আন্দরকিল্লা শাহী মসজিদ: যেখানে ইফতারে মুছে যায় সামাজিক ভেদাভেদ
রোজার মাসে বিকেল গড়াতেই চট্টগ্রাম নগরের আন্দরকিল্লা শাহী জামে মসজিদ প্রাঙ্গণে বাড়তে থাকে ভিড়। আসরের নামাজ শেষ হওয়ার কিছুক্ষণ পরই মসজিদের ভেতর, বারান্দা আর চত্বরে মুখোমুখি দীর্ঘ সারিতে বসে পড়েন লোকজন। যাদের কেউ ব্যবসায়ী, কেউ শ্রমিক, কেউ ছাত্র কিংবা চাকরিজীবী। তবে সব ছাপিয়ে বড় হয়ে ওঠে একটাই পরিচয়- সবাই রোজাদার। ইফতারের কাতারে মুছে যায় তাদের পেশা, শ্রেণি আর বয়সের ভেদাভেদ।
সাড়ে তিন শতাব্দীর বেশি পুরোনো এই মসজিদে রমজানজুড়ে প্রতি ইফতারের দৃশ্য এটি। এখানে প্রতিদিন কয়েক হাজার মানুষ একসঙ্গে ইফতারি খান। এজন্য বিকেলে জড়ো হওয়া মানুষের উদ্দেশে মসজিদের মাইকে চলতে থাকে কোরআনের আলোকে সংক্ষিপ্ত বয়ান। আর সেই সময়ে স্বেচ্ছাসেবকরা একে একে বিলিয়ে দেন মুড়ি, ছোলা, পেঁয়াজু, বেগুনি, আলুর চপ, খেজুর, জিলাপি আর শরবত। মাগরিবের আজান হতেই একসঙ্গে শুরু হয় ইফতার একই কাতারে, একই খাবারে, একই অনুভূতিতে।
হাজারো মানুষের জন্য বিশাল প্রস্তুতি
বৃহস্পতিবার (২৬ ফেব্রুয়ারি) বিকেলে গিয়ে দেখা যায়, মসজিদের এক পাশে সারি করে সাজানো প্লেট। প্রতিতে রাখা ইফতারি, বড় ড্রামে প্রস্তুত শরবত। স্বেচ্ছাসেবকরা দ্রুত হাতে হাতে এসব প্লেট পৌঁছে দিচ্ছেন রোজাদারদের কাছে।
এই আয়োজনের জন্য ভোর থেকেই শুরু হয় ব্যস্ততা। ১০ থেকে ১২ জন বাবুর্চি বিশাল হাঁড়িতে ছোলা সেদ্ধ করেন। বড় কড়াইয়ে একসঙ্গে ৩০-৪০ কেজি করে পেঁয়াজু ও বেগুনি ভাজা হয়। রান্না ও পরিবেশনায় সহায়তা করেন ৩০-৪০ জন স্বেচ্ছাসেবক।

মসজিদের খতিবের একান্ত সহকারী মো. হাসান মুরাদ জাগো নিউজকে জানান, রমজানের শুরুতে প্রতিদিন দুই থেকে তিন হাজার মানুষ ইফতার করেন। মাসের মাঝামাঝি এই সংখ্যা চার থেকে পাঁচ হাজারে পৌঁছে যায়। প্রতিদিনের ইফতারের জন্য প্রয়োজনীয় সব উপকরণ স্থানীয় ব্যবসায়ী ও মুসল্লিরা দান করেন। অনেকেই নাম প্রকাশ করতে চান না।
আগের দিন থেকেই প্রস্তুতি শুরু
আয়োজনের প্রস্তুতি শুরু হয় আগের দিন থেকেই। তখন বাবুর্চিরা ছোলা ও ডাল ভিজিয়ে রাখেন। ভোর থেকে শুরু হয় বেগুন, পেঁয়াজ, কাঁচামরিচ ও মসলাজাতীয় উপকরণ কাটা ও বাটার কাজ। আসরের আগ পর্যন্ত চলে রান্না ও ভাজা। প্রতিদিন অন্তত নয় পদের ইফতার প্রস্তুত করা হয়। বড় ড্রামে তৈরি করা হয় শরবত।
বাবুর্চি মুসলিম উদ্দিন বলেন, ‘প্রতিদিন তিন থেকে চার হাজার মানুষের ইফতার প্রস্তুত করতে হয়। আল্লাহর রহমতে কোনোদিন ঘাটতি হয়নি।’
মক্কা-মদিনার আদলে যাত্রা
মসজিদ সূত্রে জানা যায়, ১৯৯৬ সালে মক্কা-মদিনায় সম্মিলিত ইফতারের দৃশ্য দেখে মসজিদের খতিব সাইয়্যেদ মুহাম্মদ আনোয়ার হোসাইন তাহের জাবেরী আল-মাদানী ব্যক্তিগত উদ্যোগে ছোট পরিসরে এ আয়োজন শুরু করেন। ২০০১ সাল থেকে তা নিয়মিত ও বড় পরিসরে অনুষ্ঠিত হচ্ছে। সাম্প্রতিক বছরগুলোতে এটি চট্টগ্রামের অন্যতম বড় গণ-ইফতার আয়োজন হিসেবে পরিচিতি পেয়েছে।

