সড়ক পরিবহনমন্ত্রী
স্থানীয় সরকারের রাস্তায় দুর্ঘটনার দায়ও আমাকে নিতে হয়
স্থানীয় সরকার বিভাগের সড়কের দুর্ঘটনার দায়ও তাকে নিতে হয় বলে মন্তব্য করেছেন সড়ক পরিবহন ও সেতু মন্ত্রণালয়, রেলপথ মন্ত্রণালয় এবং নৌ পরিবহনমন্ত্রী শেখ রবিউল আলম।
সোমবার (১১ মে) সচিবালয়ে আসন্ন ঈদুল আজহায় নিরাপদ ঈদযাত্রা নিশ্চিতে প্রস্তুতি সভা শেষে তিনি এ কথা বলেন।
ঈদের সময় সড়ক দুর্ঘটনা রোধে কী কী পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে- জানতে চাইলে মন্ত্রী বলেন, দেশে প্রতি বছর সাড়ে চার থেকে পাঁচ হাজারের মতো মানুষ সড়ক দুর্ঘটনায় নিহত হয়। খুব দুর্ভাগ্যজনক। ২০২৪ সালে সবচেয়ে বেশি নিহত হয়েছে, আমি পরিসংখ্যান দেখেছি, ৫ হাজার ৩৮৪ জন সম্ভবত ছিল। তার পরের সংখ্যাটা হচ্ছে ২০২১ সালে, ৫ হাজার ৮২ জন। অর্থাৎ আমি বলছি যে পাঁচ হাজারের কাছাকাছি মানুষ সড়ক দুর্ঘটনায় নিহত হয়। গতবার (ঈদুল ফিতর) আমাদের কাছে যেটা তথ্য আছে ১৭০ জন সড়ক দুর্ঘটনায় ১১ দিনে নিহত হয়েছিল, ঈদযাত্রার আগে-পরের কথা বলছি। দুটি বড় দুর্ঘটনা ঘটেছিল, একটা আপনারা জানেন ২৬ জন আরিচাতে যেটা ঘটলো, আরেকটা ১২ জন ট্রাকের সঙ্গে আমাদের একটা বাস কুমিল্লাতে। এই দুটি বড় ঘটনা ছিল, আর বাকি ১৭০ জন টোটাল মারা যায় বাংলাদেশের সড়ক দুর্ঘটনায়।’
আরও পড়ুন
দ্বিতীয় পদ্মা সেতু নির্মাণে এগোচ্ছে সরকার: সেতুমন্ত্রী
দ্বিতীয় পদ্মা-যমুনা সেতু নির্মাণে এগোচ্ছে সরকার, প্রথম বাজেটেই বরাদ্দ
‘আবরার-রাজীবের মতো কারও প্রাণ না গেলে এখানে পদচারী সেতু হবে না’
তিনি বলেন, ‘বলা ঠিক হবে কি না জানি না, আমার হাইওয়েতে (মহাসড়কে) মারা গেছে ৪৩ জন। আর বাকিটা এলজিইডির (স্থানীয় সরকার প্রকৌশল অধিদপ্তর) রাস্তা। কিন্তু আমাকে জবাব দিতে হয় ১৭০ জনের। কিন্তু আমার হাইওয়েতে ৪৩ জন মারা গিয়েছিল।’
সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে মন্ত্রী বলেন, ‘আমি বলছি যে রাস্তা ম্যানেজমেন্ট...আল্টিমেটলি এলজিইডি রাস্তা তৈরি করে, আমিও রাস্তা তৈরি করি। আমি মহাসড়ক তৈরি করি, তারা স্থানীয় তাদের অধীনে সড়ক তৈরি করে।’
মন্ত্রী আরও বলেন, ‘সড়ক দুর্ঘটনায় মৃত্যুর দায় আল্টিমেটলি তো আমাদের রাষ্ট্রের। আমাদের ব্যর্থতা তো। তাই না? এখন এলজিআরডিকে আপনারা ওভাবে জানেন না হয়তো, তাদের প্রয়োজন হয় না। আপনারাও মানুষ এবং সাংবাদিকরা বোঝে যোগাযোগ মন্ত্রণালয়ের দায়িত্বই মানে হচ্ছে রাস্তার ফুল নিরাপত্তার দায়িত্ব করা। এজন্য জবাবদিহি করতে হয়।’
