হামে একমাত্র সন্তানকে হারিয়ে শোকে স্তব্ধ মা–বাবা
বরগুনার মামুন দম্পতির ঘরে প্রথম সন্তান ইশহাকের জন্ম হয়েছিল মাত্র নয় মাস আগে। ছোট্ট ইশহাকের কান্না, হাসি ও নড়াচড়ায় একসময় ভরে উঠেছিল তাদের সংসার। কিন্তু সেই ঘর এখন নিঃশব্দ হয়ে পড়েছে, যেখানে আর শোনা যাবে না ইশহাকের কোনো সাড়া।
পাঁচ দিন আগে উন্নত চিকিৎসার আশায় সন্তানকে নিয়ে ঢাকায় এসেছিলেন মামুন দম্পতি। তাদের প্রত্যাশা ছিল সুস্থ হয়ে সন্তানকে নিয়ে ফিরে যাবেন গ্রামের বাড়িতে। তবে সেই আশার ইতি ঘটে রাজধানীতেই। শুক্রবার (১ মে) সকালে রাজধানীর শেরেবাংলা নগরের বাংলাদেশ শিশু হাসপাতাল ও ইনস্টিটিউটের পেডিয়াট্রিক ইনটেনসিভ কেয়ার ইউনিটে (পিআইসিইউ) চিকিৎসাধীন মৃত্যু হয় ছোট্ট ইশহাকের।
শুক্রবার বাংলাদেশ শিশু হাসপাতাল ও ইনস্টিটিউটে সরেজমিনে দেখা যায়, মারা যাওয়া একজন শিশুর জন্য অপেক্ষমাণ একটি অ্যাম্বুলেন্স। বেলা ১২টার কিছু আগে মৃত ইশহাককে তোয়ালে মুড়িয়ে হাসপাতাল থেকে বের হন তার বাবা-মা, সঙ্গে আরও আত্মীয়-স্বজন। সবার চোখে পানি। অঝোরে কান্না করছিলেন ইশহাকের মা। একমাত্র সন্তান হারিয়ে মায়ের ডুকরে কান্নায় ভারী হয়ে ওঠে শিশু হাসপাতালের বাইরের পরিবেশ।

মৃত ইশহাককে কোলে করে অ্যাম্বুলেন্সে ওঠেন তার চাচা। এরপর একে একে ইশহাকের বাবা, মা ও অন্য আত্মীয়রা ওঠেন অ্যাম্বুলেন্সে। দাফনের জন্য গন্তব্য গ্রামের বাড়ি।
ইশহাকের বাবা মামুন জাগো নিউজকে বলেন, এক মাস ধরে দুই থেকে আড়াই লাখের উপরে টাকা গেছে। এক হাসপাতাল থেকে আরেক হাসপাতালে ছোটাছুটি। তারপরও আমার বাচ্চাটাকে বাঁচাতে পারলাম না।
মামুনের বাড়ি বরগুনা সদর উপজেলার পাতাকাটা গ্রামে। এক মাসে আগে নয় মাস বয়সি ইশহাকের নিউমোনিয়া ধরা পড়ে। তখন নিউমোনিয়ার চিকিৎসা চলে বরগুনা সদর হাসপাতালে। জ্বর ভালো হলে গ্রামের বাড়িতে নিয়ে যাওয়া হয়। পরে আবারও অসুস্থ হয় শিশু ইশহাক। এরপর বরগুনা সদর হাসপাতাল থেকে বরিশাল মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল, শারীরিক অবস্থার অবনতি হলে সেখান থেকে রেফার্ড করা হয় ঢাকায়। শিশু হাসপাতালে পিআইসিইউ না থাকায় ঢাকার বেসরকারি সিটি কেয়ার হাসপাতালে দুইদিন চিকিৎসা চলে শিশুটির। পর বাংলাদেশ শিশু হাসপাতালে সিট পেলেও ধরা পড়ে হাম উপসর্গের। এরপর তিনদিন চিকিৎসাধীন থাকা অবস্থায় মৃত্যু হয় ইশহাকের।

