টাঙ্গাইল-৪
জয়ের আশায় লতিফ সিদ্দিকী, বিএনপির বিভক্তিতে সরব জামায়াত
টাঙ্গাইল জেলার কালিহাতি উপজেলা নিয়ে গঠিত টাঙ্গাইল-৪ সংসদীয় আসনে ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন ঘিরে তৈরি হয়েছে জটিল ও বহুমাত্রিক রাজনৈতিক সমীকরণ। এই আসনে স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন সাবেক মন্ত্রী ও ছয়বারের সংসদ সদস্য আব্দুল লতিফ সিদ্দিকী।
এক সময়ের প্রভাবশালী আওয়ামী লীগ নেতা আব্দুল লতিফ সিদ্দিকী বিতর্কিত মন্তব্যের জেরে দল থেকে বহিষ্কৃত হন এবং মন্ত্রিত্ব হারান। সবশেষ আওয়ামী লীগ সরকারের অধীনে ২০২৪ সালের নির্বাচনে স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবে জয় পেয়েছিলেন। এবার কার্যক্রম নিষিদ্ধ থাকায় আওয়ামী লীগ নির্বাচনে অংশগ্রহণ করতে পারেনি। তবে এবারও স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবে নির্বাচনে অংশ নিচ্ছেন তিনি।
আওয়ামী লীগ নির্বাচনে না থাকায় দলটির সমর্থক ভোটারদের বড় একটি অংশ তার দিকে ঝুঁকতে পারে এমন সমীকরণ ঘুরপাক খাচ্ছে।
স্থানীয়দের মতে, আওয়ামী লীগের ভোটব্যাংক স্বতন্ত্র প্রার্থীর দিকে গেলে সেটি নির্বাচনের ফলাফলে বড় প্রভাব ফেলতে পারে। বিশেষ করে কালিহাতিতে তার দীর্ঘদিনের সাংগঠনিক ভিত্তি ও ব্যক্তিগত পরিচিতি এখনও তাকে শক্ত অবস্থানে রেখেছে।
অন্যদিকে বিএনপির প্রার্থী ও বিএনপি থেকে বিদ্রোহী প্রার্থী থাকায় দলটির ভোট দুই ভাগ হওয়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে। এতে বিএনপির সাংগঠনিক শক্তি থাকলেও ভোট বিভক্তির কারণে কাঙ্ক্ষিত ফল নাও পেতে পারে—এমন আলোচনা চলছে মাঠ পর্যায়ে।
এই পরিস্থিতিকে সুযোগ হিসেবে দেখছে জামায়াত। দলটি তাদের প্রার্থীকে সামনে রেখে ভোটারদের সংগঠিত করতে মাঠে সক্রিয় রয়েছে। ভোট বিভাজনের সুযোগ কাজে লাগিয়ে শক্ত অবস্থান তৈরি করাই জামায়াতের কৌশল বলে মনে করছেন অনেকেই।
সব মিলিয়ে টাঙ্গাইল–৪ আসনে এবার নির্বাচন হচ্ছে ত্রিমুখী প্রতিদ্বন্দ্বিতায়। আওয়ামী লীগের অনুপস্থিতি, বিএনপির ভোট বিভাজন এবং জামায়াতের সক্রিয়তা—এই তিন সমীকরণের মধ্যে জয়ের মালা কে পরবে সেটিই এখন দেখার বিষয়।
উপজেলার কালিহাতি সদর, আটাবাড়ি বাজার, রাজাফৈর, হরিপুর বাজার, বেতডোবাসহ বিভিন্ন এলাকা ঘুরে প্রার্থীদের ব্যানার চোখে পড়েছে। এছাড়া বিভিন্ন প্রার্থীর পক্ষে মাইকে প্রচারণা চালাতেও দেখা গেছে। তবে উপজেলার বিভিন্ন স্থানে ভাঙাচোরা সড়ক চোখে পড়েছে।
স্থানীয় চায়ের দোকানে কথা হয় কালিহাতি ইউনিয়নের ঝগড়মান গ্রামের ছত্তার আলীর সঙ্গে। তিনি বলেন, আওয়ামী লীগের ভোটব্যাংকটিই লতিফ সিদ্দিকী পাবে। অন্যরাও পাবে। প্রার্থীরা গ্রামে আসে না। গণভোট নিয়ে জানি না কিছু।
