সংরক্ষিত নারী আসনে নির্বাচিতরা ৬৫ শতাংশ কোটিপতি: টিআইবি
ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন ২০২৬-এর সংরক্ষিত নারী আসনের নির্বাচিতদের প্রায় দুই-তৃতীয়াংশই উচ্চশিক্ষিত ও কোটিপতি বলে জানিয়েছে ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশ (টিআইবি)।
বৃহস্পতিবার (৩০ জানুয়ারি) নির্বাচন কমিশনে জমা দেওয়া ৪৯ জন প্রার্থীর হলফনামার তথ্য বিশ্লেষণ করে এ চিত্র তুলে ধরে সংস্থাটি।
এতে বলা হয়, নির্বাচিতদের মধ্যে প্রায় ৬৫ শতাংশ কোটিপতি এবং ৬৩ শতাংশের বেশি প্রার্থী স্নাতকোত্তর বা তদূর্ধ্ব শিক্ষাগত যোগ্যতাসম্পন্ন। সাধারণ আসনের চেয়ে এগিয়ে সংরক্ষিত নারী আসনের প্রার্থীরা শিক্ষাগত যোগ্যতায় সরাসরি নির্বাচিত সংসদ সদস্যদের তুলনায় উল্লেখযোগ্যভাবে এগিয়ে আছেন।
স্নাতকোত্তর ও তদূর্ধ্ব ডিগ্রিধারী প্রার্থীর হার ৬৩ দশমিক ৩ শতাংশ, যেখানে নির্বাচিত সংসদ সদস্যদের ক্ষেত্রে এই হার ৫০ দশমিক ৭ শতাংশ। সার্বিকভাবে সরাসরি ভোটে নির্বাচিত ও সংরক্ষিত নারী আসনসহ সব সদস্যের মধ্যে ৫২ দশমিক ৬৩ শতাংশই স্নাতকোত্তর ও তদূর্ধ্ব ডিগ্রিধারী।
সংরক্ষিত নারী আসনের প্রার্থীদের মধ্যে ২৭ শতাংশ স্নাতক এবং ৪ দশমিক ১ শতাংশ উচ্চমাধ্যমিক পাস। স্বশিক্ষিত প্রার্থীর হার ৪ দশমিক ১ শতাংশ এবং মাধ্যমিক পাস প্রার্থীর হার ২ দশমিক ১ শতাংশ।
বিশ্লেষণ অনুযায়ী, সংরক্ষিত আসনের প্রার্থীদের বড় অংশই সম্পদশালী। মোট ৪৯ জন প্রার্থীর মধ্যে ৩২ জনই (৬৫ দশমিক ৩১%) স্থাবর ও অস্থাবর সম্পত্তির মোট মূল্যমান অনুযায়ী কোটিপতি। এদের মধ্যে আবার আলাদাভাবে অস্থাবর সম্পত্তির ভিত্তিতে কোটিপতি ২৫ জন এবং স্থাবর সম্পত্তির ভিত্তিতে কোটিপতি ১৪ জন।
দলীয়ভিত্তিতে কোটিপতি প্রার্থীর সংখ্যা বিশ্লেষণে দেখা যায়, বিএনপির ৩৬ জন প্রার্থীর মধ্যে ২৬ জন (৭২.২২%) এবং জামায়াতে ইসলামীর ৯ জন প্রার্থীর মধ্যে ৫ জন (৫৬%) কোটিপতি। এছাড়া জাগপার একমাত্র প্রার্থীও কোটিপতি।
আর গড় বার্ষিক আয় ১০ লাখ টাকার ওপরে এমন প্রার্থীর হার ৩৮ দশমিক ৭৮ শতাংশ (১৯ জন); সরাসরি ভোটে সাধারণ আসনে নির্বাচিত সংসদ সদস্যের মধ্যে এই হার ৬৭ দশমিক ৯ শতাংশ। তবে সার্বিকভাবে ত্রয়োদশ সংসদ নির্বাচনে সরাসরি ভোটে নির্বাচিত ও সংরক্ষিত নারী আসনসহ সব সদস্যের মধ্যে মোট কোটিপতির সংখ্যা ২৬৯ জন, যা শতকরা হিসাবে ৭৭ দশমিক ৩ শতাংশ।
আইনজীবীর সংখ্যা বেশি
হলফনামার তথ্য অনুযায়ী, সংরক্ষিত আসনের নারী প্রার্থীদের মধ্যে আইনজীবীর সংখ্যা সর্বাধিক‒ ২৬ দশমিক ৫ শতাংশ, যা নির্বাচিত সাধারণ আসনের সংসদ সদস্যদের (১১ শতাংশ) তুলনায় দ্বিগুণেরও বেশি। দ্বিতীয় সর্বোচ্চ পেশা হিসেবে রয়েছে ব্যবসা (২২.৫%)। এছাড়া গৃহিণী ১২ দশমিক ২ শতাংশ, শিক্ষক ১০ দশমিক ২ শতাংশ, এবং সরাসরি রাজনীতির সঙ্গে যুক্ত ৮ দশমিক ২ শতাংশ প্রার্থী। চিকিৎসকের হার ৪ দশমিক ১ শতাংশ এবং অন্য পেশাজীবীর হার ৪ দশমিক ১ শতাংশ।
