জামায়াতের কোনো ব্যাংক নেই: সংসদে তাহের

জ্যেষ্ঠ প্রতিবেদক
জ্যেষ্ঠ প্রতিবেদক জ্যেষ্ঠ প্রতিবেদক
প্রকাশিত: ০৮:০৫ পিএম, ৩০ এপ্রিল ২০২৬
সংসদ অধিবেশনে কথা বলেন জামায়াতে ইসলামীর নায়েবে আমির সৈয়দ আব্দুল্লাহ মো. তাহের/ ছবি- সংগৃহীত

জামায়াতে ইসলামীর কোনো ব্যাংক নেই বলে জাতীয় সংসদে জানিয়েছেন সংসদের বিরোধীদলীয় উপনেতা ও দলটির নায়েবে আমির সৈয়দ আব্দুল্লাহ মো. তাহের।

তিনি বলেন, আমাদের যারা এমপি আছি, ইসলামী ব্যাংকে তাদের কেউ পরিচালক নেই। আমরা কোনো ঋণ পুনঃতফসিলও করিনি।
 
বৃহস্পতিবার (৩০ এপ্রিল) জাতীয় সংসদে রাষ্ট্রপতির ভাষণের ওপর আনীত ধন্যবাদ প্রস্তাবের আলোচনায় অংশ নিয়ে তিনি এ কথা বলেন। 
 
এর আগে অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী জামায়াতের দিকে ইঙ্গিত করে বলেন, অনেক দল আছে তাদের নাকি ব্যাংকও আছে। বিএনপির ব্যাংক নেই। 
বিষয়টির জবাব দিতে গিয়ে তাহের আরও বলেন, ইসলামী ব্যাংক ছিল একদল সৎ ও উদ্যোগী মানুষের প্রচেষ্টার ফসল। যদি বলেন ইসলামী ব্যাংক পরিচালনায় আমাদের ভূমিকা আছে, তবে আমরা তা স্বীকার করি।
 
রাজাকার, আল-বদর প্রসঙ্গেও নিজেদের অবস্থান তুলে ধরেন জামায়াতের এই নেতা। তিনি বলেন, আজ আমাদের অনেক বেশি করে রাজাকার, আল-বদর বলার চেষ্টা করা হচ্ছে। আমরা যারা এখানে বসে আছি, আমরা কেউ রাজাকার বা আল-বদর ছিলাম না। আমরা জামায়াতে ইসলামীর বর্তমান নেতৃত্ব। যদি বীর মুক্তিযোদ্ধাদের কথা বলেন, তবে আমিও একজন ‘শিশু মুক্তিযোদ্ধা’।

সৈয়দ আব্দুল্লাহ মো. তাহের আরও বলেন, আমার বাড়ি ছিল সীমান্তের কাছে। যারা ভারতে শরণার্থী হিসেবে যেত, তারা আমাদের বাড়িতে আশ্রয় নিত, আমরা তাদের নাস্তা খাওয়াতাম এবং সেনাবাহিনী টহল দিচ্ছে কি না, তা পাহারা দিতাম। সেনাবাহিনী দূরে থাকলে আমরা তাদের পথ দেখিয়ে দিতাম, যাতে তারা নিরাপদে ভারতে পার হতে পারেন। সুতরাং, এ ধরনের দাবি করার অধিকার কারও নেই।
 
এ সময় তাহের আওয়ামী লীগের মন্ত্রিসভায় ‘রাজাকার’ মাওলানা নুরুল ইসলাম ও জিয়াউর রহমানের মন্ত্রিসভায় শাহ আজিজের মতো ব্যক্তিদের রাখার কথা স্মরণ করিয়ে দেন।

বক্তব্যের শেষ দিকে সরকার ও বিরোধী দলের মধ্যে সমঝোতা এবং সুস্থ রাজনৈতিক পরিবেশ বজায় রাখার আহ্বান জানিয়ে এই জামায়াত নেতা বলেন, দেশের নীতির ব্যাপারে মতপার্থক্য থাকলে আমরা তার বিরোধিতা করি, কিন্তু দলে দলে এই রেষারেষি পরিবেশকে সুন্দর রাখবে না। এতে দেশ ও আমরা সবাই ক্ষতিগ্রস্ত হবো।

