সেমিনারে বক্তারা
শ্রমবাজারে নারীর অংশগ্রহণ কমছে, প্রয়োজন রাজনৈতিক ক্ষমতায়ন
দেশে সাম্প্রতিক বছরগুলোতে নারীদের শ্রমবাজারে অংশগ্রহণ হ্রাস পেয়েছে। গ্রামীণ এলাকায় কয়েক বছরে নারীদের অংশগ্রহণ বাড়লেও শহরাঞ্চলে পরিস্থিতি আশাব্যঞ্জক নয়। কৃষি খাতে নারীদের অংশগ্রহণের হার তুলনামূলকভাবে অনেক বেশি। স্বয়ংক্রিয় প্রযুক্তি নারীদের কর্মসংস্থানের সক্ষমতার ওপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলছে। কারণ নারীরা প্রযুক্তি ব্যবহারে দক্ষ হয়ে উঠতে পারেনি। ফলে অংশগ্রহণ কমছে। এভাবে নারীরা সমাজে পিছিয়ে পড়ছে। এ থেকে উত্তরণের জন্য প্রয়োজন নারীর রাজনৈতিক ক্ষমতায়ন।
বুধবার (২৮ জানুয়ারি) বেলা ১১টায় রাজধানীর ইডেন মহিলা কলেজে ‘বাংলাদেশে নারীর আর্থিক ক্ষমতায়ন—শ্রমবাজার প্রেক্ষিত’ শীর্ষক সেমিনারে এসব কথা বলেন বক্তারা। বাংলাদেশ অর্থনীতি সমিতি এবং কলেজ কর্তৃপক্ষ যৌথভাবে সেমিনারটির আয়োজন করে।
সেমিনারে মূল প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের উপ-উপাচার্য (প্রশাসন) অধ্যাপক ড. সায়মা হক বিদিশা। প্রবন্ধে তিনি দেখান, নারীর অনানুষ্ঠানিক কর্মসংস্থানের হার অত্যন্ত বেশি, ব্যবস্থাপনা ও সিদ্ধান্ত গ্রহণমূলক পদে নারীদের অংশগ্রহণ খুবই কম। নারীরা বিপুল সময় ব্যয় করেন বেতনহীন ও স্বীকৃতিহীন গৃহস্থালি ও যত্নমূলক কাজে।
তিনি বলেন, বাংলাদেশ বিভিন্ন সামাজিক-অর্থনৈতিক সূচকে উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি অর্জন করেছে। তবে নারীর ক্ষমতায়নের ক্ষেত্রে এখনও বহু চ্যালেঞ্জ রয়ে গেছে। যে ক্ষেত্রটি বিশেষভাবে নীতিগত গুরুত্ব দাবি করে তা হলো নারীদের অর্থনৈতিক অবদান এবং শ্রমবাজারে অংশগ্রহণ। নারীরা উল্লেখযোগ্য সময় ব্যয় করেন শুধু বাজারভিত্তিক কার্যক্রমে নয়, বরং অ-বাজারভিত্তিক কর্মকাণ্ডেও, যার অধিকাংশই বেতনহীন যত্নমূলক কাজ।
বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরো, সানেমসহ কয়েকটি প্রতিষ্ঠানের জরিপের তথ্য তুলে ধরে তিনি বলেন, বাংলাদেশে নারী কর্মসংস্থান ১ শতাংশ বৃদ্ধি হলে অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি ০.৩১ শতাংশ পর্যন্ত বৃদ্ধি পেতে পারে। বাংলাদেশে নারীদের বেতনহীন যত্ন ও গৃহস্থালি কাজের আর্থিক মূল্য মোট দেশজ উৎপাদনের (জিডিপি) প্রায় ১২–১৮.৬ শতাংশ। পাঁচ বছরের কম বয়সী সন্তান রয়েছে এমন নারীরা উপযুক্ত শিশু যত্ন সুবিধা না থাকলে শ্রমবাজারে অংশগ্রহণে কম আগ্রহী হন।
সেমিনারে তিনি বেশ কিছু সুপারিশ তুলে ধরেন। তিনি বলেন, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ও কর্মক্ষেত্রে নারীবান্ধব পরিবেশ নিশ্চিত করা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। নিরাপত্তা ও সুরক্ষার জন্য আলাদা বাস সার্ভিস ও হোস্টেলের ব্যবস্থা করা যেতে পারে। জেন্ডার সংবেদনশীল পাঠ্যক্রম প্রণয়ন এবং সচেতনতামূলক কর্মসূচিকে অগ্রাধিকার দেওয়া প্রয়োজন। লিঙ্গভিত্তিক সীমাবদ্ধ সামাজিক মানসিকতা মোকাবিলায় সচেতনতামূলক কার্যক্রম অত্যন্ত জরুরি।
