অক্সফোর্ডের গবেষণা

২০৫০ সালে উষ্ণ ৬ দেশের একটি হবে বাংলাদেশ

নিজস্ব প্রতিবেদক
নিজস্ব প্রতিবেদক নিজস্ব প্রতিবেদক
প্রকাশিত: ০৮:২৫ এএম, ২৭ জানুয়ারি ২০২৬
ছবি: সংগৃহীত

চরম তাপমাত্রা বৃদ্ধির ফলে ২০৫০ সালের মধ্যে বিশ্বে সবচেয়ে ক্ষতিগ্রস্ত হবে ছয়টি দেশ, যার একটি বাংলাদেশ বলে নতুন এক আন্তর্জাতিক গবেষণায় জানিয়েছেন বিজ্ঞানীরা। যুক্তরাজ্যের অক্সফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের বিজ্ঞানীরা এই গবেষণা পরিচালনায় নেতৃত্ব দিয়েছেন।

সোমবার (২৬ জানুয়ারি) গবেষণাটি নেচার সাসটেইনেবিলিটি সাময়িকীতে প্রকাশিত হয়েছে।

এতে বলা হয়েছে, বিশ্বজুড়ে তাপপ্রবাহ সংকট ক্রমেই গভীর হচ্ছে—যার মারাত্মক প্রভাব পড়ছে দৈনন্দিন জীবন, অর্থনীতি ও স্বাস্থ্য ব্যবস্থার ওপর। জীবাশ্ম জ্বালানির বর্তমান ব্যবহার অব্যাহত থাকলে আগামী ২৫ বছরের মধ্যে চরম তাপে আক্রান্ত বৈশ্বিক জনসংখ্যার অনুপাত প্রায় দ্বিগুণ হতে পারে। শিল্প-পূর্ব সময়ের তুলনায় বৈশ্বিক উষ্ণতা ২ ডিগ্রি সেলসিয়াসে পৌঁছালে চলতি শতাব্দীর মাঝামাঝি বিশ্বের ৪১ শতাংশ মানুষ, অর্থাৎ প্রায় ৩৭৯ কোটি মানুষ চরম তাপের মধ্যে বসবাস করবে। ২০১০ সালে এই হার ছিল ২৩ শতাংশ বা প্রায় ১৫৪ কোটি।

গবেষণায় উচ্চ রেজুলেশনের জলবায়ু ও জনসংখ্যাভিত্তিক মডেল ব্যবহার করে তাপপ্রবাহের ঝুঁকি নিরূপণ করা হয়েছে ‘কুলিং ডিগ্রি ডেইজ’ (সিডিডি) সূচকের মাধ্যমে। বছরে ৩ হাজারের বেশি সিডিডি থাকা অঞ্চলগুলোকে ‘চরম তাপপ্রবণ’ হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে। ঘরের নিরাপদ তাপমাত্রার জন্য কতটা ঠাণ্ডা প্রয়োজন, এই সূচকে সেটি মানদণ্ড হিসেবে ধরা হয়। এই মানদণ্ড অনুযায়ী, চরম তাপে বসবাসকারী সবচেয়ে বেশি জনসংখ্যার দেশগুলোর তালিকায় রয়েছে ভারত, নাইজেরিয়া, ইন্দোনেশিয়া, বাংলাদেশ, পাকিস্তান ও ফিলিপাইন।

গবেষণার প্রধান লেখক ও অক্সফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষক ড. জেসুস লিজানা বলেন, বাংলাদেশের মতো দেশে জাতীয় পর্যায়ের গড় তাপমাত্রা প্রকৃত ঝুঁকি আড়াল করে দিতে পারে। বাস্তবে দেশের অধিকাংশ মানুষ এমন এলাকায় বাস করে, যেখানে শীতলীকরণের চাহিদা বছরে ৩ হাজার সিডিডির বেশি। এর অর্থ হলো দীর্ঘস্থায়ী ও বিপজ্জনক তাপের মধ্যে জীবনযাপন—যার প্রভাব পড়ে মানুষের বেঁচে থাকা, উৎপাদনশীলতা ও স্বাস্থ্যের ওপর।