১৯৯১ সালে বিএনপিকে সরকার গঠনে সমর্থন দিয়ে ১৯৯৬ সালে জামায়াত আলাদা নির্বাচন করে। তার জন্য ওই সময় বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ে ছাত্রদল-ছাত্রশিবিরের সংঘর্ষকে দায়ী করেন তাহের। তিনি বলেন, এবারও সেরকম কিছু লক্ষণ দেখা যাচ্ছে। এ ধরনের ঘটনা ঘটতে থাকলে পরিস্থিতি খারাপ হবে। আমরা চাই এই সংসদ ও এই সরকার সুস্থ ধারায় চলুক। বিশ্ববিদ্যালয়ে যেসব গণ্ডগোল হচ্ছে, সেদিকে আপনারা নজর দিন। যারাই বিশৃঙ্খলা করবে তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিন।
 
দুই-তৃতীয়াংশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা নিয়ে গঠিত অতীতের সরকারের পরিণতি সম্পর্কে বিএনপিকে সতর্ক করেন বিরোধী দলীয় উপনেতা। অতীত উদাহরণ টেনে তিনি বলেন, দুই-তৃতীয়াংশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা থাকা সত্ত্বেও ইন্দিরা গান্ধী ক্ষমতাচ্যুত হয়েছিলেন, শেখ সাহেব (শেখ মুজিবুর রহমান) নিহত হয়েছিলেন… শহীদ জিয়াউর রহমানের সময়ের ঘটনাগুলো আমাদের আতঙ্কিত করে।
 
দুই-তৃতীয়াংশ সংখ্যাগরিষ্ঠতার ঝুঁকির কথা উল্লেখ করে সৈয়দ আব্দুল্লাহ মো. তাহের বলেন, উপমহাদেশে ভারতে ইন্দিরা গান্ধীর সময়ে, পাকিস্তানে বেনজির ভুট্টোর সময়ে, বাংলাদেশে শেখ সাহেবের (শেখ মুজিবুর রহমান) সময়ে, তারপর শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের সময়ে এবং বেগম খালেদা জিয়ার সময়ে আমরা অবস্থা দেখেছি। এর একটা ভয়ঙ্কর পরিণতি আমরা দেখি। সেখান থেকে শিক্ষা নিয়েই আমরা চাই, এ ধরনের কোনো অঘটন বাংলাদেশে আর কখনো না ঘটুক।

আরও পড়ুন
রাষ্ট্রপতির কোনো অধিকার নেই বঙ্গভবনে থাকার: নাহিদ 
সংসদে নিজের কলেজের শিক্ষার্থীদের সঙ্গে প্রধানমন্ত্রীর শুভেচ্ছা বিনিময় 
 
বক্তব্যের শুরুতেই তিনি সংসদের বর্তমান অবস্থাকে অতীতের সঙ্গে তুলনা করে বলেন, আজকে যারা সরকারি দলের আসনে আছেন, তারা বোধহয় আওয়ামী লীগ থেকে এসেছেন। আর আমরা যারা এদিকে আছি, তারা বোধহয় জামায়াত-বিএনপির সংসদ সদস্য। কারণ হচ্ছে, আওয়ামী লীগ যখন ক্ষমতায় ছিল এবং আমরা বিরোধী দলে ছিলাম, তখন আওয়ামী লীগ যে ভাষায়, যে ভঙ্গিতে, যে চেতনায় এবং যেমন বিষয়ে জামায়াতের বিরুদ্ধে বলতো এবং আচরণ করতো, ঠিক আজকে সরকারি দলের পক্ষ থেকে আমরা একই ধরনের আচরণ লক্ষ্য করছি।  
তিনি স্মরণ করিয়ে দেন, এই সংগ্রামে বিএনপি, জামায়াত এবং অন্যান্য দলগুলো আওয়ামী লীগের বিরুদ্ধে সমানভাবে সংগ্রামে একত্রিত ছিলাম। অনেক সময় গোপনে একই গাড়িতে চড়ে ঘুরে ঘুরে আওয়ামী লীগ বিরোধী আন্দোলনের কর্মকৌশল এবং কর্মসূচি ঠিক করেছিলেন।
 
আন্দোলনের সময়কার ঐক্যের প্রসঙ্গ তুলে তাহের বলেন, আমরা সবাই তখন বলেছি যে, আমরা এই সংগ্রামের মাধ্যমে আওয়ামী লীগের এই পতনের পর যে রাজনীতি হবে… আমরা সকলে মিলে একটা সুশাসনের জন্য কাজ করবো। এ পর্যন্ত কিন্তু আমরা পুরোপুরি ঐকমত্যে ছিলাম।

নির্বাচনের পর পরিস্থিতি বদলে গেছে উল্লেখ করে তিনি মন্তব্য করেন, সরকার গঠনের পরে আমরা আবার একটা ভিন্ন চিত্র দেখতে পাচ্ছি, যেটা এই জাতিকে হতাশ করবে।