তথ্য বিশ্লেষণে দেখা যায়, সার্বিকভাবে সরাসরি ভোটে নির্বাচিত ও সংরক্ষিত নারী আসনসহ সব সদস্যের মধ্যে ৫৫ দশমিক ১৭ শতাংশই ব্যবসায়ী।
সংরক্ষিত আসনের কোটিপতি প্রার্থীদের মোট সম্পদের পরিমাণ বিশ্লেষণে দেখা যায়, তাদের কোটি টাকার বেশি স্থাবর সম্পদের মোট পরিমাণ ৬৬ কোটি টাকা এবং অস্থাবর সম্পদের মোট পরিমাণ ৭৮ কোটি টাকা। তবে তাদের স্থাবর ও অস্থাবর সম্পদ আলাদাভাবে যোগ করলে সর্বমোট সম্পদের পরিমাণ দাঁড়ায় ১৫২ কোটি টাকা।
উল্লেখযোগ্যভাবে লক্ষণীয়, নারী আসনের প্রার্থীদের মধ্যে নিজ নামে কিংবা স্বামী-স্ত্রীর যৌথ নামে ১০০ ভরির বেশি স্বর্ণালংকার আছে অন্তত তিনজন প্রার্থীর‒ যাদের একজন প্রার্থীর নিজের নামেই ৫০২ ভরি স্বর্ণালংকারের তথ্য পাওয়া গেছে।
ব্যক্তিগত বিপুল এই সম্পদের পাশাপাশি সংরক্ষিত আসনের প্রার্থীদের ঋণগ্রস্ততার চিত্রও বিশ্লেষণে উঠে এসেছে, যেখানে দেখা যায় ২০ দশমিক ৪১ শতাংশ প্রার্থীই কোনো না কোনোভাবে দায় বা ঋণগ্রস্ত। দলীয়ভাবে বিএনপি ও জামায়াতের প্রার্থীদের মধ্যে ঋণগ্রস্ততার হার সমান ২২ দশমিক ২২ শতাংশ। তবে সংরক্ষিত আসনের প্রার্থীদের (২০.৪১%) তুলনায় সরাসরি ভোটে নির্বাচিত সংসদ সদস্যদের (৫০.৮৪%) ঋণগ্রস্ততার পরিমাণ ২ দশমিক ৪৯ গুণ বেশি।
সংরক্ষিত আসনে প্রার্থীদের গড় বয়স ৫২ দশমিক ১৭ বছর। বয়সসীমা হিসেবে ৪৫-৫৪ বছর বয়সের প্রার্থীর সংখ্যা সর্বোচ্চ (১৬ জন বা ৩২ দশমিক ৭৪ শতাংশ)। এরপর ৩৫-৪৪ বছর বয়সী ৯ জন এবং ৫৫-৬৫ বছর বয়সী প্রার্থীর সংখ্যা ১২ জন।
দল হিসেবে বিএনপির ৩৬ জন প্রার্থীর মধ্যে ১৩ জনের বয়সসীমা ৪৫-৫৪ বছর, ১০ জনের ৫৫-৬৫ বছর এবং ৬৫ বছরের উর্ধ্বে আছেন ৫ জন।
জামায়াতের ৯ জন প্রার্থীর মধ্যে ৩৫-৪৪ বছরের বয়সসীমায় ১ জন, ৪৫-৫৪ বছরের ৩ জন, ৫৫-৬৫ বছরের ২ জন এবং ৬৫ বছরের ঊর্ধ্বে ৩ জন। বিএনপির দুজন প্রার্থীর বয়সসীমা ২৫-৩৪ এর মধ্যে হলেও জামায়াতের একজনও এই বয়সসীমায় প্রার্থী হননি। তবে সার্বিকভাবে ত্রয়োদশ সংসদ নির্বাচনে সরাসরি ভোটে নির্বাচিত ও সংরক্ষিত নারী আসনসহ সব সদস্যের গড় বয়স ৫৮ দশমিক ৫ বছর।
হলফনামার তথ্য বিশ্লেষণে দেখা যায় সংরক্ষিত নারী আসনের প্রার্থীদের মধ্যে ৫ জন প্রার্থীর স্বামীর তুলনায় নিজের দালান বা ফ্ল্যাটের সংখ্যা কম। একইভাবে জমির পরিমাণ কম আছে ৭ জনের এবং ১৪ জনের অস্থাবর সম্পদ তাদের স্বামীর তুলনায় কম। সংরক্ষিত আসনের নারী প্রার্থীদের অধিকাংশের সম্পদের পরিমাণই তাদের স্বামীদের তুলনায় বেশি থাকায় বাংলাদেশের জনমিতি ও সম্পদ অর্জনের প্রেক্ষাপট বিবেচনায়, এতে বিশেষ দৃষ্টি আকর্ষণের সুযোগ তৈরি হয়েছে।
এসএম/এএসএ