তথ্য অনুযায়ী, জলবায়ু সংকটে বিশ্বে সবচেয়ে ঝুঁকিপূর্ণ দেশগুলোর একটি বাংলাদেশ। এই গবেষণা সেই ঝুঁকির ওপর নতুন করে তাপসংকটের মাত্রা যোগ করেছে। এতদিন সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বৃদ্ধি, ঘূর্ণিঝড় ও বন্যার দিকে নজর বেশি থাকলেও এখন নীরবে কিন্তু সমান প্রাণঘাতী হুমকি হয়ে উঠছে চরম তাপমাত্রা।

বিশেষজ্ঞদের মতে, তাপপ্রবাহে হিটস্ট্রোক, হৃদরোগজনিত চাপ ও কিডনি রোগের ঝুঁকি উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়ে যায়—বিশেষ করে বয়স্ক, শিশু এবং স্বল্প আয়ের মানুষের মধ্যে, যাদের শীতলীকরণ ব্যবস্থায় প্রবেশাধিকার সীমিত।

অক্সফোর্ডের এই গবেষণায় বলা হয়েছে, গরম বৃদ্ধির কারণে বিশ্বের উষ্ণ ও উপউষ্ণ অঞ্চলের নিম্ন ও মধ্য আয়ের দেশগুলোতে শীতলীকরণের চাহিদা সবচেয়ে দ্রুত বাড়বে। বিপরীতে, বৈশ্বিক উত্তরের ধনী দেশগুলোতে ঘর গরম রাখার প্রয়োজন কমে আসবে।

সেন্ট্রাল আফ্রিকান রিপাবলিক, নাইজেরিয়া, দক্ষিণ সুদান, লাওস ও ব্রাজিল—এই দেশগুলোতে ব্যক্তি প্রতি কুলিং ডিগ্রি ডেজ সবচেয়ে বেশি বাড়বে বলে পূর্বাভাস দেওয়া হয়েছে। অন্যদিকে কানাডা, রাশিয়া, ফিনল্যান্ড, সুইডেন ও নরওয়ের মতো দেশে শীতের তীব্রতা কমায় গরমের চাহিদা কমবে।

গবেষণা বলছে, ২০৫০ সালের মধ্যে ‘অত্যন্ত শীতল’ অঞ্চলে বসবাসকারী মানুষের অনুপাত ১৪ শতাংশ থেকে নেমে আসবে মাত্র ৭ শতাংশে। অন্যদিকে চরম তাপপ্রবাহের দেশগুলোতে এয়ার কন্ডিশনের চাহিদা বৃদ্ধি পাওয়ায় ‘কুলিং ট্র্যাপ’ তৈরি হতে পারে বলে সতর্ক করেছেন গবেষকরা। কারণ এতে জ্বালানি ব্যবহার বাড়ে, আর সেই জ্বালানি যদি জীবাশ্ম জ্বালানি হয়, তবে জলবায়ু পরিবর্তন আরও ত্বরান্বিত হবে।

এই গবেষণা স্পষ্ট করে দিচ্ছে, চরম তাপের সবচেয়ে ভয়াবহ প্রভাব ঠেকানোর সুযোগ দ্রুত সংকুচিত হচ্ছে। বিজ্ঞানীদের মতে, বৈশ্বিক উষ্ণতা ১ দশমিক ৫ ডিগ্রি সেলসিয়াসের কাছাকাছি রাখতে পারলে প্রাণঘাতী তাপে আক্রান্ত মানুষের সংখ্যা উল্লেখযোগ্যভাবে কমানো সম্ভব।

এনএস/ইএ

পাঠকপ্রিয় অনলাইন নিউজ পোর্টাল জাগোনিউজ২৪.কমে লিখতে পারেন আপনিও। লেখার বিষয় ফিচার, ভ্রমণ, লাইফস্টাইল, ক্যারিয়ার, তথ্যপ্রযুক্তি, ধর্ম, কৃষি ও প্রকৃতি। আজই আপনার লেখাটি পাঠিয়ে দিন [email protected] ঠিকানায়।