সংসদীয় আচরণে পরিবর্তনের প্রয়োজনীয়তার ওপর জোর দিয়ে জামায়াতের এই নেতা বলেন, শুধু সংসদে মুক্তি দিয়ে এটা অর্জন করা যাবে না। এজন্য সত্যিকারভাবেই আমাদের মনের পরিবর্তন এবং আমাদের দৃষ্টিভঙ্গির পরিবর্তন দরকার। একই সঙ্গে বিরোধী দল হিসেবে দায়িত্বশীল ভূমিকার কথাও তুলে ধরে বলেন, আমরা এখানে অন্যান্য যে ঐতিহ্যগুলো আগে ছিল— কিছু হলেই ‘মানি না’, ‘আসবো না’, গণ্ডগোল করা— সেটা কিন্তু আমরা করিনি।

সংসদে ব্যবহৃত ভাষা নিয়েও ক্ষোভ প্রকাশ করে তাহের বলেন, গতকাল আমি শুনেছি স্বাস্থ্যমন্ত্রী নাকি ‘তুই রাজাকার’ বলেছেন। সংসদের ভেতরে আমার মনে হয় এটি খুবই অরুচিকর ও অসংগত একটি শব্দ।
 
‘জুলাই সনদ’ প্রসঙ্গে তিনি অভিযোগ করেন, ৩১টি রাজনৈতিক দল একত্রিত হয়ে তৈরি করেছিলাম। কিন্তু পরবর্তীতে কতগুলো জিনিস যে দল সংখ্যাগরিষ্ঠতা পাবে তারা তাদের অনুসারী করবে— এটা কিন্তু আমাদের আলোচনার অংশ ছিল না। সেটা ছিল জুলাই সনদের সঙ্গে এক ধরনের প্রতারণা।

গণভোট ইস্যুতেও দ্বিমত তুলে ধরে বিরোধী দলীয় উপনেতা বলেন, আমরা চেয়েছিলাম যে গণভোট এবং জাতীয় নির্বাচন আলাদাভাবে হবে। কিন্তু বিএনপির পক্ষ থেকে খুব জোরালোভাবে বলা হয়েছিল যে গণভোট এবং জাতীয় নির্বাচন একসঙ্গে হতে হবে। আপনাদের দাবির পরিপ্রেক্ষিতেই আমাদের নারাজি সত্ত্বেও গণভোট ও জাতীয় নির্বাচন একসঙ্গে হয়েছে।

তিনি সতর্ক করেন, দেশের জন্য যেটা কল্যাণকর তা বাদ দিয়ে যদি দুই-তৃতীয়াংশ সংখ্যাগরিষ্ঠতার ভিত্তিতে যা ইচ্ছা তাই করতে থাকেন, তবে এ দেশ আবার পিছিয়ে যাবে।
 
জামায়াত পাকিস্তান গঠনের বিরুদ্ধে ছিল, এ তথ্যের প্রতিবাদ জানিয়ে তাহের বলেন, আমরা বা জামায়াতে ইসলামী পাকিস্তানের বিরোধী ছিল বলে যে তথ্য আসছে, তা একেবারেই অসত্য। মাওলানা মওদুদী ছিলেন ‘দ্বিজাতি তত্ত্বের’ প্রথম প্রবক্তা, তিনি সম্পূর্ণভাবে পাকিস্তানের পক্ষে ছিলেন।
 
বিএনপির সাবেক চেয়ারপারসন খালেদা জিয়ার কারাবাসের সময় অবস্থান নিয়েও বক্তব্য দেন তিনি। তার ভাষায়, ম্যাডাম (বেগম জিয়া) যখন জেলে ছিলেন, তখন জামায়াত কোনো বিবৃতি দেয়নি— এটা একেবারে অসত্য কথা। আমরা বারবার বিবৃতি দিয়েছি, শুধু বক্তব্যই নয়, উনার মুক্তির জন্য রাজপথে মিছিলও করেছি।

এমওএস/কেএসআর

পাঠকপ্রিয় অনলাইন নিউজ পোর্টাল জাগোনিউজ২৪.কমে লিখতে পারেন আপনিও। লেখার বিষয় ফিচার, ভ্রমণ, লাইফস্টাইল, ক্যারিয়ার, তথ্যপ্রযুক্তি, ধর্ম, কৃষি ও প্রকৃতি। আজই আপনার লেখাটি পাঠিয়ে দিন [email protected] ঠিকানায়।