বৃষ্টিতে লবণচাষিদের স্বপ্নভঙ্গ
বৈশাখের তীব্র তাপপ্রবাহের প্রভাবে মাঘ-ফাল্গুন-চৈত্র মাসের তিনদিনের লবণ একদিনেই উৎপাদন হয়। এসময়ে মাঠে কর্মব্যস্ততা থাকে চাষিদের। কিন্তু গত এক সপ্তাহ ধরে বৃষ্টিপাত হচ্ছে কক্সবাজারে। ফলে বাধাগ্রস্ত হচ্ছে লবণ উৎপাদন। এতে মৌসুমের শেষ লগ্নে রেকর্ড উৎপাদনের স্বপ্নভঙ্গকে এখন ‘ভাঙা কপাল’ হিসেবে দেখছেন কক্সবাজার উপকূলের লবণচাষিরা।
লবণ উৎপাদন মৌসুম শেষ হয় ১৫ জ্যৈষ্ঠ। সে অনুযায়ী মৌসুম শেষ হতে আরও প্রায় এক মাস বাকি। তবে বৃষ্টিতে বর্তমানে উৎপাদন বন্ধ থাকায় দেনার চিন্তা চাষিদের ঘুম হারাম করেছে। এ অবস্থায় মড়ার ওপর খাঁড়ার ঘা হিসেবে যোগ হয়েছে কালবৈশাখী। লবণ শিল্পে ‘কালবৈশাখী’কে অশনিসংকেত মনে করছেন লবণচাষিরা।
চাষিদের মতে, বৃষ্টির ফলে একবার লবণ উৎপাদন বন্ধ হলে তা আবার শুরু করতে সপ্তাহ লেগে যায়। গত ৬ এপ্রিলের বৃষ্টিতেও টানা সাতদিন উৎপাদন বন্ধ ছিল। সবশেষ বৃষ্টি ও বৈরী আবহাওয়ার কারণে ২৮ এপ্রিল থেকে উৎপাদন বন্ধ রয়েছে।
আবহাওয়া অধিদপ্তর কক্সবাজার কার্যালয়ের সহকারী আবহাওয়াবিদ আবদুল হান্নান জানান, উত্তর বঙ্গোপসাগর ও তৎসংলগ্ন এলাকায় বায়ুচাপের তারতম্যের প্রভাবে সমুদ্র উত্তাল রয়েছে। ফলে, কক্সবাজার উপকূলে ৩ নম্বর স্থানীয় সতর্কতা সংকেত বহাল রাখা হয়েছে।

তিনি আরও জানান, শনিবার (২ মে) ভোর ৬টা থেকে রোববার (৩ মে) ভোর ৬টা পর্যন্ত ২৪ ঘণ্টায় কক্সবাজারে ৪৮মিলিমিটার বৃষ্টিপাত রেকর্ড করা হয়েছে। আকাশে অনেক মেঘ জমে রয়েছে। যে কোনো সময় বজ্রপাতসহ ভারী বৃষ্টির শঙ্কা রয়েছে। ভারী বর্ষণ হলে কোথাও কোথাও জলাবদ্ধতা এবং পাহাড়ি এলাকায় ভূমিধস হতে পারে।
চাষিরা জানান, ঝোড়ো হাওয়া আর হালকা ও মাঝারি বৃষ্টিতে তছনছ হয়ে গেছে হাজার হাজার একর লবণ চাষ। একদিকে প্রকৃতির রোষ, অন্যদিকে বাজারে ন্যায্যমূল্যের অভাব—দুদিক থেকে চাপে পড়ে কার্যত নিঃস্ব হয়ে পড়েছেন উপকূলের ৪২ হাজারের বেশি চাষি।
বাংলাদেশ ক্ষুদ্র ও কুটির শিল্প করপোরেশন (বিসিক) কক্সবাজার কার্যালয় সূত্র জানায়, তীব্র দাবদাহের কারণে উপকূলে লবণ উৎপাদন রীতিমতো রেকর্ড ছুঁয়েছিল। দৈনিক উৎপাদন ১২ হাজার মেট্রিক টন থেকে লাফিয়ে উঠেছিল ৩২ হাজার মেট্রিক টনে। কিন্তু সেই উজ্জ্বল মুহূর্তকে ম্লান করে দিল কালবৈশাখীর দুদফা আঘাত। বৈশাখের শুরুতে একবার, তারপর মঙ্গল, বুধ ও বৃহস্পতিবার রাতে প্রবল বর্ষণ—এ তিন দফা ধাক্কায় শতভাগ লবণমাঠ ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।
