বিদ্যাদেবীর আবাহনে শাঁখারীবাজার এখন উৎসবের নগরী

আশিকুজ্জামান
আশিকুজ্জামান আশিকুজ্জামান , নিজস্ব প্রতিবেদক
প্রকাশিত: ০৫:০১ পিএম, ২১ জানুয়ারি ২০২৬
অজ্ঞতার অন্ধকার দূর করতে পৃথবীতে আসেন হংসবাহনী দেবী সরস্বতী। পুরান ঢাকায় চলছে দেবী বন্দনার শেষ সময়ের প্রস্তুতি/ছবি: জাগো নিউজ

পুরান ঢাকার শাঁখারীবাজারের সরু গলিতে এখন তিল ধারণের ঠাঁই নেই। বাতাসে ভাসছে ধূপ আর চন্দনের সুবাস। কানে আসছে শাঁখের ধ্বনি আর হাতুড়ি-বাটালির ঠুংটাং আওয়াজ। এমন দৃশ্যে বুঝতে বাকি থাকে না যে, বীণাপাণি দেবী আসছেন। আগামী শুক্রবার সনাতন ধর্মাবলম্বীদের অন্যতম ধর্মীয় উৎসব সরস্বতী পূজা। মন্ত্র উচ্চারণের মধ্য দিয়ে দেবীর আবাহন ঘিরে এখন চলছে শেষ সময়ের প্রস্তুতি।

সরস্বতীর পূজাকে কেন্দ্র করে প্রতিবছরের মতো এবারও ঐতিহ্যবাহী পুরান ঢাকার প্রাণকেন্দ্র শাঁখারীবাজার এখন উৎসবের নগরী।

বুধবার (২১ জানুয়ারি) সকালে সরেজমিনে দেখা যায়, শীতের সকালের কুয়াশা কাটতে না কাটতেই শাঁখারীবাজারে শুরু হয় কর্মচাঞ্চল্য। সরু রাস্তার দুপাশে সারিবদ্ধভাবে সাজানো দেবী সরস্বতীর মৃন্ময় প্রতিমা। সাদা হংসবাহনী দেবীর স্নিগ্ধ হাসিতে যেন আলোকিত হয়ে আছে পুরো এলাকা।

বিদ্যাদেবীর আবাহনে শাঁখারীবাজার এখন উৎসবের নগরী

সনাতন ধর্মাবলম্বীদের বিশ্বাস অনুযায়ী, মাঘ মাসের শুক্লা পঞ্চমী তিথিতে শেত-শুভ্র কল্যাণময়ী বিদ্যার দেবী সাদা রাজহংসে চড়ে পৃথিবীতে আসেন। বাণী অর্চনা ও নানা আয়োজনের মধ্য দিয়ে বিদ্যা, বাণী ও সুরের প্রার্থনায় দেবীকে বরণ করে নিতে এখন চলছে শেষ মুহূর্তের প্রস্তুতি।

শাঁখারীবাজারের পূজার উপাচারের দোকানগুলোতে এখন বেচাকেনার ধুম পড়েছে। পাশাপাশি সেখানকার প্রতিমা কারিগররাও এখন রং-তুলির আঁচড়ে দেবীকে সাজিয়ে তুলতে মগ্ন, তাদের যেন দম ফেলারও ফুসরত নেই।

দেবী সরস্বতী বিদ্যাদায়িনী শ্বেত-শুভ্র বসনা। তার এক হাতে বীণা অন্য হাতে বেদপুস্তক। অর্থাৎ তিনি বীণাপাণি দেবী সরস্বতী। আর এ থেকেই বাণী অর্চনার প্রচলন। বিদ্যাদেবীর কৃপালাভের আশায় সারাদেশে সরস্বতী পূজা উদযাপনের প্রস্তুতি চলছে। অজ্ঞতার অন্ধকার দূর করতে কল্যাণময়ী দেবীর পাদপদ্মে প্রণতি জানাতে প্রস্তুতি নিচ্ছেন বিদ্যার্থীরা।

বিদ্যাদেবীর আবাহনে শাঁখারীবাজার এখন উৎসবের নগরী

সনাতন ধর্মালম্বীদের বিশ্বাস মতে, দেবী সরস্বতী সত্য, ন্যায় ও জ্ঞানালোকের প্রতীক। বিদ্যা, বাণী ও সুরের অধিষ্ঠাত্রী। বিশেষত শিক্ষার্থীরাই সরস্বতী পূজা আয়োজন করে থাকেন।

