সম্প্রীতির মেলবন্ধন সাকরাইন উৎসবের অপেক্ষায় পুরান ঢাকা
• সনাতন ধর্মাবলম্বীদের ঘরে হয় ‘বুড়ো-বুড়ির পূজা’
• পাটিসাপটা, চিতই আর ভাপা পিঠা তৈরি হয়
• ভোর থেকে আকাশে ঘুড়ি ওড়ানোর লড়াই শুরু
• গভীর রাতে থাকে আতশবাজির ঝলকানি
• চলে ডিজে পার্টি ও সাউন্ড সিস্টেমে গান
পৌষের বিদায় আর মাঘের আবাহন- প্রকৃতির এই সন্ধিক্ষণে পুরান ঢাকাজুড়ে এখন সাজ সাজ রব। বুধবার (১৪ জানুয়ারি) এখানে উদ্যাপিত হচ্ছে ঐতিহ্যবাহী সাকরাইন বা পৌষ সংক্রান্তি। অনেকের কাছে যা আবার ঘুড়ি উৎসব হিসেবে পরিচিত। এদিন আকাশে ডানা মেলবে রঙিন কাগজের হাজারো ঘুড়ি। এগুলোর মতোই উৎসব ঘিরে আকাশচুম্বী হবে সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি- তেমনটাই চাওয়া স্থানীয় বাসিন্দাদের।
সময়ের পরিক্রমায় সাকরাইন এখন কেবল সনাতন ধর্মাবলম্বীদের আচার পালনের দিনক্ষণ নয়, এটি পুরান ঢাকাবাসীর সংস্কৃতি আর সর্বজনীন মহোৎসবে পরিণত হয়েছে। ভোরের কুয়াশাভেজা আকাশে ঘুড়ি ওড়ানোর লড়াই থেকে যে উৎসবের শুরু হয়, তার সমাপ্তি টানে গভীর রাতে আতশবাজির ঝলকানি। সব মিলিয়ে এক উন্মাতাল আনন্দে মেতে ওঠে বুড়িগঙ্গা পাড়ের এই প্রাচীন জনপদ।

আরও পড়ুন
ঘুড়ি ওড়ালে জেল জরিমানা হয় যে দেশে
পাকিস্তানের পাঞ্জাবে ঘুড়ি উড়ানো নিয়ন্ত্রণে কঠোর আইন পাস
বারবার ঘুড়ি ও ফানুস পড়ে ব্যাহত হচ্ছে মেট্রোর চলাচল
সাকরাইনের শেকড় প্রোথিত মূলত প্রাচীন ভারতের মকর সংক্রান্তিতে। জ্যোতিষশাস্ত্রমতে, সূর্য এদিন মকর রাশিতে প্রবেশ করে উত্তর গোলার্ধের দিকে যাত্রা শুরু করে। পুরান ঢাকার সনাতন ধর্মাবলম্বীদের কাছে এটি অত্যন্ত পবিত্র। এদিন ঘরে ঘরে চলে ‘বুড়ো-বুড়ির পূজা’ ও বিশেষ প্রার্থনা।
উৎসবে ‘বুড়ো-বুড়ির পূজা’ শেষে যখন প্রসাদ আর পিঠা বিলি করা হয়, তখন পাড়ার হিন্দু-মুসলিম সবাই একসঙ্গে মিলে আনন্দ করেন। ধর্মীয় আচার পেরিয়ে সাকরাইন এখন এক সর্বজনীন মহোৎসব।- শাঁখারীবাজারের প্রবীণ বাসিন্দা রতন সাহা
শাঁখারীবাজারের প্রবীণ বাসিন্দা রতন সাহা জাগো নিউজকে বলেন, ‘আমাদের ছোটবেলায় সাকরাইন মানে ছিল শুধুই ঘুড়ি আর পিঠা। এখন এটি অনেক বড় আকার নিয়েছে। এদিন আমাদের বিশেষ প্রার্থনায় পূর্বপুরুষদের স্মরণ করা হয় আর রাতে চলে আতশবাজির খেলা।’

তিনি জানান, আগে প্রতিটি বাড়িতে মুড়ি-মুড়কির মোয়া আর তিলের খাজা বানানো হতো। এখনো সেই ঐতিহ্য আছে। উৎসবে ‘বুড়ো-বুড়ির পূজা’ শেষে যখন প্রসাদ আর পিঠা বিলি করা হয়, তখন পাড়ার হিন্দু-মুসলিম সবাই একসঙ্গে মিলে আনন্দ করেন। ধর্মীয় আচার পেরিয়ে সাকরাইন এখন এক সর্বজনীন মহোৎসব।
আকাশে ঘুড়ির লড়াই
উৎসবের মূল আকর্ষণ দিনব্যাপী ঘুড়ি ওড়ানোর প্রতিযোগিতা। সকাল থেকেই ‘ভোকাট্টা’ শব্দ ভেসে আসতে থাকে সূত্রাপুর, শাঁখারীবাজার আর গেণ্ডারিয়ার অলিগলি থেকে।
