মাতৃত্ব-পরিবারের দায়িত্ব পালনে চাকরি ছাড়ছেন নারীরা, কাজে ফেরাতে উদ্যোগ
পারিবারিক দায়িত্ব পালনের কারণে এবং মাতৃত্বকালীন অধিকাংশ নারী চাকরি ছাড়ছেন। পেশাজীবী নারীদের ৭৫ শতাংশই এই দুটি কারণে স্বেচ্ছায় বা বাধ্য হয়ে চাকরি থেকে বিরতি নিচ্ছেন বা পেশাগত জীবনে ইতি টানছেন। এছাড়াও বিরূপ কর্মপরিবেশ, উচ্চশিক্ষা ও সামাজিক চাপেও অনেকে চাকরি ছাড়তে বাধ্য হচ্ছেন।
কর্মক্ষেত্র থেকে বিরতি নেওয়া এমন নারীদের কাজে ফেরাতে আবারও শুরু হয়েছে ব্র্যাকের ব্রিজ রিটার্নশিপ কর্মসূচি।
বৃহস্পতিবার (৫ মার্চ) মহাখালীর ব্র্যাক সেন্টারে গণমাধ্যমের প্রতিনিধিদের সঙ্গে এক মতবিনিময় অনুষ্ঠানে এ বিষয়টি উঠে আসে।
ব্র্যাকের চিফ পিপল অ্যান্ড কালচার অফিসার মৌটুসী কবীর অনুষ্ঠানে স্বাগত বক্তব্য রাখেন এবং সংবাদিকদের বিভিন্ন প্রশ্নের উত্তর দেন। এ সময় ব্র্যাকের আর্লি ক্যারিয়ার অ্যান্ড এমপ্লয়ার ব্র্যান্ডের অ্যাসিস্ট্যান্ট জেনারেল ম্যানেজার নাজিবুল ইসলাম প্রিয়ম উপস্থিত ছিলেন।
সংবাদ সম্মেলনে জানানো হয়, আবেদন প্রক্রিয়ার মাধ্যমে নারীদের কর্মজীবন থেকে বিরতি নেওয়া এবং পুনরায় কর্মক্ষেত্রে প্রবেশের ক্ষেত্রে প্রতিবন্ধকতাগুলো চিহ্নিত করা হয়েছে। আবেদনকারীদের ৩৮ দশমিক ৮ শতাংশ পারিবারিক দায়িত্ব ও ৩৬ শতাংশ মাতৃত্বকালীন চাকরি ছাড়ার প্রধান কারণ হিসেবে উল্লেখ করেছেন। এছাড়া ব্যক্তিগত কারণ (১৮ দশমিক ৮ শতাংশ), উচ্চশিক্ষার জন্য (১৪ দশমিক ৪ শতাংশ), বিরূপ কর্মপরিবেশ (সাড়ে ৮ শতাংশ) ও সামাজিক চাপ (৪ দশমিক ৭ শতাংশ) উল্লেখযোগ্য কারণ হিসেবে উঠে এসেছে।
আরও পড়ুন
নারীর মানসিক স্বাস্থ্য, সংসার-প্রত্যাশা ও অদৃশ্য চাপ
রোজায় নারীর শরীর ও মাতৃত্ব, যা বলছেন বিশেষজ্ঞ
অন্যদিকে, বিরতির পর কাজে ফেরার ক্ষেত্রে তাদের মূল অনুপ্রেরণা ছিল ক্যারিয়ারে উন্নতি (সাড়ে ৭৬ শতাংশ), আর্থিক স্বাধীনতা (সাড়ে ৫৬ শতাংশ), নিজস্ব পরিচয় তৈরি (৬২ দশমিক ২ শতাংশ), আত্মবিশ্বাস বৃদ্ধি (৫৭ দশমিক ৭ শতাংশ) এবং পরিবারের জন্য অবদান রাখা (৪২ দশমিক ৭ শতাংশ)।
এবারের আবেদনকারীদের তথ্য বিশ্লেষণ করে দেখা গেছে, কর্মক্ষেত্র থেকে ৬ বছরের বেশি বিরতি ছিল ৬ দশমিক ৬ শতাংশ নারীর। সবচেয়ে বেশি ৬৭ দশমিক ৯ শতাংশ আবেদনকারীর ১ থেকে ২ বছরের বিরতি ছিল। অন্যদিকে ২৮ দশমিক ৬ শতাংশ আবেদনকারীর অভিজ্ঞতা ছিল ৭ বছরের বেশি। ৫৮ শতাংশ আবেদনকারীর অভিজ্ঞতা ৩ থেকে ৫ বছরের মধ্যে।