পূজার মূল আকর্ষণ দেবীর প্রতিমা। শাঁখারীবাজারের প্রতিটি অলিগলিতে এখন প্রতিমা তৈরির ধুম। বিমল সুর, যিনি ‘স্বস্তিকা শিল্পালয়’র একজন অভিজ্ঞ ভাস্কর। তার নিপুণ হাতের ছোঁয়ায় যেন প্রাণ পাচ্ছে দেবীর প্রতিটি প্রতিমা।

বিমল সুর জাগো নিউজকে বলেন, প্রতিমা তৈরি শুধু আমাদের পেশা নয়, এটি একটি সাধনা। বছরের এ সময়টাতে আমরা নাওয়া-খাওয়া ভুলে যাই। মা আসছেন, ভক্তদের মনে আনন্দ দিতে আমরা সর্বোচ্চটুকু দিয়ে চেষ্টা করি।

বিদ্যাদেবীর আবাহনে শাঁখারীবাজার এখন উৎসবের নগরী

কেন মানুষ দূর-দূরান্ত থেকে শাঁখারীবাজারে প্রতিমা নিতে আসেন। এমন প্রশ্নে এই ভাস্কর বলেন, শাঁখারীবাজারের একটা আলাদা মাহাত্ম্য আছে। এখানে কয়েক প্রজন্ম ধরে প্রতিমা তৈরি হচ্ছে। ভক্তদের বিশ্বাস, এখানকার প্রতিমায় এক বিশেষ ধরনের অলৌকিকতা আর শিল্পীসত্তা থাকে, যা অন্য কোথাও মেলা ভার।

পূজা উপলক্ষে শাঁখারীবাজারে নিয়মিত ব্যবসায়ীদের পাশাপাশি অংসখ্য অস্থায়ী দোকানিও নানা উপাচারের পসরা সাজিয়ে বসেছেন। তাদেরই একজন নিমতলী থেকে আসা জয়ন্তী রানী। প্রতিবছর পূজার সময় তিনি এখানে দোকান নিয়ে বসেন। তার দোকানে পাওয়া যাচ্ছে প্রতিমাসহ পূজার খুঁটিনাটি নানান সামগ্রী।

জয়ন্তী রানী জানান পূজার সম্পূর্ণ প্রক্রিয়ার এক আধ্যাত্মিক বয়ান। জাগো নিউজকে বলেন, পূজা মানে শুধু উৎসব নয়, এটি মনের শুদ্ধি। সকালবেলা উপোস থেকে সাদা বা হলুদ রঙের পোশাক পরে দেবীর পায়ে পুষ্পাঞ্জলি দেওয়া হয়। আমরা বিশ্বাস করি, মা সরস্বতীর আশীর্বাদ ছাড়া জ্ঞানের আলো পাওয়া সম্ভব নয়। তাই শিশুদের হাতেখড়ি থেকে শুরু করে উচ্চশিক্ষিত সবাই এদিন মায়ের চরণে অর্ঘ্য নিবেদন করেন।

পূজার আয়োজন শুধু প্রতিমায় সীমাবদ্ধ নয়, এর জন্য প্রয়োজন নানান উপাচারের। সেসব উপাচার বিক্রিতে ব্যস্ত দেখা যায় রেদোয়ান নামের একজন ব্যবসায়ীকে। তার দোকানে সারি সারি করে সাজানো রয়েছে পূজার যাবতীয় সরঞ্জাম।

যেখানে ক্রেতারা পাচ্ছেন, প্রাকৃতিক অনুষঙ্গের মধ্যে গাঁদা ফুলের মালা, আমের ডাল (মাইচ), আম কাঠ, পলাশ ফুল, বেল পাতা, তুলসী পাতা ও নিম পাতা। বিরল উপাদানের মধ্যে যব, ডুমুর পাতা, দুর্বা ঘাস, আমের বোল, ধান ও কাঁচা হলুদও মিলছে সেখানে। বিশেষ উপকরণের মধ্যে বাঁশের আগা, সুপারি, শোলা, বনের খইল্লা (কলমি), কলার পাতা এবং পঞ্চ শীর্ষ। আর শোভা বর্ধনের জন্য পাওয়া যাচ্ছে নারিকেলের ছোবা, মোম ফুল ও ধূপ।