সাকরাইন এখনো শুরু না হলেও, মুক্ত আকাশের দিকে তাকালেই কোথাও না কোথাও চোখ পড়বে ঘুড়ি। পুরান ঢাকার ঘিঞ্জি এলাকার বাড়ির ছাদ থেকে শিশু-কিশোররা মিলেমিশে ওড়াচ্ছে নানান রঙের ঘুড়ি।
আকাশে ওড়া রঙিন ঘুড়িগুলোর মতোই আমাদের সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি যেন আকাশচুম্বী হয়। ঘুড়ির সুতায় যেমন কাটাকাটির লড়াই চলে, ঠিক সেভাবেই সমাজ থেকে সব হিংসা আর বিদ্বেষ কেটে যাক।- কলতাবাজার পঞ্চায়েত সদস্য আবদুস সাত্তার
সূত্রাপুরের বাসিন্দা ফয়সাল আহমেদ বলেন, ‘আমাদের কাছে সাকরাইন মানে হলো আকাশের দখল নেওয়া। কার ঘুড়ি কারটা কাটবে, সুতায় কার মাঞ্জা কত কড়া, এনিয়ে মাসখানেক ধরে প্রস্তুতি নিই। সুতা কাটার পর ওই যে সম্মিলিত চিৎকার, এটাই আমাদের সাকরাইন উৎসবের সার্থকতা।’

পিঠাপুলি ও আতিথেয়তা
ঘুড়ি ওড়ানোর উত্তেজনার সমান্তরালে এদিন প্রতিটি ঘরে চলে ভোজ। সাকরাইন মানেই নতুন চালের গুঁড়োয় তৈরি বাহারি পিঠা। আমন্ত্রণ জানানো হয়, শহরের অন্যপ্রান্তে থাকা স্বজনদেরও।
আরও পড়ুন
চট্টগ্রামের ডিসি পার্কে ফুলের পসরা দেখতে দর্শনার্থীদের ঢল
মৌলভীবাজারে শতবর্ষী মাছের মেলা
দুই দলের আয়োজনে সেলিম আল দীন স্মরণোৎসব
লালবাগের গৃহবধূ জমিলা খাতুন বলেন, ‘সকালে ঘুড়ি ওড়ানো শুরু হওয়ার আগেই আমরা পাটিসাপটা, চিতই আর ভাপা পিঠার আয়োজন শেষ করি। ছাদে যখন ছেলেরা ঘুড়ি ওড়ায়, তখন সেখানে বড় বড় থালায় করে গরম গরম পিঠা আর চা নিয়ে যাওয়া আমাদের পুরোনো রীতি। এটা ছাড়া উৎসব অপূর্ণ।’
অলিগলিতে ঘুড়ি-নাটাই বিক্রি
পুরান ঢাকার প্রধান সড়কসহ প্রায় প্রতিটি অলিগলির দোকানে এখন কম বেশি ঘুড়ি-নাটাই কেনাবেচা চলছে। অনেকে আবার স্বল্প পুঁজিতে ফুটপাতে মৌসুমি ব্যবসার পসরা বসিয়েছেন। এক্ষেত্রে হাতে হাজার দশেক টাকা থাকলেই কেনাবেচা শুরু করা যায়, বলেন ব্যবসায়ীরা।
উৎসবের প্রাণকেন্দ্র হিসেবে পরিচিত শাঁখারীবাজারে মঙ্গলবার (১৩ জানুয়ারি) গিয়ে দেখা যায়, অলিগলি এখন নাটাই-সুতার দখলে। সারাবছর এখানকার দোকানগুলোতে শঙ্খ, পূজার বিভিন্ন অনুষঙ্গ, কাপড়, কাঁসা-পিতলের তৈজসপত্র, হারমোনিয়াম-বাঁশি, গিটারসহ অন্য নির্দিষ্ট পণ্য থাকলেও সাকরাইন উপলক্ষে এখন সবই ঘুড়ির দোকান।
এবার কাগজের দাম বাড়ায় ঘুড়ির দাম গতবারের চেয়ে ২-৪ টাকা বেশি। তবে বিক্রি কমেনি। মানুষ শখ করে ২০০-৩০০ টাকার নকশা করা ঘুড়িও নিচ্ছে। কারিগর ও বিক্রেতাদের এখন দম ফেলার সময় নেই।- ব্যবসায়ী নিখিল সেন
