চুক্তিতে নিয়োগের সেই পুরোনো ধারায়ই কি প্রশাসন?
প্রশাসনে চুক্তিভিত্তিক নিয়োগ খুবই পরিচিত একটি প্রক্রিয়া। এতে অবসরে যাওয়া অনেক কর্মকর্তা সুযোগ পেলেও বঞ্চিত হন চাকরিতে থাকা অনেক যোগ্য কর্মকর্তা। ফলে একটা শ্রেণির কর্মকর্তাদের মধ্যে অসন্তোষও তৈরি হয়। বিগত সময়ে, বিশেষ করে আওয়ামী লীগের তিনটি আমলে প্রশাসনে নির্বিচারে চুক্তিভিত্তিক নিয়োগ দেওয়া হয়েছে। এটি ভারসাম্য নষ্ট করে প্রশাসনকে বিশৃঙ্খল করে তুলেছিল।
গণঅভ্যুত্থানের পর অন্তর্বর্তী সরকারের সময়েও বিশেষ পরিস্থিতিতে চুক্তিতে নিয়োগ অব্যাহত ছিল। আবার ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের পর সরকার গঠন করে বিএনপি। প্রশাসন সাজানোর ক্ষেত্রে তারাও অনেক ক্ষেত্রে চুক্তির পথেই হাঁটছে।
তবে সরকারের পক্ষ থেকে বলা হচ্ছে, অপরিহার্য না হলে কাউকে চুক্তিভিত্তিক নিয়োগ দেওয়া হচ্ছে না।
জনপ্রশাসন বিশেষজ্ঞ ও সাবেক আমলারা বলছেন, নতুন একটা সরকারকে গুছিয়ে নিতে চুক্তিভিত্তিক নিয়োগের ক্ষেত্রে কিছুটা ছাড় দেওয়া যেতে পারে। তবে দীর্ঘ মেয়াদে চুক্তিতে নিয়োগের ওপর সরকারের নির্ভরশীল হওয়া ঠিক হবে না।
এখন ‘সরকারি চাকরি আইন, ২০১৮’ অনুযায়ী অবসরে যাওয়া যে কাউকেই চুক্তিতে চাকরিতে ফেরাতে পারে সরকার। তবে নিয়মিত ব্যাচের কর্মরত কর্মকর্তাদের বাদ দিয়ে এভাবে নিয়োগ দিলে কর্মকর্তাদের ওপর নেতিবাচক প্রভাব পড়ে। এতে তাদের পেশাদারত্ব ক্ষতিগ্রস্ত হয়। ভবিষ্যতের কথা ভেবে অনেক ক্ষেত্রেই সরকারি কর্মকর্তারা দলীয় আনুকূল্য অর্জনের চেষ্টা করেন।
মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তারা বলছেন, সাধারণত সরকারের আস্থাভাজন কর্মকর্তাদেরই চাকরির মেয়াদ শেষে চুক্তিতে নিয়োগ দেওয়া হয়। এর ফলে নিয়মিতদের মধ্যে যোগ্য অনেক কর্মকর্তাই গুরুত্বপূর্ণ পদগুলোতে পদোন্নতি পান না।
‘সরকারি চাকরি আইন, ২০১৮’ অনুযায়ী অবসরে যাওয়া যে কাউকেই চুক্তিতে চাকরিতে ফেরাতে পারে সরকার। তবে নিয়মিত ব্যাচের কর্মরত কর্মকর্তাদের বাদ দিয়ে এভাবে নিয়োগ দিলে কর্মকর্তাদের ওপর নেতিবাচক প্রভাব পড়ে। এতে তাদের পেশাদারত্ব ক্ষতিগ্রস্ত হয়। ভবিষ্যতের কথা ভেবে অনেক ক্ষেত্রেই সরকারি কর্মকর্তারা দলীয় আনুকূল্য অর্জনের চেষ্টা করেন
তাই, নিয়মিত কর্মকর্তারা সবসময়ই চুক্তিতে নিয়োগের বিরোধিতা করে আসছেন। এটি কর্মকর্তাদের মধ্যে ক্ষোভ তৈরি করে।
গত ১২ ফেব্রুয়ারি ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়। নির্বাচনে দুই-তৃতীয়াংশের বেশি সংখ্যাগরিষ্ঠতা পেয়ে ১৭ ফেব্রুয়ারি সরকার গঠন করে বিএনপি।

বর্তমানে সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীরা ৫৯ বছর বয়স পর্যন্ত চাকরি করতে পারেন। আর বীর মুক্তিযোদ্ধা হলে অবসরের বয়স ৬০ বছর।
