারীদের দুর্ভোগ সবচেয়ে বেশি। তাই দুটি স্থানে পদচারী সেতুর দাবি জানিয়েছেন তারা।
স্থানীয় একটি বেসরকারি অফিসের চাকরিজীবী রায়হান আহমেদ জাগো নিউজকে বলেন, ‘প্রতিদিন অফিসের তাড়া থাকে। হোসেন মার্কেট স্টপেজে নেমে রাস্তা পার হতে হয়। প্রতিনিয়ত দুর্ঘটনা দেখি। মনে আবরার বা রাজীবের মতো কোনো ছাত্র বা ব্যক্তির প্রাণ না গেলে এখানে পদচারী সেতু হবে না।’
হোসেন মার্কেট থেকে রামপুরার দিকে কিছুটা এগোলেই গুলশান-বাড্ডা লিংক রোড। এখানের ক্রসিং দিয়ে প্রতি মিনিটে প্রচুর সংখ্যক পথচারী পার হন। এমনই একজন ইসরাফিল হোসেন জাগো নিউজকে বলেন, ‘মানুষ পারাপারের জন্য এখানে জ্যাম বেঁধে যায়। পারাপারের সময় গাড়িগুলো গতি কমাতে চায় না। দুর্ঘটনা ঘটে প্রায়ই। অথচ পাশের লিংক রোডের পদচারী সেতুতে কেউ ওঠেই না। তবে কারও প্রাণ না গেলে মনে হয় কর্তৃপক্ষের টনক নড়বে না।’
তবে পদচারী সেতু নির্মাণে স্থানীয় বাসিন্দাদের কাছ থেকে আবেদন পেলে তার সম্ভাব্যতা যাচাই করে ব্যবস্থা নেওয়া হবে বলে জানিয়েছে ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনের (ডিএনসিসি) সংশ্লিষ্টরা।
নগরের যেসব সড়কে পথচারীদের পারাপার বেশি ঝুঁকিপূর্ণ, এমন জায়গায় ক্রমেই পদচারী সেতু নির্মাণ করা হচ্ছে। প্রগতি সরণিতে আরও পদচারী সেতুর চাহিদা থাকলে এলাকাবাসীর পক্ষ থেকে আবেদন পেলে আমরা সম্ভাব্যতা যাচাই করে অবশ্যই ব্যবস্থা নেবো।-ডিএনসিসির প্রশাসক শফিকুল ইসলাম খান
তারা জানান, পথচারীদের চাহিদার ভিত্তিতে এরই মধ্যে প্রগতি সরণিতে নতুন চারটি পদচারী সেতু নির্মাণের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। এর মধ্যে প্রগতি সরণির ইস্ট-ওয়েস্ট ইউনির্ভাসিটি ও ব্র্যাক ইউনির্ভাসিটি সংলগ্ন একটি পদচারী সেতু নির্মাণ করা হয়েছে। এছাড়া শাহজাদপুরের কনফিডেন্স সেন্টার, বারিধারা জে ব্লকে আলাদা তিনটি পদচারী সেতু নির্মাণাধীন। এখন নতুন করে কোথাও চাহিদা থাকলে তাও বিবেচনা করা হবে।
রাজধানীর কুড়িল থেকে মালিবাগ পর্যন্ত প্রায় ১১ কিলোমিটার দৈর্ঘ্য প্রগতি সরণির। সরেজমিনে দেখা যায়, এখন সড়কের যমুনা ফিউচার পার্কের সামনে একটি, নর্দ্দা মোড়ে একটি, নতুন বাজারে দুটি, উত্তর বাড্ডায় একটি, দক্ষিণ বাড্ডায় একটি, মালিবাগ আবুল হোটেল এলাকায় একটি পদচারী সেতু রয়েছে। এসব পদচারী সেতু দিয়ে অসংখ্য মানুষ পারাপার হচ্ছেন।
আবার ভিন্ন চিত্র দেখা গেছে প্রগতি সরণির মধ্য বাড্ডার লিংক রোড অংশে, উত্তর বাড্ডার হোসেন মার্কেটের সামনে। এসব স্থানে ব্যস্ত সড়কে ঝুঁকি নিয়ে পারাপার হচ্ছেন হাজারো পথচারী।