তিনি বলেন, ‘এলজিআরডি মন্ত্রণালয়ের অধীনে যখন কোনো রাস্তা হয় সে ত্রুটির দায় তো আমার ওপর হয় না। যদি কোনো ত্রুটির কারণে দুর্ঘটনা ঘটে, সেটার দায় সড়ক পরিবহন মন্ত্রণালয়কে অনেক সময় নিতে হয়। কিন্তু নেওয়াটা দুর্ভাগ্যজনক।’
‘যে রাস্তাটা এলজিআরডির নিয়ন্ত্রণে, এলজিআরডি নকশা করে, এলজিআরডি বাস্তবায়ন করে, সেটার দায়ে যখন আমাকে প্রশ্ন করা হয়, তখন কী হয়? তখন হচ্ছে যে, তখন আমাকে এই যে দায় নিতে হয়, অন্যদের দায়ও আমাকে কোনো কোনো সময় আপনাদের প্রশ্নের কারণে নিতে হচ্ছে। দায় আমাকে কেউ দিচ্ছে না, আপনারা (সাংবাদিক) দিচ্ছেন।’
শেখ রবিউল আলম বলেন, ‘প্রত্যেকটা মৃত্যুই কিন্তু অনাকাঙ্ক্ষিত, দুঃখজনক। যার পরিবার যায় সে জানে। রাষ্ট্রের তা কাম্য না, তা চায় না। কিন্তু সড়ক দুর্ঘটনা আমাদের আছে। হ্যাঁ, আমরা এর বাইরে আসতে পারছি না, কারণ আমাদের হাইওয়েতে যেভাবে কাভার করা উচিত ছিল, পৃথিবীর বড় বড় হাইওয়ে দেখবেন যে সেখানে এন্ট্রান্স থাকে না, নির্দিষ্ট জায়গা ছাড়া। এমনকি গাড়িও যদি বাইরে যেতে হয় তাকে একটা জায়গায় ইউ-লুপ দিয়ে বাইরে যেতে হয়। আর আমাদের হাইওয়েগুলো আপনার ব্যাটারিচালিত ভেহিকল চলছে। তারপর ছোট ছোট রাস্তা এসে হাইওয়ে যখন মিশছে, সেখানে সে লেফট লেনে থাকছে না, সে এসে ৯০ ডিগ্রিতে মিশে যাচ্ছে।’
‘তো এ সমস্যা নিরসনে আমরা বিশ্বব্যাংকের অধীনে সড়ক নিরাপত্তা কর্মসূচির অধীনে এই হাইওয়েতে যেসব রাস্তা যুক্ত করা হয়েছে, সেগুলো লেফট লেনে নেওয়ার একটা কর্মসূচি এবং পরিকল্পনা নিয়েছি। সেগুলো বাস্তবায়ন যদি হয় আরও কিছুটা কমবে।’
সড়ক পরিবহনমন্ত্রী আরও বলেন, ‘অটোচালিত যানবাহন যেগুলো আছে, সেগুলো যদি হাইওয়েতে নিরুৎসাহিত করা যায়, একেবারে নিয়ন্ত্রণ করা যাচ্ছে না। হাইওয়ে পুলিশকে একদম সজাগ রেখেছি। তারা এবার আরও তৎপর থাকবে। এটাও সত্য যে আমার জানামতে প্রায় ৪২ কিলোমিটার জায়গা দেখাশোনা করার জন্য তিনজন হাইওয়ে পুলিশ আমরা পাই, আমি যদি ভুল না বলে থাকি। তো এই রকমের কিছু স্বল্পতা আমাদের আছে, কিছু দুর্বলতা আমাদের আছে। কিন্তু যতটুকু আমাদের সামর্থ্য আছে তার শতভাগ নিয়ে আমরা চেষ্টা করছি।’