জনপ্রশাসনের বিশেষায়িত বা কারিগরি পদে কর্মকর্তা সংকটের কারণে গত শতকের আশির দশকে চুক্তিভিত্তিক নিয়োগের প্রচলন হয়। কিন্তু পরে বিষয়টি প্রশাসন রাজনীতিকীকরণের অন্যতম হাতিয়ার হয়ে ওঠে। সরকারগুলো চুক্তিভিত্তিক নিয়োগের মাধ্যমে দলীয় ও আস্থাভাজন কর্মকর্তাদের চাকরিতে রেখে দিচ্ছেন। তবে আওয়ামী লীগের সরকারের সময়ে চুক্তিভিত্তিক নিয়োগের অপব্যবহার সবচেয়ে বেশি হয়েছে বলে জানিয়েছেন জনপ্রশাসন বিশেষজ্ঞরা।
আরও পড়ুন
৯ সচিবের চুক্তিভিত্তিক নিয়োগ বাতিল
এলজিইডির প্রধান প্রকৌশলী পদে চুক্তিভিত্তিক নিয়োগ নিয়ে বিতর্ক
চুক্তিভিত্তিক নিয়োগ পাওয়া বাহারুল আলমের অবশিষ্ট মেয়াদ বাতিল
চলমান চুক্তিভিত্তিক নিয়োগের বিরোধিতা করে ২০১৪ সালের ১ মার্চ তখনকার জনপ্রশাসন প্রতিমন্ত্রী ইসমাত আরা সাদেকের কাছে একটি চিঠি পাঠিয়েছিলেন ওই সময়ের অর্থমন্ত্রী আবুল মাল আবদুল মুহিত। চুক্তিভিত্তিক নিয়োগ দিতে হলে এর জন্য একটি নীতিমালা প্রণয়নের তাগিদ দিয়েছিলেন তিনি। কিন্তু কোনো সরকারই তা করেনি।
একজন অতিরিক্ত সচিব নাম প্রকাশ না করে জাগো নিউজকে বলেন, ‘কোনো সরকারই চুক্তিভিত্তিক নিয়োগ নিয়ে সুনির্দিষ্ট কোনো নীতিমালা করেনি, কারণ এতে এটি অপব্যবহারের সুযোগ কমে যাবে। মূলত আস্থাভাজন ও দলীয় লোকদের নিয়োগ দেওয়ার জন্য চুক্তিভিত্তিক নিয়োগের সুযোগটি ব্যবহার করা হয়। বাছ-বিচারহীনভাবে চুক্তিভিত্তিক নিয়োগ নিয়মিত কর্মকর্তাদের বঞ্চিত করে।’
মূলত ‘সরকারি চাকরি আইন, ২০১৮’ এর ৪৯ ধারার ক্ষমতাবলে জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয় চুক্তিভিত্তিক নিয়োগ দিয়ে থাকে। আইনের ৪৯ ধারার ১-উপধারায় বলা হয়েছে, ‘রাষ্ট্রপতি জনস্বার্থে কোনো কর্মচারীকে চাকরি হইতে অবসর গ্রহণের পর, সরকারি চাকরিতে চুক্তিভিত্তিক নিয়োগ করিতে পারিবেন।’ উপধারা-২ এ বলা হয়েছে ‘উপ-ধারা (১) এর অধীন চুক্তিভিত্তিক নিয়োগপ্রাপ্ত কর্মচারী অবসর-উত্তর ছুটি ভোগরত থাকিলে, উক্ত ছুটি স্থগিত থাকিবে এবং চুক্তিভিত্তিক নিয়োগ সমাপ্তির পর উক্ত অবশিষ্ট অবসর-উত্তর ছুটি ও তদ্সংশ্লিষ্ট সুবিধা ভোগ করা যাইবে।’
সাবেক সচিব এ কে এম আবদুল আউয়াল মজুমদার জাগো নিউজকে বলেন, ‘নতুন একটি সরকারকে চুক্তিতে নিয়োগের ক্ষেত্রে কিছুটা ছাড় দেওয়া লাগবে। এ কারণে তাদের চুক্তি দিতে হবে যে, অনেক কর্মকর্তা বিএনপির অপবাদ নিয়ে গত ১৫/১৬ বছর অনেক কষ্ট করেছেন। যেহেতু বিএনপির তকমা তাদের গায়ে লেগেছে, তাই বিএনপি তো তাদের একেবারে ছুঁড়ে ফেলে দিতে পারে না।’
তিনি বলেন, ‘সবাইকে তো চুক্তি দেওয়া সম্ভব নয়। সেক্ষেত্রে সরকারের উচিত হবে, অল্পসল্প কিছু কর্মকর্তাকে দেওয়া- যারা যোগ্য, দক্ষ ও সৎ; যারা দেশের কাজে লাগবে।’
