গোপন বন্দিশালার আলামত প্রতিটি বাহিনীই ধ্বংস করেছে: গুম কমিশন
দেশে গোপন বন্দিশালার আলামত কমবেশি প্রতিটি বাহিনীই ধ্বংস করেছে বলে জানিয়েছে গুম-সংক্রান্ত তদন্ত কমিশন।
সোমবার (৫ জানুয়ারি) রাজধানীর গুলশানে কমিশন কার্যালয়ে আয়োজিত সংবাদ সম্মেলনে এক প্রশ্নের জবাবে এর সভাপতি অবসরপ্রাপ্ত বিচারপতি মাইনুল ইসলাম চৌধুরী এ কথা বলেন।
কোন বাহিনী সবচেয়ে বেশি গোপন বন্দিশালার আলামত ধ্বংস করেছে- জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘কমবেশি প্রতিটি বাহিনীই ধ্বংস করেছে। লিখিতভাবে এ বিষয়ে জানানো হয়েছে। পরিদর্শনের পর আর কিছু যাতে ধ্বংস করা না হয় সেক্ষেত্রে আমরা বলেছি।’
প্রথম দিকে কমিশনের অনেক চ্যালেঞ্জ ছিল উল্লেখ করে সভাপতি জানান, পরে সবাই সহযোগিতা করেছে।
মাইনুল ইসলাম বলেন, দেশের বিভিন্ন জেলায় গোপন বন্দিশালার সন্ধান পাওয়া মাত্রই কমিশন তা পরিদর্শন করে এগুলো অপরিবর্তিত অবস্থায় রাখার নির্দেশনা দেয়। কমিশন গঠনের কয়েক সপ্তাহের মধ্যেই প্রতিরক্ষা গোয়েন্দা মহাপরিদপ্তরের (ডিজিএফআই) জয়েন্ট ইন্টারোগেশন সেল (জেআইসি) বা আয়নাঘর এবং র্যাব সদর দপ্তরের টাস্ক ফোর্স ফর ইন্টারোগেশন সেল (টিএফআইসি) পরিদর্শন করে আলামত ধ্বংসের প্রক্রিয়া তাৎক্ষণিকভাবে বন্ধের নির্দেশ দেওয়া হয়। পরে ২০২৫ সালের ১২ ফেব্রুয়ারি সংশ্লিষ্ট ভুক্তভোগীদের উপস্থিতিতে প্রধান উপদেষ্টা ও উপদেষ্টা পরিষদের কয়েকজন সদস্য এ দুটিসহ মোট তিনটি গোপন বন্দিশালা পরিদর্শন করেন।
কমিশন সভাপতি বলেন, ‘আমাদের দেশের গোয়ন্দা সংস্থাগুলো অভ্যন্তরীণ রাজনীতিতে নাক গলায়, কারণ তারা ক্ষমতার অংশ হতে চায়। গোয়ন্দা সংস্থাগুলোকে অপব্যবহার করা হয়েছে। এস আলমের পক্ষে ডিজিএফআই গিয়ে ইসলামী ব্যাংক দখল করেছে। এটা কি ডিজিএফআইয়ের কাজ ছিল? বা মিডিয়া হাউজ দখল করা কি কোনো গোয়েন্দা সংস্থা বা ডিজিএফআইয়ের কাজ? তাদের নানাভাবে অপব্যবহার করা হয়েছে। আগের সরকারগুলো এবং সদ্য বিদায়ী সরকার, সবাই তাদের অপব্যবহার করেছে। তবে সদ্য বিদায়ী সরকার অনেক বেশি করেছে। সে প্রবণতা থেকে বেরিয়ে আসতে হবে।’
এক প্রশ্নের জবাবে তিনি মত দেন, পুলিশের কাজ হচ্ছে দেশের ভেতরে আইনশৃঙ্খলা রক্ষা করা। আর সেনাবাহিনীর কাজ হচ্ছে ক্যান্টনমেন্টের থেকে প্রশিক্ষণ নেওয়া, যুদ্ধের জন্য প্রস্তুতি গ্রহণ ও নতুন নতুন যুদ্ধ কৌশল রপ্ত করা। আইনশৃঙ্খলা রক্ষা করা সেনা কর্মকর্তাদের কাজ নয়। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী ও বেসামরিক গোয়েন্দা সংস্থাগুলো থেকে তাদের প্রত্যাহার করতে হবে। বরং পুলিশের মধ্য থেকে দক্ষ কর্মকর্তাদের নিয়ে একটি এলিট ফোর্স গঠন করা যেতে পারে।
দেশে ডিজিএফআই থাকা প্রয়োজন উল্লেখ করে মাইনুল ইসলাম বলেন, ডিজিএফআই ও জাতীয় নিরাপত্তা গোয়েন্দার (এনএসআই) সংস্কার দরকার। যাতে তাদের কাজ ছেড়ে অন্য কাজ না করে, রাজনীতিতে নাক না গলায়।
সংবাদ সম্মেলনে জানানো হয়, কমিশনে জমা করা ১ হাজার ৯১৩টি অভিযোগের মধ্যে একাধিকবার করা ২৩১টি এবং যাচাই-বাছাই ও প্রাথমিক তদন্তের পর গুমের সংজ্ঞার বহির্ভূত বিবেচনায় ১১৩টি অভিযোগ বাতিল করা হয়। ফলে মোট ১ হাজার ৫৬৯টি অভিযোগ কমিশনের সক্রিয় বিবেচনায় ছিল।
এসব অভিযোগের মধ্যে ২৫১ জন গুম এবং ৩৬ জনের গুম পরবর্তী মরদেহ উদ্ধার হয়। নিখোঁজদের অবস্থান নির্ধারণে কমিশন সংশ্লিষ্ট বর্তমান ও সাবেক কর্মকর্তা, সন্দেহভাজন ব্যক্তি, আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্য এবং বেসামরিক সাক্ষীসহ মোট ২২২ জনকে জিজ্ঞাসাবাদ করে। পাশাপাশি ৭৬৫ জন গুমের শিকার ও তাদের পরিবারের সদস্যদের একাধিকবার সাক্ষাৎকার নেওয়া হয়।
সংবাদ সম্মেলনে উপস্থিত ছিলেন কমিশনের সদস্য বিচারপতি মো. ফরিদ আহমেদ শিবলী, নূর খান লিটন, নাবিলা ইদ্রিস ও সাজ্জাদ হোসেন।
টিটি/একিউএফ/এএসএম