দীর্ঘ ২০ বছর ধরে এ ব্যবসায় জড়িত নিখিল সেন জাগো নিউজকে জানান, এবার কাগজের দাম বাড়ায় ঘুড়ির দাম গতবারের চেয়ে ২-৪ টাকা বেশি। তবে বিক্রি কমেনি। মানুষ শখ করে ২০০-৩০০ টাকার নকশা করা ঘুড়িও নিচ্ছে। কারিগর ও বিক্রেতাদের এখন দম ফেলার সময় নেই।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে আসা শিক্ষার্থী আরমান আলী বলেন, ‘শাঁখারীবাজারের মাঞ্জা দেওয়া সুতার কোনো তুলনা নেই। বন্ধুদের নিয়ে একটা বড় দল আসছি, যাতে একবারে সব কেনা যায়। এখানে যেমন নানা ধরনের ঘুড়ি ও সুতা পাওয়া যায়, তেমন সস্তাও।’
ধূপখোলা মাঠের আশপাশেও অনেকগুলো ঘুড়ি-নাটাইয়ের দোকান দেখা গেছে। সেখানকার বিক্রেতা সুবল চন্দ্র বলেন, ‘এবার ঘুড়ির ডিজাইনে নতুনত্ব এসেছে। মানুষ শুধু ওড়াতে নয়, নানা রকমের ঘুড়ি দিয়ে ঘর সাজাতেও পছন্দ করে।’
দোকানগুলোতে মানভেদে সাধারণ প্লাস্টিক ও কাগজের ঘুড়ি ১২ থেকে ২০ টাকায় মিলছে। তবে বিশেষ চোখাদার, পানদার বা চিল ঘুড়ি নকশা অনুযায়ী ২০০ থেকে ২৫০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে। সুতার বাজারে এবার চায়না মাঞ্জা সুতার বেশ চাহিদা। মাঞ্জা দেওয়া ১০০ গজ চায়না সুতা ৫০ টাকা এবং ভারতীয় সুতা ৪০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে। অন্যদিকে, কারুকাজ করা বড় নাটাইগুলো ৫০০ টাকায় বিক্রি হতে দেখা গেছে।
সাউন্ড সিস্টেম ও আলোকসজ্জা
সাকরাইনের দিন বিকেল গড়িয়ে সন্ধ্যা নামলেই বুড়িগঙ্গা পাড়ের পুরান ঢাকার রূপ পাল্টে যায়। বর্তমানে ডিজে পার্টি এবং সাউন্ড সিস্টেম এ উৎসবের অবিচ্ছেদ্য অংশ হয়ে দাঁড়িয়েছে।
সাউন্ড সিস্টেম ব্যবসায়ী মো. রাজু বলেন, ‘সাকরাইনের মাসখানেক আগে থেকেই আমাদের ডায়েরি ফুল। হাজারীবাগ থেকে শুরু করে সূত্রাপুর- সব এলাকার ছাদ থেকে বুকিং এসেছে। দিনরাত এক করে আমরা ছাদে ছাদে সিস্টেম বসানোর কাজ করছি।’
সময়ের সঙ্গে সঙ্গে এ উৎসবে যোগ হয়েছে আরও অনেক কিছু। এখন সাকরাইনের রাতের অন্যতম আকর্ষণ আতশবাজি। প্রকাশ্যে কড়াকড়ি থাকলেও গলির মোড়ে মোড়ে চলছে ইশারায় আতশবাজি কেনাবেচা।
সাকরাইন উৎসবের সর্বজনীনতা ও ঐতিহ্য নিয়ে কলতাবাজার পঞ্চায়েত সদস্য আবদুস সাত্তার জাগো নিউজকে বলেন, ‘সাকরাইন এখন কেবল একটি উৎসব নয়, অস্তিত্বের অংশ। একসময় যা হিন্দু ধর্মাবলম্বীদের বুড়ো-বুড়ির পূজা আর সংক্রান্তির আচারের মধ্যে শুরু হয়েছিল, এখন তা সবার প্রাণের উৎসবে রূপ নিয়েছে। শাঁখারীবাজার থেকে সুতা-নাটাই কেনা বা ছাদে উঠে পিঠাপুলির আসর জমানোর মধ্যে কোনো ধর্মের দেওয়াল দেখি না। আমাদের প্রত্যাশা, আকাশে ওড়া রঙিন ঘুড়িগুলোর মতোই আমাদের সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি যেন আকাশচুম্বী হয়। ঘুড়ির সুতায় যেমন কাটাকাটির লড়াই চলে, ঠিক সেভাবেই সমাজ থেকে সব হিংসা আর বিদ্বেষ কেটে যাক। পিঠার মিষ্টি ঘ্রাণ আর রাতের আতশবাজির আলোয় প্রতিটি মানুষের জীবন হয়ে উঠুক আনন্দময় ও উজ্জ্বল।’
এমডিএএ/একিউএফ/এমএমএআর/এমএফএ/জেআইএম