চুক্তিভিত্তিক নিয়োগ সব সময়েই হয়েছে জানিয়ে আবদুল আউয়াল মজুমদার বলেন, ‘তবে আওয়ামী লীগ আমলে ঢালাওভাবে হয়েছে। সেভাবে যেন না হয়, সেই বিষয়ে নজর দিতে হবে। সেভাবে এ সরকার করলে সেটা সরকার ও দেশের জন্য ভালো হবে না।’
নতুন একটি সরকার এলে একটি গ্যাপ সৃষ্টি হয়। বিভিন্নভাবে এতদিন গেছে। জুলাই বিপ্লবের মধ্যদিয়ে একটি সরকার গঠিত হয়েছে। সেই সরকার দেশ পরিচালনাও করেছে। এখন আবার নির্বাচনের মাধ্যমে দলীয় সরকার এসেছে। প্রত্যেকটি সরকারের নিজস্ব কিছু পলিসি থাকে। সরকারের মেনিফেস্টো থাকে, সেগুলো বাস্তবায়নের বিষয় থাকে। সেক্ষেত্রে দু-চারজন এক্সপার্টাইজ ব্যক্তিকে চুক্তিভিত্তিক নিয়োগ দিতে হয়। তবে এটা সাময়িক।-মো. আব্দুল বারী, প্রতিমন্ত্রী, জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়
‘যারা সার্ভিসে আছেন তাদের পদোন্নতি দেওয়ার ক্ষেত্রেও একটি সমস্যা আছে। ধরেন একটি ব্যাচে ৩০০ জন কর্মকর্তা আছেন। এর মধ্যে সচিব হবেন ২০ জন। কিন্তু, ৩০০ জনই মনে করেন আমি সচিব হবো। এটাও তো একটা মানসিক রোগের মতোই।’

‘আর চুক্তির ক্ষেত্রে থাকে তদবির, দলাদলি থাকে। তাই সরকারের উচিত একটা যুক্তিসংগত জায়গায় থেকে যারা মেধাবী তাদের চুক্তি (চুক্তিতে নিয়োগ) দেওয়া। ভেতর থেকেও যারা যোগ্য তাদের পদোন্নতি দেওয়া। কিন্তু, দল দেখে এটা করলে লাভ হবে না।’ যোগ করেন জনপ্রশাসন বিশেষজ্ঞ আবদুল আউয়াল মজুমদার।
সাবেক এ আমলা আরও বলেন, ‘তবে এটা ভালো যে, এ সরকার কাউকে এক বছরের বেশি চুক্তি দিচ্ছে না। যদি দেখা যায় এক বছর তার পারফরম্যান্স ভালো, তাহলে তার মেয়াদ বাড়বে। না হয় এক বছর পরই বিদায় করে দেওয়া উচিত হবে।’
আরও পড়ুন
১৩ সচিব পদ খালি
যে কারণে ১০ মাসেও শৃঙ্খলা ফেরেনি প্রশাসনে
৫ লাখ সরকারি কর্মচারী নিয়োগের সিদ্ধান্ত হয়েছে: প্রধানমন্ত্রী
চুক্তিভিত্তিক নিয়োগের বিষয়ে জনপ্রশাসন প্রতিমন্ত্রী মো. আব্দুল বারী জাগো নিউজকে বলেন, ‘সরকারের স্বাভাবিক কার্যক্রম চালাতে গিয়ে যেভাবে চুক্তি দেওয়া দরকার, সেভাবেই চুক্তিভিত্তিক নিয়োগ দেওয়া হচ্ছে।’
তিনি বলেন, ‘নতুন একটি সরকার এলে একটি গ্যাপ সৃষ্টি হয়। বিভিন্নভাবে এতদিন গেছে। জুলাই বিপ্লবের মধ্যদিয়ে একটি সরকার গঠিত হয়েছে। সেই সরকার দেশ পরিচালনাও করেছে। এখন আবার নির্বাচনের মাধ্যমে দলীয় সরকার এসেছে। প্রত্যেকটি সরকারের নিজস্ব কিছু পলিসি থাকে। সরকারের মেনিফেস্টো থাকে, সেগুলো বাস্তবায়নের বিষয় থাকে। সেক্ষেত্রে দু-চারজন এক্সপার্টাইজ ব্যক্তিকে চুক্তিভিত্তিক নিয়োগ দিতে হয়। তবে এটা সাময়িক।’