বিদ্যাদেবীর আবাহনে শাঁখারীবাজার এখন উৎসবের নগরী

রেদোয়ান জাগো নিউজকে বলেন, গত কয়েকদিন ধরে ক্রেতাদের উপচেপড়া ভিড়। মানুষ এখন অনেক সচেতন, তারা নিখুঁতভাবে সব নিয়ম মেনে পূজা করতে চায়। তাই আমরাও চেষ্টা করি সব ধরনের দুর্লভ পাতা ও ফুল সংগ্রহে রাখতে।

রেদোয়ানের বেচাবিক্রি দেখার সময় পাশেই দাঁড়ানো শফিকুল ইসলাম নামের একজনের সঙ্গে কথা হয়। পেশায় একজন জ্যেষ্ঠ আইনজীবী তিনি। এসময় জাগো নিউজকে বলেন, এই জায়গাটি ঐতিহ্য ও সংস্কৃতির মিলনমেলা। শাঁখারীবাজারের এ ব্যস্ততা শুধু কেনাবেচার মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়। এটি সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি এবং সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যেরও এক বিশাল মঞ্চ।

‘এখানে ক্রেতা-বিক্রেতাদের মধ্যে কোনো ভেদাভেদ নেই। মুসলিম ব্যবসায়ী রেদোয়ান যখন হিন্দু ভক্তের হাতে পূজার বেল পাতা তুলে দিচ্ছেন, তখন এটি শুধু ব্যবসা নয়, এটি দীর্ঘদিনের সহাবস্থানের এক অনন্য নিদর্শন হয়ে দাঁড়াচ্ছে’—বলেন শফিকুল ইসলাম।

সনাতন ধর্মাবলম্বীদের বিশ্বাস অনুযায়ী, সরস্বতী জ্ঞান, সংগীত, শিল্পকলা ও প্রজ্ঞার দেবী। বিশেষত শিক্ষার্থীদের কাছে দেবীর গুরুত্ব অপরিসীম। দুদিন বাদেই ঢাকের বাদ্য, শঙ্খধ্বনি আর উলুধ্বনিতে মুখরিত হবে মন্দির ও মণ্ডপগুলো।

পুরান ঢাকার স্থানীয় বাসিন্দারা বলছেন, শাঁখারীবাজারের সরস্বতী পূজা মানেই এক উৎসবের আমেজ। বাসাবাড়ি থেকে শুরু করে স্কুল-কলেজ, এমনকি বিভিন্ন ক্লাবেও দেবীর বন্দনা করা হবে। শুক্রবার সকালে অঞ্জলির মাধ্যমে শুরু হবে পূজার মূল আনুষ্ঠানিকতা। এদিন শাঁখারীবাজারের বিভিন্ন অলিগলি ঘুরে পূজামণ্ডপগুলোর সাজসজ্জার চিত্রও চোখে পড়েছে।

স্থানীয় বাসিন্দা অনিক শাহ জাগো নিউজকে বলেন, এখন দেবী সরস্বতীর আগমনের অপেক্ষায় প্রহর গুনছে সবাই। শেষ সময়ের এই ব্যস্ততা, কারিগরদের ক্লান্তিহীন পরিশ্রম আর ভক্তদের ব্যাকুলতা—সব মিলিয়ে দেবীর আগমনে অজ্ঞতার সব অন্ধকার দূর হবে এই প্রত্যাশা করছি।

শুধু পুরান ঢাকাই নয়, রাজধানীসহ সারাদেশের মন্দির ও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোও এখন দেবীর পূজা অর্চনায় শেষ সময়ের প্রস্তুতি নিতে ব্যস্ত।

এমডিএএ/এমকেআর/জেআইএম

পাঠকপ্রিয় অনলাইন নিউজ পোর্টাল জাগোনিউজ২৪.কমে লিখতে পারেন আপনিও। লেখার বিষয় ফিচার, ভ্রমণ, লাইফস্টাইল, ক্যারিয়ার, তথ্যপ্রযুক্তি, ধর্ম, কৃষি ও প্রকৃতি। আজই আপনার লেখাটি পাঠিয়ে দিন [email protected] ঠিকানায়।