এর মধ্যে বাড্ডা লিংক রোড সংলগ্ন ইসলামিয়া চক্ষু হাসপাতালের সামনে সড়ক পারাপারে সবচেয়ে বেশি ঝুঁকি দেখা গেছে। এখানে সড়কে জেব্রা ক্রসিং আছে। কিন্তু ট্রাফিক সিগন্যাল বা ট্রাফিক পুলিশ নেই। দ্রুতগতিতে ছুটে চলা যানবাহনের সামনে দিয়েই পথচারীরা রাস্তা পার হচ্ছেন।
মধ্য বাড্ডার হোসেন মার্কেট সিগন্যালে গিয়েও দেখা যায় একই চিত্র। ঝুঁকি নিয়ে সড়ক পার হচ্ছেন পথচারীরা। কিন্তু এখানে সিটি করপোরেশনের জেব্রা ক্রসিং ও ট্রাফিক সিগন্যাল নেই। দুই পাশ থেকে হাতের ইশারায় যানবাহনের গতি কমিয়ে শত শত পথচারীকে সড়ক পার হতে দেখা যায়। কারও কারও এমন হয়েছে যে এক সেকেন্ড হিসাব এদিক-সেদিক হলেই ঘটে যেত দুর্ঘটনা।
আরও পড়ুন
ঢাকাকে ‘ক্লিন ও গ্রিন সিটি’ করতে সরকারের ১২ কর্মপরিকল্পনা
গুলশান-বনানী-বারিধারার ৮৫ শতাংশ বাড়ির পয়ঃবর্জ্য পড়ছে লেকে
দেশে প্রতি হাজার কিলোমিটার সড়কে বছরে প্রাণ হারান ৬৭ জন
লিংক রোডের ক্রসিং দিয়ে নিয়মিত চলাচল করা বেসরকারি চাকরিজীবী জাহিদ আলম বলেন, ‘জীবনের ঝুঁকি নিয়ে নিয়মিত এই সড়ক পার হতে হয়। কোনো বাহন হাত উঁচু করলেও থামতে চায় না। গায়ের ওপর চলে আসে। প্রতি ঘণ্টায় এখান দিয়ে হাজারো মানুষ এভাবে সড়ক পার হয়। কিন্তু সিটি করপোরেশন এখানে পদচারী সেতু নির্মাণ করছে না।’
গুলশানের একটি বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের কর্মকর্তা বাড্ডার আদর্শ নগরের বাসিন্দা মিরাজুল ইসলাম। গত ৩ মে সকালে মধ্যবাড্ডার প্রগতি সরণি পার হয়ে অফিসে যাচ্ছিলেন তিনি। আলাপকালে মিরাজুল বলেন, ‘প্রতিদিন ঝুঁকি নিয়ে প্রগতি সরণি পার হয়ে অফিসে যাওয়া-আসা করতে হয়। এতে প্রায়ই পথচারীদের দুর্ঘটনার কবলে পড়তে দেখি। কোনদিন যে নিজে দুর্ঘটনার শিকার হই, এ আতঙ্ক মনে কাজ করে। দ্রুত বাড্ডা লিংক রোড সংলগ্ন প্রগতি সরণি ও হোসেন মার্কেটের সামনে পদচারী সেতু নির্মাণ করতে হবে।’
জীবন না গেলে মেলে না পদচারী সেতু
২০১৯ সালের ১৯ মার্চ। রাজধানীর বসুন্ধরা আবাসিক এলাকার গেটের অন্য পাশে রাস্তা পারের জন্য দাঁড়িয়ে ছিলেন বাংলাদেশ ইউনিভার্সিটি অব প্রফেশনালসের (বিইউপি) ছাত্র আবরার আহাম্মেদ চৌধুরী। বেপরোয়া গতিতে এসে সুপ্রভাত পরিবহনের একটি বাস তাকে চাপা দিলে ঘটনাস্থলেই নিহত হন। এর দুদিন পর ওই স্থানে ফুটওভারব্রিজের ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন করেন সাবেক মেয়র আতিকুল ইসলাম।

প্রগতি সরণির যমুনা ফিউচার পার্ক সংলগ্ন জায়গাটিতে একটি পদচারী সেতুর দাবি ছিল দীর্ঘদিনের। কয়েকটি বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়, যমুনা ফিউচার পার্কের মতো বড় শপিংমল, বসুন্ধরার মতো কয়েক লাখ মানুষ বসবাস করা আবাসিক এলাকা থাকায় প্রচুর মানুষ সেখানে প্রতিদিন রাস্তা পারাপার করে। অথচ একটি পদচারী সেতু পাওয়ার জন্য আবরারের জীবন যাওয়া পর্যন্ত অপেক্ষা করতে হয়।
