মানবপাচার-ভিসা জালিয়াতি রোধে নতুন অধ্যাদেশ, পশ্চিমাদের সমর্থন
বাংলাদেশ থেকে ভুয়া ভিসা আবেদন ও মানবপাচারের মূল কারণ মোকাবিলায় ‘প্রিভেনশন অ্যান্ড সাপ্রেশন অব হিউম্যান ট্রাফিকিং অ্যান্ড স্মাগলিং অব মাইগ্র্যান্টস অর্ডিন্যান্স ২০২৫’ জারি করেছে অন্তর্বর্তী সরকার। এ অধ্যাদেশে অভিবাসী পাচার ও মানবপাচারকে শাস্তিযোগ্য অপরাধ হিসেবে অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে, যার মধ্যে জাল কাগজপত্র ব্যবহার করে ভিসা আবেদন ও বিদেশে পাচারের বিষয়টিও রয়েছে।
ইতালি, জার্মানি, যুক্তরাজ্য ও নেদারল্যান্ডসের রাষ্ট্রদূতরা অধ্যাদেশটির প্রতি তাদের সমর্থন ব্যক্ত করেছেন।
বুধবার (২৮ জানুয়ারি) প্রধান উপদেষ্টার বিশেষ দূত লুৎফে সিদ্দিকীর কার্যালয়ে অনুষ্ঠিত এক বৈঠকে তারা এ সমর্থনের কথা জানান।
বৈঠকে পুলিশের স্পেশাল ব্রাঞ্চ (এসবি) ও অপরাধ তদন্ত বিভাগের (সিআইডি) ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের পাশাপাশি ন্যাশনাল সিকিউরিটি ইন্টেলিজেন্স (এনএসআই), জনশক্তি, কর্মসংস্থান ও প্রশিক্ষণ ব্যুরো (বিএমইটি) এবং পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের প্রতিনিধিরা উপস্থিত ছিলেন।
আলোচনায় অংশগ্রহণকারীরা জানান, সম্প্রতি একটি ধারণা ছিল যে বাংলাদেশ ভিসা আবেদনে জাল কাগজপত্র ব্যবহারের বিরুদ্ধে যথেষ্ট কঠোর নয়। ফলে বিভিন্ন দেশের আস্থা কমে গেছে এবং ভিসা প্রক্রিয়াকরণে নেতিবাচক প্রভাব পড়েছে। দেশে-বিদেশে অবস্থানরত অসাধু দালালচক্র—বিশেষ করে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ব্যবহার করে এই জালিয়াতিতে সক্রিয় থাকলেও অতীতে এ ধরনের অপরাধে মামলা ও দণ্ডের হার ছিল খুবই কম।
বৈঠকে কয়েকটি গুরুতর ঘটনার উদাহরণ তুলে ধরা হয়। একটি দূতাবাস জানায়, তারা ৬০০টির বেশি ভিসা আবেদন পেয়েছে, যেগুলোতে ভুয়া চাকরির অফার লেটার সংযুক্ত ছিল। আরেকটি দূতাবাস একই এলাকার ৩০০টি পর্যটন ভিসা আবেদন পায়, যেখানে একই ব্যাংকের জাল স্টেটমেন্ট ব্যবহার করা হয়েছিল। পৃথক আরেক ঘটনায়, একটি ফেসবুক পেজ ৭০ জন ভুক্তভোগীর কাছ থেকে কয়েক লাখ টাকা হাতিয়ে নেওয়ার পর বন্ধ করে দেওয়া হয়। বর্তমানে এসব ঘটনায় আইনশৃঙ্খলা বাহিনী মামলা ও বিচারিক প্রক্রিয়া এগিয়ে নিচ্ছে।
এছাড়া জানানো হয়, গত বছর গড়ে প্রতিদিন ৪০ জনের বেশি যাত্রীকে ইমিগ্রেশন পুলিশ বিমানবন্দর থেকে অফলোড করেছে।