ড. সায়মা বলেন, বিশেষ করে আনুষ্ঠানিক ব্যাংকিং ব্যবস্থার মাধ্যমে নারীদের আর্থিক অন্তর্ভুক্তি নিশ্চিত করতে কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণ করা উচিত। জেন্ডার বাজেট একটি গুরুত্বপূর্ণ নীতিগত হাতিয়ার হিসেবে ভূমিকা রাখতে পারে।
সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগ (সিপিডি)-এর নির্বাহী পরিচালক ড. ফাহমিদা খাতুন বলেন, যতই আমরা অর্থনৈতিক ক্ষমতায়ন করি আসলে দিনের সেটা যদি রাজনৈতিকভাবে গ্রহণ না করা হয়, নারীর রাজনৈতিক ক্ষমতায়ন না হয় তাহলে সিদ্ধান্ত গ্রহণ পর্যায়ে নারীদের জন্য খুব বেশি কিছু করা সম্ভব হয় না।
তিনি বলেন, নারীর অর্থনৈতিক ক্ষমতায়নের ক্ষেত্রে একটা গুরুত্বপূর্ণ বাধা আমরা দেখি যে নারীকে মূলধারার অর্থনীতিতে অন্তর্ভুক্ত করা হয় না। আমাদের যে প্রচলিত অর্থনৈতিক তত্ত্ব, উন্নয়ন মডেল যেগুলো রয়েছে সেখানে নারীর অবদান কিংবা নারীর অংশগ্রহণ এটাকে অন্যভাবে দেখা হয়।
তিনি আরও বলেন, যখন আমরা দেশের সামষ্টিক অর্থনীতি অর্থাৎ ম্যাক্রোইনমিক পলিসি দিয়ে সমাজের বিভিন্ন অংশের যারা থাকেন, সমাজের বিভিন্ন শ্রেণি, বিভিন্ন অংশ তাদের জীবনকে প্রভাবিত করা, তাদের উন্নয়নের জন্য তাদের শিক্ষা-স্বাস্থ্য-চাকরি ইত্যাদির জন্য সাধারণত বিভিন্ন ধরনের সরকার পলিসি নিয়ে থাকে। সেটা কোন খাতে বেশি অর্থ বরাদ্দ দেওয়া হবে কোন খাতের ভর্তুকি কোন খাতে যাবে ইত্যাদি। কিংবা সরাসরি সাহায্য করা। এই ধরনের পলিসিগুলা যখন নেওয়া হয় তখন সবাই যে সমানভাবে পায় তা সেজন্যই আমাদের সরকারের যে নীতিমালা, এর মধ্যে অন্যতম হচ্ছে বাজেট।
তিনি বলেন, কিন্তু আমাদের যে উন্নয়ন প্রক্রিয়াটা চলছে, সেখানে কিন্তু নারীরা পুরোপুরি অন্তর্ভুক্ত হতে পারছে না। অন্তর্ভুক্ত না হওয়ার কারণে তারা তাদের কাজেরও পুরোপুরি স্বীকৃতি পাচ্ছে না। ফলে তাদের যে পটেনশিয়াল যে সম্ভাবনা সেটাও তারা ব্যবহার করতে পারছে না। কারণ এখানে একটা সুযোগের অভাব রয়েছে, সবার জন্য সুযোগ নেই। দ্বিতীয় বিষয়টা হচ্ছে যে সুযোগ যদি সৃষ্টিও করা হয় সেই সুযোগ ব্যবহার করার সক্ষমতাটাও সবার থাকে না।
সেমিনারে শুভেচ্ছা বক্তব্যে ইডেন মহিলা কলেজের অধ্যক্ষ প্রফেসর শামিম আরা বেগম বলেন, এই আয়োজন করার আগে আমরা একবার সাত কলেজ নিয়ে একটা সেমিনার করেছিলাম তারই ধারাবাহিকতায় এই আয়োজন। অর্থনীতি সমিতি ভেবেছে যে, নতুন প্রজন্ম যারা আছে তাদের কাছে আমাদের বার্তাটা পৌঁছে দেওয়া উচিত। এজন্যই আজকের এই আয়োজন।
এসময় তিনি বাংলাদেশ অর্থনীতি সমিতিকে ইডেন কলেজে সেমিনারের আয়োজন করার জন্য কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করেন।
সেমিনারে সভাপতিত্ব করেন বাংলাদেশ অর্থনীতি সমিতির আহ্বায়ক অধ্যাপক মাহবুব উল্লাহ এবং স্বাগত বক্তব্য দেন সদস্যসচিব অধ্যাপক ড. মোহাম্মদ হেলাল উদ্দিন। সমাপনী বক্তব্য রাখেন বাংলাদেশ ইন্সটিটিউট অব ডেভেলপমেন্ট স্টাডিজ (বিআইডিএস) এর গবেষণা পরিচালক ড.কাজী ইকবাল।
এসময় প্রশ্নোত্তর পর্বে শিক্ষক-শিক্ষার্থীরা আলোচ্যসূচির ওপর বিভিন্ন প্রশ্ন করেন, বক্তারা সেগুলোর উত্তর দেন। এসময় ইডেন কলেজ ছাড়াও ঢাকা কলেজ ও বেগম বদরুন্নেসা সরকারি মহিলা কলেজের শিক্ষার্থীরা অংশ নেন।
এনএস/এমআইএইচএস