মেঠো পথের পাশেই নিজ বাড়ির সামনে কথা হয় ৭০ এর কোঠায় থাকা আহাদ উল্লাহর সঙ্গে। তিনি বলেন, লতিফ সিদ্দিকী চাঁদাবাজি পছন্দ করেন না। আগে লোকজন তাকেই ভোট দিয়েছে। হিন্দু ভোট আছে ভালোই। তাকেই দেবো। আর এবার তো বড় বড় মিছিল-মিটিং হচ্ছে না। লতিফ সিদ্দিকী যদি না দাঁড়াতো তাহলে আওয়ামী লীগের ভোট দেওয়ার যাইতো না।
তবে গণভোট নিয়ে কোনো প্রচারণা হয় না, আর এ বিষয়ে তিনি কিছুই জানেন না জানিয়ে বলেন, কেন্দ্রে যে প্রিসাইডিং অফিসার স্লিপ কেটে দেব, তিনিই বলে দেবেন ‘হ্যাঁ’ কি ‘না’। সেটা শুনে দেওয়া যাবে।
পেশায় কৃষক আখতার আলী বলেন, এবার নাচানাচি নেই। নির্বাচনে আওয়ামী লীগ নেই। এহানে দলই দুইডা, আওয়ামী লীগ আর বিএনপি। আবার বিএনপি ১৮ বছর সিল দেওয়ার পারে না। এবার দিব। গতবার দিবার গেছি কয়, ভোট হয়ে গ্যাছেগা। এইবার দেবো।
আশি বছর বয়সী জহের আলী বলেন, ভোট লতিফ সিদ্দিকীও পাইবো, ধানের শীষ-দাঁড়িপাল্লা সবাই পাইবো। তবে দাঁড়িপাল্লা আর ধানের শীষে ফাইট হইবো।
গণভোট নিয়ে জিজ্ঞেস করতে তিনি বলেন, এসব নিয়ে কেউ কিছু বলে না, হুনিও না।
বেতডোবা এলাকার বাসিন্দা নজিব উদ্দিন মিঞা বলেন, এই এলাকার মানুষ মূলত লতিফ সিদ্দিকীকে অনেকবার সংসদে পাঠিয়েছেন। এখন তো আওয়ামী লীগ নির্বাচনে নেই। স্বাভাবিকভাবেই দলের বেশিরভাগ ভোট তিনি পাবেন। আবার বিএনপির একজন মনোনয়ন পেয়েছে, আরেকজনও দাঁড়াইছে। বিএনপির দুজন হওয়ায় জামায়াত মাঠে নামছে। এখন নির্বাচন হলে বোঝা যাবে কে জিতবে।
কালিহাতির বীরবাসিন্দা ইউনিয়নের পাচজোয়ার গ্রামের মুদি দোকানি আব্দুর রাজ্জাক বলেন, ‘ভোটের ওই রকম আমেজ নেই। যারা লতিফ সিদ্দিকীরে ভালোবাসেন তারা ভোট দিবো আবার যারা অন্য প্রার্থীরে ভালোবাসেন তারা সেই লোকরে ভোট দিবো। লতিফ সিদ্দিকী অনেকেরে সরকারি চাকরি দিছে, কেউ বলতে পারবো না যে দশটা টাকা নিছে।’
ভোটার ও প্রার্থী সংখ্যা
টাঙ্গাইল-৪ আসনে মোট ভোটার ৩ লাখ ৭৪ হাজার ৯১৭। এর মধ্যে পুরুষ ভোটার ১ লাখ ৮৯ হাজার ৯৪২, নারী ভোটার ১ লাখ ৮৪ হাজার ৯৭২ এবং তৃতীয় লিঙ্গের তিনজন।
আসনটিতে বিএনপি থেকে মো. লুৎফর রহমান, বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর খন্দকার আব্দুর রাজ্জাক, জাতীয় পার্টির (জাপা) মো. লিয়াকত আলী, ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশের আলী আমজাদ হোসেন, স্বতন্ত্র (হাঁস প্রতীক )— আবদুল লতিফ সিদ্দিকী, বিএনপির বিদ্রোহী প্রার্থী স্বতন্ত্র (মোটরসাইকেল প্রতীকে) মো.আব্দুল হাকুম মিঞা নির্বাচন করছেন।
এনএস/এমআইএইচএস