দাদিই আমার প্রথম মা
কাজী মনজুর করিম মিতুল, প্রকৌশলী ও প্রাবন্ধিক
‘মা বুঝি গান গাইতো, আমার
দোলনা ঠেলে ঠেলে,
মা গিয়েছে, যেতে যেতে
গানটি গেছে ফেলে’
রবীন্দ্রনাথের এই ‘মনে পড়া’ কবিতাটা শুনলে আমার জন্মদায়িনী মায়ের বদলে আমার দাদির চেহারাটাই আমার বেশি মনে পড়ে। আমার মা তার গোটা কলেজ ও বিশ্ববিদ্যালয় জীবন পার করেছেন আমার শৈশবজুড়ে। আমি তখন থাকতাম আমার দাদির কাছে, তিনিই আমাকে দোলনা ঠেলে ঠেলে গান শোনাতেন।
দাদিকে হারিয়েছি ২০০৭ সালে, আমি তখন সদ্য পুত্রের বাবা হয়েছি। অসুস্থ দাদিকে দেখতে যাবার সময় মিলছিল না। মা বলছিলেন, দাদি মৃত্যুশযায়, বারবার আমাকে খুঁজছেন। আমি যখন সপরিবারে খুলনা পৌঁছালাম, তিনি তখন প্রায় অচেতন। ডাকে সাড়া দিয়ে চোখ খুললেন না। এর কিছুক্ষণ পর তিনি শেষ নি:শ্বাস ত্যাগ করলেন। হয়তো আমার কণ্ঠ শোনার পর আত্মতৃপ্তি নিয়ে চলে গেলেন আমার শতায়ু দাদি, আমার প্রথম মা।
তার আত্মত্যাগের গল্প লিখতে গেলে মহাকাব্য হয়ে যাবে, আমি তাকে ডাকতাম ‘মাদার তেরেসা’ বলে। একটা উদাহরণ দিয়ে তার গল্প শেষ করি।
বাড়িতে সবার শেষে তিনি খেতেন, আমি তখন স্কুলছাত্র। আমাদের এক তলা বাড়ি, সামনে উঠোন, উঠোন পেরিয়ে সদর দরজা, সেটা ভোরে খোলে, আর গভীর রাতে বন্ধ হয়। দুপুর গড়িয়ে তখন প্রায় বিকেল, তিনি বারান্দায় সবে ভাতের থালা নিয়ে আমার পাশে এসে বসেছেন। এক ভিক্ষুক এসে বলল, ‘মা, সারাদিন কিছু খাইনি’, দাদি তার থালার সব খাবার তাকে দিয়ে দিলেন!!
আমার আরেকজন মায়ের কথা বলি, সম্পর্কে তিনি আমার বড় চাচি। কিন্তু মাতৃস্নেহে আমাকে বড় করেছেন। ১৯৯৮ সাল, আমার বয়স তখন ১৮। আমার মা আমাকে খুলনা থেকে ঢাকায় নিয়ে এলেন। সদ্য এইচএসসি পরীক্ষা শেষ করিয়ে তিনি আমাকে তুলে দিলেন বড় চাচির হাতে। বড় চাচা ক্যানসারের ভয়াল থাবায় গত হয়েছেন তার বছর দুয়েক আগে। চাচির আশ্রয় আর প্রশ্রয়ে আমি বুয়েটের ভর্তি কোচিং শুরু করেছিলাম। চাচি বাংলার প্রফেসর ছিলেন, আমার লেখাপড়া-খাওয়া-ঘুম, সব কিছুর তদারকি করতেন মায়ের চেয়ে বেশি। মা ঢাকায় আসতেন মাস কয়েক পর পর।
আমি বুয়েটে পড়লাম, সরকারি চাকরি পেয়ে খুলনায় ফিরে গেলাম, বিয়ে করলাম - সবখানেই আমার মায়ের পাশাপাশি ছিল বড় চাচির স্নেহ ও গাইডেন্স। আমি যখন সরকারি চাকরি ছেড়ে ঢাকায় বেসরকারি চাকরি নিলাম, চাচি খুশি হননি। তবু তার দরজা আমার জন্য আজীবন ২৪ ঘণ্টা খোলা পেয়েছি।
চাচিকে হারিয়েছি ২০২১ সালে। সেই পর্যন্ত তিনিই ছিলেন ঢাকায় আমার অভিভাবক। জীবনের শেষ দিনগুলো তিনি তার সন্তানদের অক্লান্ত সেবা পেয়েছেন, বোধ করি সেটা তারই পূণ্যের প্রতিদান।
আমার জন্মদায়িনী মায়ের গল্পটা বলে শেষ করি। তিনি এখনো বর্তমান, তবু আমার কাছে যেন অতীত...! মায়ের ইচ্ছাতেই বুয়েটে পড়েছি। আমার স্কুল ও কলেজ জীবনে তিনিই ছিলেন আমার সেরা বন্ধু ও পরামর্শক। তিনি যে স্কুলের শিক্ষিকা ছিলেন, আমি সেখানেই পড়েছি আদ্যোপান্ত। আমাকে নোট করে দিতেন, নিজে না পারলে আমার সিনিয়র ভালো ছাত্রদের বাড়িতে হানা দিয়ে তাদের নোট ফটোকপি করে আনতেন। বাজারের গাইড বই পড়তে দিতেন না।
কলেজে উঠলাম, কিন্তু মায়ের আঁচল ছাড়তে পারিনি। তিনি আমার কলেজেও নিয়মিত যেতেন, শিক্ষকদের কাছ থেকে আমার জন্য বাড়তি তদারকি আদায় করে দিতেন। বিশেষ করে আমার ইংরেজি ও গণিতে দক্ষতা বাড়ানোর জন্য আমাকে একাধিক শিক্ষকের কাছে পড়তে পাঠাতেন। নিজেও গিয়ে হাজির হতেন তাদের বাড়িতে।
বুয়েটেও হানা দিতেন মা। বন্ধুরা হাসাহাসি করতো। আমার জন্য মা ছুটে বেড়িয়েছেন আজীবন। আমি কিছুই ভুলিনি। ভালো-মন্দ মিলিয়ে মানুষ। মায়েদের দোষ-ত্রুটি নিয়ে আমার অনেক অভিযোগ। তবু দিন শেষে মনে হয়, আজকের এই যে আমি, তার জীবনের ভিত্তি গড়ে তুলতে এই মায়েদের যে অবদান, সেই ঋণ শুধবার ক্ষমতা আমার নেই।
রবীন্দ্রনাথের ভাষায় বলতে হয়,
‘মাকে আমার পড়ে না মনে।
শুধু যখন বসি গিয়ে
শোবার ঘরের কোণে;
জানালা থেকে তাকাই দূরে
নীল আকাশের দিকে,
মনে হয়, মা আমার পানে
চাইছে অনিমিখে।
কোলের ‘পরে ধরে কবে
দেখত আমায় চেয়ে,
সেই চাউনি রেখে গেছে
সারা আকাশ ছেয়ে।’
এমআরএম