প্রতিমন্ত্রী বলেন, ‘আমরা তো ঢালাওভাবে চুক্তিভিত্তিক নিয়োগ দিচ্ছি না। একেবারে প্রয়োজন ছাড়া কাউকে চুক্তিতে নিয়োগ দেওয়া হচ্ছে না। এছাড়া আমরা কাউকে এক বছরের বেশি সময়ের জন্য চুক্তিতে নিয়োগও দিচ্ছি না।’
নতুন সরকারের চুক্তিতে যত নিয়োগ
তারেক রহমানের নেতৃত্বাধীন বিএনপি সরকার দায়িত্ব নেওয়ার পর ১৮ ফেব্রুয়ারি অবসরপ্রাপ্ত সচিব এ বি এম আবদুস সাত্তারকে চুক্তিতে এক বছরের জন্য প্রধানমন্ত্রীর মুখ্য সচিব নিয়োগ দেওয়া হয়। অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ে চুক্তিভিত্তিক নিয়োগ পাওয়া মন্ত্রিপরিষদ সচিব নাসিমুল গনি ও জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের সিনিয়র সচিব মো. এহছানুল হক এখনো দায়িত্ব পালন করছেন।
চুক্তির ক্ষেত্রে থাকে তদবির, দলাদলি থাকে। তাই সরকারের উচিত একটা যুক্তিসংগত জায়গায় থেকে যারা মেধাবী তাদের চুক্তি (চুক্তিতে নিয়োগ) দেওয়া। ভেতর থেকেও যারা যোগ্য তাদের পদোন্নতি দেওয়া। কিন্তু, দল দেখে এটা করলে লাভ হবে না।- এ কে এম আবদুল আউয়াল মজুমদার, সাবেক সচিব ও জনপ্রশাসন বিশেষজ্ঞ
২৪ ফেব্রুয়ারি স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সিনিয়র সচিব মনজুর মোর্শেদ চৌধুরীকে চুক্তিতে এক বছরের জন্য নিয়োগ দেয় বিএনপি সরকার।
১ মার্চ চুক্তিতে ধর্ম সচিব নিয়োগ পান অবসরপ্রাপ্ত যুগ্ম-সচিব মুন্সী আলাউদ্দিন আল আজাদ। তিনিও এক বছরের জন্য চুক্তিতে এ নিয়োগ পান।
৩ মার্চ চুক্তিভিত্তিতে চার মন্ত্রণালয় ও বিভাগে চারজন সচিব নিয়োগ দেয় সরকার। তারা সবাই অবসরপ্রাপ্ত কর্মকর্তা। এর মধ্যে মো. শহীদুল হাসানকে স্থানীয় সরকার বিভাগে, রফিকুল আই মোহাম্মদকে কৃষি মন্ত্রণালয়ে, আবদুল খালেককে মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা বিভাগে এবং মো. কামরুজ্জামান চৌধুরীকে স্বাস্থ্যসেবা বিভাগের সচিব হিসেবে নিয়োগ দেওয়া হয়। সবাইকে এক বছরের জন্য চুক্তিতে নিয়োগ দেওয়া হয়।
গত ১৫ মার্চ প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের এসডিজি বিষয়ক মুখ্য সমন্বয়ক পদে চুক্তিতে নিয়োগ পান পাবনা বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্যের দায়িত্বে থাকা খুলনা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক ড. এস এম আব্দুল আওয়াল।
২৫ মার্চ এস এম এবাদুর রহমানকে এক বছরের চুক্তিতে অর্থনৈতিক সম্পর্ক বিভাগের সচিব নিয়োগ দেওয়া হয়।
২৪ মার্চ স্থানীয় সরকার প্রকৌশল অধিদপ্তরের (এলজিইডি) প্রধান প্রকৌশলী হিসেবে মো. আব্দুর রশীদ মিয়াকে এক বছরের জন্য নিয়োগ দেওয়া হয়। কিন্তু, তার বিরুদ্ধে দুর্নীতির অভিযোগ থাকায় ২৮ মার্চ তার সেই নিয়োগ আদেশ আবার বাতিলও হয়।
আরএমএম/ইএ