ঈদগাঁওয়ের গোমাতলীর লবণচাষি রিদুয়ানুল হক বলেন, ‘অতীতের মতো এবারও ৫০ একরের বেশি মাঠে লবণ চাষ করেছিলাম। গত পাঁচ মাসে একরপ্রতি লবণ উৎপাদন হয়েছে প্রায় ৫৫০ মণ। প্রতি মণ উৎপাদনে খরচ হয়েছে প্রায় ৪০০ টাকা। বিক্রি করে পাই মণপ্রতি ২২০ থেকে ২৫০ টাকা। এখন বৃষ্টির কারণে আবার উৎপাদন বন্ধ। জমির ইজারা, শ্রমিক, খাবার ও অন্যান্য অনুষঙ্গ মিলিয়ে গত বছরের চেয়ে বেশি ক্ষতির মুখে পড়তে হবে। সব মিলিয়ে খরচের টাকাও উঠবে না।’

কক্সবাজার সদরের খুরুশকুল রাস্তার পাড়ার চাষি বেলাল আহমেদ বলেন, ‘গতবছর লস খাবার পরও লবণের দাম বাড়বে আশায় দেরিতে হলেও ১০ একর জমিতে চাষ করেছিলাম। ভালোই উৎপাদন হচ্ছিল। কিন্তু হঠাৎ বৃষ্টিতে প্রায় হাজার মণ লবণ নষ্ট হয়ে গেছে। বুঝতেই পারিনি মুহূর্তে বড় লোকসানের মুখে পড়তে হবে।’
তিনি বলেন, ‘এখনো বৃষ্টিপাত অব্যাহত রয়েছে। আর উৎপাদন হবে কি-না একমাত্র প্রকৃতিই জানে।’
টেকনাফের শাহপরীর দ্বীপ এলাকার চাষি আহসান হাবিব আক্ষেপ করে বলেন, ‘ঋণ করে মাঠে নেমেছিলাম। কিন্তু মৌসুমের শেষ দিকে কালবৈশাখীতে সব শেষ। কয়েকশ মণ লবণ পানিতে তলিয়ে গেছে। এখন ঋণ কীভাবে শোধ করবো বুঝতে পারছি না। খালের দুপাড়ের কয়েকশ একর মাঠে উৎপাদন থমকে গেছে।’
কুতুবদিয়ার লেমশিখালীর চাষি সোনা মিয়া বলেন, ‘মৌসুম শেষ হতে আর বেশিদিন বাকি নেই। একবার বৃষ্টি থামলে আবার উৎপাদনে সপ্তাহ লেগে যায়। এখন বৃষ্টি থামলেও আর মাঠে নামতে চাইবেন না অনেক চাষী। শেষ সময়ে এসে সবাই ক্ষতির মুখে পড়লাম।’
কক্সবাজার বিসিকের তথ্যমতে, চলতি মৌসুমে কক্সবাজারের কুতুবদিয়া, মহেশখালী, টেকনাফ, পেকুয়া, চকরিয়া, ঈদগাঁও, সদর এবং চট্টগ্রামের বাঁশখালীতে মোট ৬৮ হাজার ৫০৫ একর জমিতে লবণ চাষ হয়েছে। গত এক সপ্তাহ ধরে এসব মাঠে উৎপাদন বন্ধ।

লবণচাষি সংগ্রাম পরিষদের চেয়ারম্যান সাহাব উদ্দীন জানান, নভেম্বর-ডিসেম্বরে ঘন কুয়াশা ও শৈত্যপ্রবাহের ফলে মাঠে নামতে ২০-২৫ দিন দেরি হয়। এখন বৈরী আবহাওয়ার কারণে ১৫-২০ দিন আগেই মাঠ ছাড়তে হচ্ছে। ফলে উৎপাদন অর্ধেকে নেমে এসেছে।
তিনি আরও জানান, ডিসেম্বর-জানুয়ারিতে লবণ বিক্রি হয়েছে প্রতি মণ ১৯০-২১০ টাকায়। মার্চের মাঝামাঝিতে সামান্য বেড়ে ২৩০- ২৫০ টাকা হয়েছে। তবে, ন্যায্যমূল্য হিসেবে শুরু হতেই প্রতি মণ ৪০০ টাকা হলে চাষিরা কোনোমতে দেনামুক্ত হতো। এখন নতুন আতঙ্ক হিসেবে যোগ হয়েছে লবণ আমদানির গুজব।