ইশহাকের বাবা মামুন বলেন, জ্বর আসছে এক মাস। এরপর ট্রিটমেন্ট শুরুতে বরগুনা সদর হাসপাতালের এক ডাক্তার ছিল মেহেদী পারভেজ। উনাকে দেখানোর পরে উনি বলছে নিউমোনিয়া। পরে সাতদিন ওখানে ভর্তি ছিল। সাতদিন ভর্তি থাকার পরে উনি ট্রিটমেন্ট করে ছেড়ে দিয়েছে। কিন্তু উনার একটা ভুল ছিল, উনি সাত দিন পর যদি একটা এক্স-রে দিয়া দেখত যে আসলে ওর নিউমোনিয়াটা ক্লিয়ার হয়েছে কি না। উনি সেটা করে নাই, রিলিজ দিয়েছে। পরে বাড়ি যাইয়া চার-পাঁচ দিন থাকার পরে আবার অসুস্থ। পরে আবার উনারে দেখানো হয়েছে। উনি আবারও সাতদিন ভর্তি রাখছে। আবারও সাত দিন পর রিলিজ দিয়েছে। তখনও উনি ওই ভুলটা আবারও করছে।
তিনি বলেন, তারপরে একদিন ভালো থাকার পর আবার অসুস্থ। পরে আমি আর দেরি করি নাই, বরিশাল নিয়ে আসছি। ওখানে ৩০ ঘণ্টা ছিল অক্সিজেন দেওয়া। তখন তারা বলছে, ভাই আপনার ছেলের অবস্থা খুবই খারাপ, আপনি দ্রুত ঢাকা নিয়ে যান।
এরপর দ্রুত অ্যাম্বুলেন্সে ঢাকায় নিয়ে আসি। তবে শিশু হাসপাতালে এসে সিট পাই নাই। সিট না পাইয়া দুই দিন পাশের সিটি কেয়ার হাসপাতালে রাখা হয়। পরে আমার কোম্পানি থেকে এমডি স্যার শিশু হাসপাতালে একটা সিটের ব্যবস্থা করে দেয়।

ইশহাকের বাবা আরও বলেন, প্রথমে নিউমোনিয়া। নিউমোনিয়া থেকে আমরা সিটি কেয়ারে যখন ছিলাম তখন ওর হাম উঠে নাই। শিশু হাসপাতালে আসার পর দুই দিন, একরাত রাখা হয় পিআইসিইউতে। ওই পিআইসিইউতে বসেই পরের দিনই দেখি হাম আসছে ওর শরীরে। র্যাশ উঠছে। পরে তারা আবার নিচে এমআইসিইউতে শিফট করে দেয়। আমার দুই থেকে আড়াই লাখের উপরে টাকা গেছে। তারপরও আমার বাচ্চাটাকে বাঁচাতে পারলাম না।
বাংলাদেশ বর্তমানে গত কয়েক দশকের মধ্যে সবচেয়ে ভয়াবহ হামের প্রাদুর্ভাব মোকাবিলা করছে। চলতি বছরের মার্চ মাসে এই প্রাদুর্ভাব শুরু হয় এবং দ্রুত সারা দেশে ছড়িয়ে পড়ে। সারাদেশে গত ২৪ ঘণ্টায় হামে আক্রান্ত হয়ে দুজন মারা গেছেন। স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, গত ১৫ মার্চের পর থেকে এ পর্যন্ত হামে ৪৯ জনের মৃত্যু হয়েছে। একই সময়ে সন্দেহভাজন হামজনিত মৃত্যুর সংখ্যা ২২৭ জন।
১৫ মার্চের পর থেকে এ পর্যন্ত নিশ্চিত হামে আক্রান্ত হয়েছেন ৫ হাজার ২৮ জন। একই সময়ে সন্দেহভাজন হামে আক্রান্তের সংখ্যা ৩৭ হাজার ১৩১ জন। এ পর্যন্ত হাম সন্দেহে হাসপাতালে ভর্তি হয়েছেন ২৫ হাজার ১৫৮ জন এবং হাসপাতাল থেকে ছাড়া পেয়েছেন ২১ হাজার ৭৫৬ জন।

এপ্রিলের শুরুতে হাম রুবেলার টিকাদানে দেশব্যাপী জরুরি কর্মসূচি শুরু করা হয়, যেখানে প্রথম ডোজ গ্রহণের বয়স কমিয়ে ছয় মাস করা হয়। সরকার নজরদারি ও সংক্রমণ নিয়ন্ত্রণব্যবস্থা আরও জোরদার করেছে (যেমন পৃথক আইসোলেশন ওয়ার্ড ও নিবিড় পরিচর্যা কেন্দ্র চালু)। একই সঙ্গে টিকা সংগ্রহ প্রক্রিয়াকে আরও গতিশীল করেছে।
সরকার আশা করছে, এসব পদক্ষেপ গ্রহণের ফলে শিগগির এই প্রাদুর্ভাব নিয়ন্ত্রণে আসবে।
টিটি/এমএএইচ/এএসএম