তিনি বলেন, ‘এবার ঈদে দেড় কোটি মানুষের যাত্রা দুই থেকে তিনদিনে, আবার এক কোটির কাছাকাছি গরুর যাত্রা নিশ্চিত করবার জন্য আমাদের যে যানবাহন, আমাদের যে রাস্তা, আমাদের যে মানসিকতা এবং আমাদের যে সচেতনতা, তা কোনো কোনো সময় বড় অন্তরায় তৈরি করে। তো তার মধ্যদিয়ে আমরা ব্যবস্থাপনাটা নিশ্চিত করতে চাচ্ছি, সব সেক্টরকে সব পরিস্থিতিকে বিবেচনায় রেখে।’
সড়ক পরিবহন ও সেতুমন্ত্রী বলেন, ‘আমরা সিদ্ধান্ত নিয়েছি যে সব প্যাসেঞ্জারকে নামিয়ে বাস ফেরিতে উঠবে। কিন্তু দেখা গেলো যে অনেক অসুস্থ মানুষ থাকেন, অনেকের মালামাল থাকে সেটা রেখে সে নামতে চান না, বাচ্চারা থাকে। কার্যকর করাটা একটু কঠিন, কিন্তু আমরা করছি। পাশাপাশি বাস ফেরিতে ওঠার আগে আমরা একটা ব্যারিকেড তৈরি করছি। ওই ফেরি বাস নেমে খালি না হওয়া পর্যন্ত এখান থেকে কোনো গাড়ি ওঠার জন্য যেতে পারবে না, ওই ব্যারিকেড ক্রস করতে পারবে না, সেটা আমরা নিশ্চিত করেছি। আরেকটা হচ্ছে ফেরিতে যে পন্টুন থাকে সেটাকে আমরা একটু কাভার্ড করে দেওয়ার চেষ্টা করছি।’
গত ঈদে দুর্ঘটনার পর সদরঘাটে যাত্রীদের নিরাপত্তা নিশ্চিত পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে জানিয়ে নৌপরিবহন মন্ত্রী বলেন, ‘এবার আমরা যেটা করেছি সদরঘাটে, সেটা হচ্ছে বোট এবং স্পিড বোট কোনোটা থেকে কোনো লঞ্চে উঠতে পারবে না। নৌ-পুলিশের সার্বক্ষণিক কর্ডন করে নজরদারি চলবে। বোট এবং স্পিড বোটে কোনো যাত্রী যদি আসে, সে পল্টুনে নামতে পারবে এবং পল্টুনে উঠতে পারবে সেজন্য আমরা ব্রিজ করে দিয়েছি নতুন করে।’
মালিকদের কাছে ঈদের সময় পোশাক কারখানা তিন দফায় ছুটি দেওয়ার দাবি জানানো হয়েছে জানিয়ে মন্ত্রী বলেন, ‘তারা এগ্রিও করে। কিন্তু আমি বলেছি আমরা এবার চাপ প্রয়োগ করেছি, গতবার কিন্তু কার্যকর হয়নি। তারা বলেছে কিছু কিছু গার্মেন্টসে এমন অর্ডার থাকে, তাদের দুই দিন কাজ করাও জরুরি হয়ে যায় নতুবা অর্থনৈতিকভাবে তারা দারুণ ক্ষতিগ্রস্ত হয়। তো এটা এখনো পর্যন্ত আমি নিশ্চয়তা দিতে পারছি না। আমাদের দাবি রয়েছে তারা যেন তিনদিনে অথবা চারদিনে ধাপে ধাপে, যেখানে ওয়ার্ক অর্ডার ওই রকম নাই, তারা একটু আগে গেলো—এই বিবেচনা করার জন্য জোরালো দাবি জানিয়েছি। তারা আমাদের নিশ্চিত করেছে। কিন্তু শতভাগ নিশ্চিত হবো, গতবার যেহেতু হয়নি, তো নিশ্চয়ই সেই আশঙ্কা আমার মধ্যে আছে।’
ঈদের সময় গণপরিবহনের ভাড়া বাড়ানোর কোনো সুযোগ নেই বলেও জানিয়েছেন মন্ত্রী।
আরএমএম/ইএ