বিসিক কক্সবাজারের মাঠ পরিদর্শক মো. ইদ্রিস আলী জানান, ২৭ এপ্রিল পর্যন্ত পাঁচ মাসে জেলায় ১৭ লাখ ৬৮ হাজার ৫৯৪ মেট্রিক টন লবণ উৎপাদিত হয়েছে, যা গত বছরের একই সময়ের তুলনায় ৯২ হাজার ৯০৯ মেট্রিক টন কম। চলতি মৌসুমে মোট উৎপাদনের লক্ষ্যমাত্রা ধরা হয়েছে ২৮ লাখ ১০ হাজার মেট্রিক টন। দেশে বার্ষিক লবণের চাহিদা ২৭ লাখ ৩৫ হাজার মেট্রিক টন।
ইদ্রিস আলীর মতে, আকস্মিক বৃষ্টিতে লবণ পুরোপুরি নষ্ট হয় না। তবে উৎপাদনের ক্ষতি হয়। টানা দুই থেকে তিন সপ্তাহ আবহাওয়া অনুকূলে থাকলে লক্ষ্যমাত্রা ছোঁয়ার সম্ভাবনা এখনো আছে।
টেকনাফ সাবরাং লবণ চাষি কল্যাণ ও ব্যবসায়ী সমিতির সভাপতি ফরিদ আহম্মদ বলেন, ‘সংকটের অজুহাত দেখিয়ে একটি সিন্ডিকেট লবণ আমদানির চেষ্টা করছে বলে প্রচার পাচ্ছে। আমদানি হলে প্রান্তিক চাষিদের দুর্দশা আরও বেড়ে যাবে।’
বিসিক কক্সবাজার কার্যালয়ের উপমহাব্যবস্থাপক মো. জাফর ইকবাল ভূঁইয়া জানান, বৃষ্টিতে প্রায় দুই সপ্তাহ উৎপাদন বন্ধ ছিল। দৈনিক গড়ে ২৫ হাজার মেট্রিক টন উৎপাদন ধরলে এসময়ে কম উৎপাদন হয়েছে প্রায় তিন লাখ মেট্রিক টন।
জেলায় লবণ উৎপাদন, পরিবহন ও বিপণনের সঙ্গে প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে জড়িত প্রায় ১০ লাখ মানুষ। বর্তমানে চাষিদের কাছে মজুত রয়েছে প্রায় সাড়ে ১১ লাখ মেট্রিক টন এবং মিল-কারখানায় আছে দেড় লাখ টন লবণ। সব মিলিয়ে আগামী মৌসুম শুরু পর্যন্ত এ মজুত দিয়েই দেশের চাহিদা পূরণ সম্ভব বলে জানান বিসিকের এ কর্মকর্তা।
তিনি আরও বলেন, ‘মৌসুম শেষ হতে আরও প্রায় ১৫ দিন সময় রয়েছে। এসময়ে বৃষ্টি না হলে উৎপাদন বাড়ানো সম্ভব। তবে বৃষ্টি অব্যাহত থাকলে মৌসুম কার্যত শেষ ধরে নেওয়া যায়।’
কক্সবাজার চেম্বার অব কমার্সের সাবেক সভাপতি আবু মোরশেদ চৌধুরী খোকা বলেন, গত কয়েক বছর ধরে উৎপাদনে লোকসান, বৃষ্টিতে ক্ষতি, দাদনের ঋণের বোঝা—এ চক্র থেকে বেরিয়ে আসার পথ পাচ্ছেন না লবণচাষিরা। লবণ যেহেতু স্বয়ংসম্পূর্ণ শিল্প, আমদানির কথা মাথায় না রেখে মাঠ পর্যায়ে লবণের ন্যায্যমূল্য নিশ্চিত করা গেলে চাষির সংখ্যা বাড়বে। দুর্যোগে ক্ষতিগ্রস্ত চাষিদের সরকারি সহায়তার আওতায় আনা উচিত বলেও জানান তিনি।
এসআর/এমএস