তবে এবারের ব্রিজ রিটার্নশিপ কর্মসূচিতে এক হাজার ২০০ জনের বেশি আবেদনকারীর মধ্য থেকে কয়েক ধাপে বাছাই প্রক্রিয়ার মাধ্যমে চূড়ান্তভাবে ২৪ জন নির্বাচিত হয়েছেন, যারা ব্র্যাকের বিভিন্ন কর্মসূচিতে আগামী ছয় মাস কাজ করবেন।

নির্বাচিত প্রার্থীদের জন্য দক্ষতা উন্নয়ন প্রশিক্ষণ, নেতৃত্ব উন্নয়ন কর্মশালা, মেন্টরিংসহ পেশাগত উন্নয়নে বিভিন্ন প্রশিক্ষণের আয়োজন করা হবে। এর পাশাপাশি বিভিন্ন এনজিও, বেসরকারি প্রতিষ্ঠান ও শীর্ষস্থানীয় করপোরেট প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে তাদের যোগাযোগ স্থাপনে সহায়তা করা হবে, যেন এই দক্ষ পেশাজীবী নারীরা নিজেদের যোগ্যতা অনুযায়ী কাজ খুঁজে নিতে পারেন।
ব্র্যাকের চিফ পিপল অ্যান্ড কালচার অফিসার মৌটুসী কবীর বলেন, ব্র্যাকের প্রতিষ্ঠাতা স্যার ফজলে হাসান আবেদ বলেছিলেন- ‘আমি আমার জীবনে কখনোই কোনো পরাজিত নারীকে দেখিনি’। এই বিশ্বাসই ব্র্যাক ব্রিজ রিটার্নশিপ প্রোগ্রামের ভিত্তি।
তিনি আরও বলেন, কাজ থেকে বিরতি দুর্বলতা নয়। একটি প্রতিষ্ঠিত ক্যারিয়ার থেকে সরে দাঁড়ানো বড় সিদ্ধান্ত, বড় ঝুঁকি। পেশায় বিরতি মানে দক্ষতার অভাব নয়। প্রতিভাবান নারীদের আবারও পেশাজীবনে ফিরতে, নেতৃত্ব দিতে এবং প্রভাব রাখার সুযোগ তৈরি করতেই ব্রিজ রিটার্নশিপ। এই উদ্যোগ নারীদের সম্ভাবনাকে নতুন করে জাগিয়ে তুলবে এবং তাদের এগিয়ে যাওয়ার পথকে শক্তিশালী করবে।
অনুষ্ঠানে জানানো হয়, ব্রিজ রিটার্নশিপের মূল লক্ষ্য হচ্ছে, যে নারীরা কোনো কারণে পেশা ছাড়তে বাধ্য হয়েছেন তাদের কর্মক্ষেত্রে পুনঃপ্রবেশে সহায়তা করা। ব্রিজ রিটার্নশিপে অংশগ্রহণকারীরা ব্র্যাকের বিভিন্ন কর্মসূচিতে প্রকল্পের তত্ত্বাবধান, গবেষণা ও অন্যান্য কাজে যুক্ত থাকবেন এবং সংশ্লিষ্ট বিভাগের কাজগুলো সুষ্ঠুভাবে সম্পাদনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবেন।
জেন্ডার ইকুয়ালিটি কোয়ালিশনের কমিউনিকেশন ম্যানেজার সেমন্তী মঞ্জরীর সঞ্চালনায় অনুষ্ঠিত এক প্যানেল আলোচনায় অংশ নিয়ে নিজেদের অভিজ্ঞতা তুলে ধরেন ব্রিজ রিটার্নশিপ কর্মসূচি থেকে ব্র্যাকে যোগদানকারী এলিজাবেথ মারান্ডি এবং ফারাহ মাহবুব। অনুষ্ঠানে রিটার্নশিপ কর্মসূচি সম্পর্কে নিজের অনুভূতি তুলে ধরেন একাত্তর টিভির বিশেষ প্রতিনিধি শাহনাজ শারমিন।
কর্মক্ষেত্র থেকে বিরতি নেওয়া নারীদের কাজে ফেরাতে ব্র্যাকের ব্রিজ রিটার্নশিপ কর্মসূচি গত বছর থেকে শুরু হয়েছে। প্রথমবার প্রায় এক হাজার ১০০ আবেদনকারীর মধ্য থেকে ১৫ জনকে বেছে নেওয়া হয়।
জেপিআই/কেএসআর