১৩ বছরের জানুয়ারিতে একদিনও নির্মল বাতাস পায়নি রাজধানীবাসী

রায়হান আহমেদ
রায়হান আহমেদ রায়হান আহমেদ , নিজস্ব প্রতিবেদক
প্রকাশিত: ০১:১৩ পিএম, ১০ মার্চ ২০২৬
ঢাকার সড়কে উড়ছে ধুলা। সেই ধুলা মেখেই চলতে হয় পথ। ছবি: জাগো নিউজ

‘সকালে বাসা থেকে বের হলেই ধুলা নাকে ঢুকে যায়। সম্প্রতি বিকেলের দিকে আবার মাতুয়াইলের দিক থেকে পোড়া বর্জ্যের গন্ধ প্রায় নাকে আসে। মাস্ক না পরলে শ্বাস নিতে কষ্ট হয়’, বলছিলেন রাজধানীর যাত্রাবাড়ী এলাকার বাসিন্দা মো. রাশেদ (ছদ্মনাম)।

তার বাসার পাশেই একটি নির্মাণাধীন ভবন। আর কিছু দূরেই মাতুয়াইল ল্যান্ডফিল। প্রতিদিন ধুলা ও পোড়া বর্জ্যের গন্ধে অতীষ্ঠ তিনি।

রাশেদের অভিজ্ঞতা একক কোনো ঘটনা নয়। রাজধানীর অধিকাংশ মানুষই শীত মৌসুমে অস্বাস্থ্যকর ও ঝুঁকিপূর্ণ বায়ুতে শ্বাস নিচ্ছেন।

১৩ বছরের জানুয়ারিতে একদিনও নির্মল বাতাস পায়নি রাজধানীবাসী

সম্প্রতি বায়ুমণ্ডলীয় দূষণ অধ্যয়ন কেন্দ্রের (ক্যাপস) এক গবেষণায় দেখা গেছে, গত ১৩ বছরের জানুয়ারি মাসের মোট ৩৪০ দিনের মধ্যে ঢাকার মানুষ একদিনও ভালো বা নির্মল বায়ুতে শ্বাস নিতে পারেননি।

ফলে রাজধানী ঢাকার জানুয়ারি মাসগুলো কাটছে অস্বাস্থ্যকর ও ঝুঁকিপূর্ণ বায়ুর মধ্যে। বিষাক্ত বাতাসেই শ্বাস নিতে হচ্ছে ঢাকার জনসাধারণকে। বিশেষ করে শীত এলেই বিষাক্ত হয়ে যায় ঢাকার বায়ু।

২০১৪ থেকে ২০২৬ সাল পর্যন্ত ঢাকার বায়ুমান সূচকের তথ্য বিশ্লেষণ করে ক্যাপস জানায়, জানুয়ারিজুড়ে নগরবাসী কার্যত দূষিত বাতাসেই বসবাস করছেন। সর্বশেষ ২০২৬ সালের জানুয়ারিতে মাত্র তিন দিন বায়ুমান ছিল ‘অস্বাস্থ্যকর’, ২২ দিন ‘খুব অস্বাস্থ্যকর’ এবং তিন দিন ‘অত্যন্ত অস্বাস্থ্যকর বা দুর্যোগপূর্ণ’ পর্যায়ে।

১৩ বছরের জানুয়ারিতে একদিনও নির্মল বাতাস পায়নি রাজধানীবাসী

এছাড়া ২০১৪ থেকে ২০২৬ সাল পর্যন্ত জানুয়ারি মাসের ৩৪০ দিনের তথ্য বিশ্লেষণে দেখা গেছে, ৭৫ দিন বায়ুমান ছিল ‘অস্বাস্থ্যকর’, ২২২ দিন ‘খুব অস্বাস্থ্যকর’ এবং ৪৩ দিন ‘অত্যন্ত অস্বাস্থ্যকর বা দুর্যোগপূর্ণ’ পর্যায়ে।

সংস্থাটি জানিয়েছে, ২০২৬ সালের জানুয়ারি মাসের বায়ুমান বাংলাদেশ পরিবেশ অধিদপ্তরের একিউআই সূচক অনুযায়ী ‘অস্বাস্থ্যকর’ হলেও গত ১৩ বছরের জানুয়ারিগুলোর মধ্যে এটি তুলনামূলকভাবে ষষ্ঠ অবস্থানে রয়েছে।

ক্যাপসের গবেষণা বলছে, জানুয়ারি মাসে ‘অত্যন্ত অস্বাস্থ্যকর বা দুর্যোগপূর্ণ’ বায়ুমানের ৪৩ দিনের মধ্যে সবচেয়ে বেশি ১০ দিন ছিল ২০২৩ সালে। এছাড়া ২০১৮ সালে ছয়দিন, ২০২২ সালে পাঁচদিন, ২০২০ সালে চারদিন, ২০১৫, ২০১৯ ও ২০২৬ সালে তিনদিন করে, ২০১৪, ২০১৭, ২০২৪ ও ২০২৫ সালে দুদিন করে এবং ২০১৬ সালে একদিন এই অবস্থায় ছিল।