আলোচনায় ভিসা-অন-অ্যারাইভাল সুবিধাসম্পন্ন বিমানবন্দরগুলোকে তৃতীয় দেশে অবৈধভাবে যাওয়ার ট্রানজিট পয়েন্ট হিসেবে অপব্যবহারের বিষয়টি উঠে আসে। একটি দেশ জানায়, গত বছর তারা বাংলাদেশি নাগরিকদের কাছ থেকে ৬ হাজারের বেশি আশ্রয় আবেদন পেয়েছে, যাদের অনেকেই আগে ছাত্র বা কাজের ভিসায় প্রবেশ করেছিলেন।
অংশগ্রহণকারীরা আশঙ্কা প্রকাশ করেন, বাংলাদেশি কাগজপত্রের ওপর আস্থা কমে যাওয়ায় কিছু দেশে ভিসা প্রক্রিয়াকরণে সময় উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে। এমনকি একটি দেশ চলমান তদন্ত শেষ না হওয়া পর্যন্ত সাময়িকভাবে ভিসা আবেদন গ্রহণ স্থগিত করেছে।
ইতিবাচক দিক হিসেবে ইউনাইটেড কমার্শিয়াল ব্যাংককে (ইউসিবি) ব্যাংক স্টেটমেন্টে কিউআর কোড চালুর জন্য প্রশংসা করা হয়, যা যাচাই প্রক্রিয়াকে সহজ করেছে। একই সঙ্গে অন্যান্য ব্যাংকেও এই পদ্ধতি চালুর আহ্বান জানানো হয়।
বৈঠকে গোয়েন্দা তথ্য বিনিময় সংক্রান্ত সাম্প্রতিক অগ্রগতির কথাও উল্লেখ করা হয়, যা আন্তঃদেশীয় অপরাধ দমনে সমন্বয় বাড়াতে সহায়ক হচ্ছে। ইউরোপীয় ইউনিয়নের রিটার্নি কেস ম্যানেজমেন্ট সিস্টেমসহ বিভিন্ন প্রযুক্তিগত সহায়তা আরও কার্যকরভাবে ব্যবহৃত হচ্ছে। তবে আলোচনায় উঠে আসে, ইমিগ্রেশন বিষয়ে প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত কর্মকর্তাদের অনেক সময় দ্রুত অন্যত্র বদলি করে দেওয়া হয়, যা একটি চ্যালেঞ্জ।
জনশক্তি, কর্মসংস্থান ও প্রশিক্ষণ ব্যুরো (বিএমইটি) জানায়, তাদের অধিকাংশ কার্যক্রম এখন সম্পূর্ণ স্বয়ংক্রিয় এবং ইমিগ্রেশন পুলিশের সিস্টেমের সঙ্গে সংযুক্ত। এর ফলে প্রথমবারের মতো বিএমইটি কার্ডধারীদের দেশত্যাগ ও পুনঃপ্রবেশ কার্যকরভাবে পর্যবেক্ষণ করা সম্ভব হচ্ছে।
এছাড়া বলা হয়, প্রাথমিক নিয়োগকারী এজেন্টরা নিবন্ধিত ও নিয়ন্ত্রিত হলেও স্থানীয় পর্যায়ে কাজ করা সাব-এজেন্টরা এখনো কার্যত নিয়ন্ত্রণের বাইরে। দালালচক্রের অপব্যবহার বিষয়ে জনসচেতনতা বাড়াতে সক্রিয় প্রচারণার ওপর গুরুত্ব দেন অংশগ্রহণকারীরা।
বৈঠকে বাংলাদেশের হেগ অ্যাপোস্টিল কনভেনশনে যোগদানের বিষয়টিও আলোচনায় উঠে আসে। পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় থেকে ইস্যু করা অ্যাপোস্টিল যেন উৎস ও বিষয়বস্তুর দিক থেকে সম্পূর্ণভাবে নির্ভরযোগ্য হয়, সে বিষয়ে জোর দেওয়া হয়।
বৈঠক শেষে অংশগ্রহণকারী দেশগুলোর প্রতিনিধিরা এসব ইস্যুতে অন্তর্বর্তী সরকারের স্বচ্ছতা, আন্তরিকতা ও দৃঢ় প্রতিশ্রুতির প্রশংসা করে বলেন, বাংলাদেশ যে মাত্রার সহযোগিতা এখন দিচ্ছে তা অভূতপূর্ব।
এমইউ/ইএ