কম আয়ের মানুষের জন্য ভরসা
রিকশাচালক সাব্বির আহমেদ তিন বছর ধরে এখানে ইফতার করেন। তিনি বলেন, ‘বাজারে সবকিছুর দাম বেড়েছে। ৭০-৮০ টাকায়ও ঠিকমতো ইফতার হয় না। এখানে এসে নিশ্চিন্তে ইফতার করতে পারি।’
দিনমজুর জয়নুল আবেদীন রোজার পুরো মাস স্বেচ্ছাসেবক হিসেবে কাজ করেন। তিনি জানান, রোজাদারেরা তৃপ্তি করে খাচ্ছেন, এটাই সবচেয়ে বড় আনন্দ।
কোতোয়ালি এলাকার বাসিন্দা সাব্বির বলেন, ‘প্রতি রমজানে অন্তত একদিন এখানে ইফতার করি। হাজার হাজার মানুষের সঙ্গে একসঙ্গে ইফতার করার অনুভূতিই আলাদা।’
বিশাল আয়োজনে ভরসা অনুদান
প্রতিদিনের এই বিশাল আয়োজন সম্পূর্ণভাবে মুসল্লি ও স্থানীয় ব্যবসায়ীদের অনুদানে পরিচালিত হয়। কেউ উপকরণ, আবার কেউ আর্থিক সহায়তা করেন। অনেক দাতা নাম প্রকাশ করতে চান না। মসজিদের দুটি গুদামে উপকরণ সংরক্ষণ এবং প্রয়োজন অনুযায়ী ব্যবহার করা হয়।

মসজিদের খতিবের একান্ত সহকারী হাসান বলেন, আন্দরকিল্লা ও খাতুনগঞ্জ এলাকার ব্যবসায়ীরা নিয়মিত সহযোগিতা করেন। কেউ তিন বস্তা ছোলা দেন, কেউ এক কেজি লবণ দেন। যার যা সামর্থ্য। কখনো ইফতারের উপকরণ নিয়ে দুশ্চিন্তা করতে হয়নি।
ইতিহাসের সাক্ষী শাহী মসজিদ
মুঘল স্থাপত্যরীতিতে নির্মিত মসজিদটি পাহাড়চূড়ায় অবস্থিত। সম্রাট আওরঙ্গজেবের নির্দেশে ১৬৬৭ সালে সুবাদার শায়েস্তা খাঁ এটি নির্মাণ করেন বলে জানা যায়। বর্তমানে ইসলামিক ফাউন্ডেশন মসজিদটি পরিচালনা করছে।
সাড়ে তিন শ বছরের বেশি পুরোনো এই মসজিদ এখন শুধু ইতিহাসের সাক্ষী নয়, এটি মানবিকতা, সাম্য আর ভ্রাতৃত্বের এক জীবন্ত প্রতীক। এখানে রমজানের প্রতিটি বিকেলে যখন ধনী-গরিব, পরিচিত-অপরিচিত সবাই একই সারিতে বসে ইফতারি সামনে নিয়ে অপেক্ষা করেন আজানের, তখন মনে হয় সাম্যের সবচেয়ে সুন্দর ছবিগুলোর একটি হয়তো আঁকা হচ্ছে এই মসজিদের মেঝেতেই।
এমআরএএইচ/একিউএফ