সড়কে ধুলোবালি

বায়ুমণ্ডলীয় দূষণ অধ্যয়ন কেন্দ্রের চেয়ারম্যান ও স্টামফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক আহমদ কামরুজ্জমান মজুমদার জাগো নিউজকে বলেন, ‘একটা সময় ঢাকার বাইরের বর্জ্য পোড়ানোর গন্ধ ঢাকায় প্রবেশ করত না। এখন ল্যান্ডফিলগুলো সক্ষমতার বাইরে চলে গেছে। অটোমেটিক আগুন ধরে যাচ্ছে। এসব বাতাস বিষাক্ত হচ্ছে এবং গন্ধ রাজধানীর ভেতরে প্রবেশ করছে। আইনের কঠোর প্রয়োগ আর সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানের সমন্বয় না হলে দূষণ আরও ভয়ংকর হবে। এসব বিষয়ে আমরা বছরের পর বছর থেকে বলে আসছি। প্রশাসন যদি আন্তরিক না হয়, তাহলে দূষণ নিয়ন্ত্রণ সম্ভব হবে না।’

আহমদ কামরুজ্জমান বলেন, ঢাকায় দূষণের হটস্পট কিংবা কিছু কিছু জায়গায় যদি রিয়েল টাইম দূষণের ডেটা দেখানো যেত তাহলে মানুষের মধ্যে সচেতনতা আসতো। কোনো প্রতিষ্ঠান কিংবা কারা বেশি দূষণ করে সেই বিষয়ে জনগণের জানার একটা সুযোগ থাকত।

নগর পরিকল্পনাবিদরা বলছেন, বায়ুমানে সামান্য উন্নতির প্রবণতা দেখা গেলেও ঢাকার বাতাস এখনও জনস্বাস্থ্যের জন্য মারাত্মক ঝুঁকিপূর্ণ রয়ে গেছে। দূষণ নিয়ন্ত্রণে কার্যকর ব্যবস্থা না নিলে পরিস্থিতি আরও ভয়াবহ হতে পারে।

সড়কে ধুলোবালি

দূষণ নিয়ন্ত্রণে প্রাতিষ্ঠানিক সক্ষমতা নেই!

এদিকে দূষণ নিয়ন্ত্রণ না হওয়ায় নগর শাসনের দুর্বলতা, প্রাতিষ্ঠানিক সমন্বয়হীনতা, ব্যবসায়ী মহলের প্রভাব এবং আইন প্রয়োগের শিথিলতাকে দূষণ নিয়ন্ত্রণে ব্যর্থতার প্রধান কারণ বলে মনে করেন জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের নগর ও পরিকল্পনা বিভাগের শিক্ষক এবং বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব প্ল্যানার্স (বিআইপি) সভাপতি অধ্যাপক ড. আদিল মুহাম্মদ খান।

জাগো নিউজকে তিনি বলেন, বায়ুদূষণ নিয়ন্ত্রণের জন্য আমাদের প্রাতিষ্ঠানিক সক্ষমতার অভাব ও নগর শাসনের দুর্বলতা অনেক বেশি দায়ী। আইনপ্রয়োগের জন্য রাষ্ট্র যেভাবে কাজ করার কথা, সেভাবে করছে না। ইমারত নির্মাণ ও সড়ক খনন নীতিমালায় অত্যন্ত বিস্তারিতভাবে উল্লেখ আছে—কাজের শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত কীভাবে পরিচালনা করতে হবে। কিন্তু প্রশাসনিক মনিটরিং না থাকায় দূষণ কমছে না। নির্মাণ প্রক্রিয়ায় বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান দায়িত্ব পালন করছে না; রাজউক ও সিটি করপোরেশনের মধ্যে সমন্বয়হীনতা রয়েছে। বাস্তবে কোনো কোনো প্রতিষ্ঠান যথাযথ তদারকি করে না, ফলে স্থানীয় জনগণ দূষণ থেকে মুক্তি পায় না। অন্যদিকে ঠিকাদাররা আইনকে বৃদ্ধাঙ্গুলি দেখিয়ে দূষণ ঘটিয়েই যাচ্ছে। আইনের যথাযথ তদারকি হলে দূষণ অন্তত কিছুটা কমানো সম্ভব।

পলিউটার ট্যাক্স নীতি চালুর দাবি

অধ্যাপক আদিল মুহাম্মদ খান জাগো নিউজকে বলেন, ‘উন্নয়ন প্রকল্পে উন্নত বিশ্বের মতো পরিবেশগত প্রভাব মূল্যায়ন (EIA) অর্থাৎ পরিবেশ পারমিট প্রথা চালু করা জরুরি। তাহলে ঢাকায় পরিবেশ বিধ্বংসী উন্নয়ন কার্যক্রমের অনুমোদন পাওয়া কঠিন হবে। এছাড়া সিটি করপোরেশন এলাকাভিত্তিক নির্মাণ সাইটে সেন্সর স্থাপন করতে হবে, যাতে প্রতিদিন কোনো এলাকায় দূষণের মাত্রা রিয়েল টাইমে দেখে নির্ধারিত মানদণ্ড অতিক্রম করলে তাকে জরিমানা করতে হবে। এক্ষেত্রে ফিটনেসবিহীন গাড়ি, নির্মাণাধীন প্রতিষ্ঠান, কল-কারখানাকে এর আওতায় রাখা হলে এসব প্রতিষ্ঠান মাত্রা অতিক্রম করলে তাদের পলিউটার ট্যাক্সের আওতায় নিয়ে আসতে হবে।

আরএএস/এমএমএআর/

পাঠকপ্রিয় অনলাইন নিউজ পোর্টাল জাগোনিউজ২৪.কমে লিখতে পারেন আপনিও। লেখার বিষয় ফিচার, ভ্রমণ, লাইফস্টাইল, ক্যারিয়ার, তথ্যপ্রযুক্তি, কৃষি ও প্রকৃতি। আজই আপনার লেখাটি পাঠিয়ে দিন [email protected] ঠিকানায়।