ব্রিজটি কতটা প্রয়োজন ছিল তা স্পষ্ট হয় উদ্বোধনের কয়েকদিনের মধ্যে ছড়িয়ে পড়া কয়েকটি ছবিতে। সেখানে দেখা যায়, ফুটওভারব্রিজজুড়ে শুধু মানুষ, সিঁড়িতে দীর্ঘ লাইন ধরে উঠছে মানুষ। এই বিপুল সংখ্যক মানুষ এতদিন জীবনের ঝুঁকি নিয়েই রাস্তা পার হতো।
এমন ঘটনা রয়েছে আরও কয়েকটি। ২০১৮ সালের ২৯ জুলাই দুই বাসের রেষারেষিতে নিহত হন শহীদ রমিজ উদ্দীন ক্যান্টনমেন্ট স্কুল অ্যান্ড কলেজের দুই শিক্ষার্থী রাজীব ও দিয়া। সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার নির্দেশে পরে সেখানে আন্ডারপাস স্থাপন করা হয়।

পথচারীরা বলছেন, আবরার, রাজীবদের মতো কারও প্রাণ না গেলে এখানে পদচারী সেতু দেবে না সিটি করপোরেশন।
আরও পড়ুন
ঢাকা উত্তরে হচ্ছে নতুন ৩৬ পদচারী সেতু, ৮টিতে চলন্ত সিঁড়ি
বাসে যাত্রী তুলতে গিয়ে চাকায় পিষ্ট হয়ে হেলপারের মৃত্যু
অচল সড়কবাতি, ‘ভুতুড়ে’ লিংক রোডে আতঙ্ক
ডিএনসিসির প্রকৌশল বিভাগ সূত্র জানায়, ২০১৯ সালের মার্চে প্রগতি সরণিতে সড়ক দুর্ঘটনায় একটি বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র আবরার আহমেদ চৌধুরী নিহত হন। ওই ঘটনায় পর নগরের গুরুত্বপূর্ণ স্থানে পদচারী সেতু এবং চলন্ত সিঁড়ি নির্মাণে প্রকল্প তৈরির নির্দেশনা দিয়েছিলেন সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। সে অনুযায়ী ২০২০ সালের ৩ জানুয়ারি ৩৬টি পদচারী সেতু নির্মাণে ‘ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশন এলাকায় ট্রাফিক অবকাঠামো উন্নয়নসহ সড়ক নিরাপত্তা প্রকল্পের’ প্রশাসনিক অনুমোদন দেয় স্থানীয় সরকার বিভাগ। এ প্রকল্পে ব্যয় ধরা হয়েছে ৩১৯ কোটি ২৩ লাখ সাত হাজার টাকা।
এ প্রকল্পের অধীনে নগরের বিভিন্ন স্থানে অধিকাংশ পদচারী সেতু নির্মাণ করা হয়েছে। এখন প্রগতি সরণির ইস্ট-ওয়েস্ট ইউনির্ভাসিটি ও ব্র্যাক ইউনির্ভাসিটি সংলগ্ন একটি পদচারী সেতু নির্মাণ করা হয়েছে। এছাড়া শাহজাদপুরের কনফিডেন্স সেন্টার, বারিধারা জে ব্লকে আলাদা তিনটি পদচারী সেতু নির্মাণাধীন।

জানতে চাইলে ডিএনসিসির প্রশাসক শফিকুল ইসলাম খান জাগো নিউজকে বলেন, ‘নগরের যেসব সড়কে পথচারীদের পারাপার বেশি ঝুঁকিপূর্ণ, এমন জায়গায় ক্রমেই পদচারী সেতু নির্মাণ করা হচ্ছে। প্রগতি সরণিতে আরও পদচারী সেতুর চাহিদা থাকলে এলাকাবাসীর পক্ষ থেকে আবেদন পেলে আমরা সম্ভাব্যতা যাচাই করে অবশ্যই ব্যবস্থা নেবো।’
এমএমএ/এমআইএইচএস/এএসএ/এমএফএ